ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

02_Central+Shaheed+Minar_200216_0004

হোয়াট  থিংকস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্ক টুমরো। সারা ব্রিটিশ ভারতে এইভাবেই মুল্যায়ন করা হতো অবিভক্ত বাংলাকে। এই চিন্তা ভারতে ব্রিটিশ সামাজ্যের গোড়াপত্তন হওয়ার অনেক আগে থেকেই উপলব্ধিতে এসেছিলো ব্রিটিশ বেনিয়াদের। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সারা ভারত যখন মোঘলদের দ্বারা শাসিত হচ্ছিলো তখনই ব্রিটিশরা বাংলায় ব্যবসা করার অনুমতি প্রার্থনা করে। ব্রিটিশরা এই বাংলায় ব্যবসা করতে যেয়েই বাংলার শাসন ক্ষমতার দন্ড কৌশলে করায়ত্ত করে নেয়।

বাংলার নবাবকে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের সহায়তায় যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলার মসনদ দখল করে নিয়েই সারা ভারতের শাসন ক্ষমতা ব্রিটিশরা কুক্ষিগত করে। এথেকেই বুঝা যায় শুধুমাত্র পাকিস্তান আমলেই নয় অবিভক্ত মোঘল সাম্রাজ্যেও বাংলা ছিলো সকল রাজা বাদশার লক্ষ্যবস্তু। সবচেয়ে সার্থক মোঘল সম্রাট আকবরকেও এই বাংলা দখল করতে বেগ পেতে হয়েছিলো।

ভারত বর্ষের প্রায় সকল রাজ্যেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলা এবং পাঞ্জাবের মতো আর কোন রাজ্যে সেইরকম সশ্বস্ত্র আন্দোলন হয় নাই। এই চিন্তা থেকেও ব্রিটিশ আর পাক ভারতের নেতৃবৃন্দ বাংলা এবং পাঞ্জাবকে ভাগ করে দিলেন কোন রকম বাছবিচার না করেই।

৪৭ এর দেশভাগ এবং সীমানা চিহ্নিতকরণ হয়েছে মানচিত্রের উপড় কলমের আঁচড় দিয়ে। ফলে বাংলা এবং পাঞ্জাবে সিমানা চলে গেছে কারো বাথরুমকে ভাগ করে, কারোবা বেডরুমের মাঝখান দিয়ে অথবা কারো শোবার ঘর ভারতে তো রান্নাঘর থেকে গেছে পাকিস্তানে।

আসলে এই পুরানো গল্পগাথা নতুন করে বলার অর্থ হলো আমাদের বাংলা ভাষার উপর যে আক্রমন পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী পাকিস্তান নামক অদ্ভুত রাষ্ট্রের স্বাধীনতার অব্যাহতি পর থেকেই শুরু করেছিলো সেটা আসলে ঠিক নয়। এই আক্রমনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে সেদিন থেকে, যেদিন লাহোর প্রস্তাবকে বিকৃত করে মুসলিম লীগের সভায় গ্রহন করা হয়েছিলো। তারপরেও বাঙ্গালী মুসলমান নেতৃবৃন্দ নিজেদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ মনে করে পাঞ্জাবী বা অন্যান্য উর্দু ভাষী নেতাদের সাথে গাঁট বেঁধেছিলেন। অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলায় হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়ে হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বসবাসরত হিন্দু মুসলিমের ঐতিহ্যকে কুলষিত করে নোংরা রাজনীতিকে উস্কে দিয়েছিলো।

সবচেয়ে মজার বিষয় এই বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয়ে যেসব নেতাদের অবদান ছিলো তারাই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি সৃষ্টির অব্যাহতি পরেই পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর কাছে অপাংক্তেয় হয়ে গেলো। এই পাকিস্তানী শাসক বৃন্দ আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন অবিভক্ত ভারতে তাঁরা কোনদিন ক্ষমতার কেন্দবিন্দুতে পৌছাতে পারবেন না। ভারতের অমুসলিম পুঁজির কাছে মুসলিম পুঁজি কোনদিনই মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আর সেকারণেই এক অদ্ভুত ভাগাভাগির মাধ্যমে ভারতকে ভাগ করে নিজেদের স্বার্থকে নিশ্চিত করেছে। অপরপক্ষে পূর্ব বাংলার সম্পদে গড়ে উঠা কোলকাতাকে ভারতের হাতে তুলে দিতেও সেই পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী কোন কৃপণতা দেখান নাই। এমতাবস্থায় পাকিস্তানী শাসক গোষ্টী ৪৮ সালেই নিজেদের খোলস খুলে তাদের উদ্যেশ্য পরিস্কার করে ফেলে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানী জনগোষ্ঠীর কারোরই ভাষা উর্দু না হওয়া সত্বেও বিহার অঞ্চলের ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষনা করার দুরভিসন্ধি আসলে সাধারনকে শোষণ করার মানসিকতা থেকেই এসেছিলো।

