ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশে যেদিন থেকে মাত্রিতান্ত্রিক পরিবারগূলো পুরুষ তান্ত্রিক পরিবারে রূপান্তরিত হওয়া শুরু হলো সেদিন থেকেই মুলত নারীদের কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যে নারীর হারিয়ে যাওয়া ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের যাত্রা শুরু হয়।

সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশে নারির অবদান কখনোই খাটো করে দেখার অবকাশ ছিলো না এবং বর্তমানেও নেই। কিন্তু মুলত ব্যক্তি সম্পত্তির উদ্ভব নারীকে ক্রমশই পুরুষের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করতে সহযোগিতা করে। নিজস্ব নারীর সন্তান তার গোত্রের জনশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে, শিকারের পাশাপাশি শস্য উৎপাদনে বা গৃহপালিত পশুর দেখাশুনায় তাদের সাহায্য সহযোগিতা পুরুষকে নারীকে বন্দী করতে উৎসাহী করে তোলে। নারী তার স্বকীয়তা হারিয়ে দিনে দিনে মুলত পুরুষ শাসিত সমাজে দাসীতে আর সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিনত হয়।

কিছু নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে শারীরিক দুর্বলতা এই প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করে তুলেছে। যে নারী সমাজে শস্য উৎপাদনে এবং কাপড় বুননে মানুষকে সভ্য করে তোলার পথে এগিয়ে নিয়ে গেলো সেই পরিনত হলো দাসীতে, তাদের মতামত দেবার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে গৃহপালিত পশুর মতোই সমাজে নিগৃহীত হতে হতে নিজেদের স্বাভাবিকত্ব হারিয়ে ফেলেছিলো। সমাজে তাদের সন্তানদের ব্যাপারেও মতামত দেওয়ার ক্ষমতাও কেঁড়ে নেওয়া হয়েছিলো। প্রতিনিয়ত অবলা পশুর মতো নিজের দুর্দশায় চোখের জলে ভুলে থাকতে চেয়েছে আর ধর্মের দোহাই নিয়ে এই নিকৃষ্ট জীবনকে মেনে নিতে চেয়েছে।

মাঝে মাঝে কিছু পুরুষের বদন্যতায় অথবা নিজেদের ব্যতিক্রমী প্রতিভায় ইতিহাসে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছিলো কিন্তু সেসব শুধুই মানব ইতিহাসের সমুদ্রসম পরিমাপে বিন্দুর মতো। রাজ্য শাসনের