ভারতবর্ষে রাজা বাদশাদের ভাষা ছিলো ভিন্ন। সাধারন মানুষের ভাষায় কোন রাজা বাদশাই কথা বলতেন না। সেই মানসিকতা থেকেই পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী সাধারন মানুষের মুখের কথাকে বাদ দিয়ে ভিন্ন সংস্কৃতির ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিলো। মোঘলরা যেমন নিজেদের মধ্যে পার্সি ভাষা ব্যবহার করতেন এবং সারা ভারতে পার্সি ভাষায় রাজকার্য পরিচালনায় বাধ্য করেছিলো ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু রাজা মহারাজাদের সময়েও সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার হয়েছে এবং সাধারন মানুষের কথ্য ভাষাকে অচ্ছুতের ভাষা হিসেবে গন্য করেছে।

আমাদের বাংলায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম সাধারন মানুষের সাধারন কথাকে তার গানে, কবিতায়, গল্পে এবং উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। কাজী নজরুল আরো বেশী করে এই রীতিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। নিজের বলা ঘরের কথামালায় যে গান, গল্প, কবিতা আর উপন্যাস হতে পারে সাধারন বাঙ্গালীর তা ছিলো চিন্তার বাহিরে। সংস্কৃতের কঠিণ ভাষায় বা মিশ্রিত বাংলায় গল্প উপন্যাসে সাধারন বাঙ্গালীর মনের খোরাক মিটত না। রাবীন্দ্রীক যুগের পর থেকেই বাঙ্গালী আরো বেশী করে সাহিত্যে মনোনিবেশ করা শুরু করে। নিজের ভাষাকে ভালোবাসতে শেখে। পাকিস্তানী শাসকেরা মনে করেছিলো যেহেতু বাংলার মুসলমানরা মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছিলো এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে নিজেদের জীবনকে বাজী রেখেছিলো তাই মুসলমানিত্বের দোহাই দিয়ে উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে মেনে নিবে। কিন্তু বাঙ্গালী তাদের সেই ধারনাকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে প্রতিবাদে ফেটে পরে প্রথমদিন থেকেই। এইযে ভাষার প্রতি ভালোবাসা এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বকবি এবং কাজী নজরুলের সাহিত্য কর্ম থেকেই। সেইসময় জ্ঞানতাপস ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সহ বাংলার অসংখ্য লেখক সাহিত্যিক কবি ছাত্র শিক্ষক মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিরন্তন চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। রাজনীতিক নেতাদের পাশাপাশি এইসব মহান জ্ঞানীগুনীদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, লেখালেখি, রাস্তায় নেমে আসা সব কিছু এক দাবীর মধ্যে এসে মিলিত হয়েছিলো।

এক্ষেত্রে অন্যান্য সকল ভাষা সৈনিকদের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরন করে ভাষা মতিনের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ভাষা মতিন একটা বাইসাইকেল নিয়ে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার কথা প্রচারের জন্যে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি তাঁর বাইসাইকেল নিয়ে বেড়ীয়ে পরতেন এবং সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ভাষা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে বেড়াতেন। ভাষা মতিনের সেই প্রচার বৃথা যায় নাই। বাহান্নোর ২১ ফেব্রুয়ারীর ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা এবং বুকের রক্ত ঢেলে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা সেই প্রচারেরই এক পর্যায় বলা যায়। সেদিন নেতৃবৃন্দের মতামতকে উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহন এবং রাজপথে বের হয়ে আসা তাঁর এবং তাদের প্রচেষ্টার সার্থকতাকেই প্রমাণ করে।

সেদিনের ভাষা আন্দোলনের বিজয় পরবর্তীতে বাঙ্গালীকে সকল গনতান্ত্রিক আন্দোলনে সাহস যুগিয়েছে। স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা আন্দোলনে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এই একুশ তথা ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের পথ বেয়েই এসেছে। বাঙ্গালী একবার যখন বুকের রক্ত দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছিলো তখন স্বাধীনতার লাল সূর্য টাকেও ছিনিয়ে আনতে পারবে এই বিশ্বাস একুশের কাছ থেকেই পেয়েছে। আজো বাঙ্গালী সেই একুশের কাছে বার বার ফিরে আসে সাহস আর প্রতিরোধের প্রেরণা নিতে। আজো বাঙ্গালীর কাছে একুশ মানে মাথা নত না করা।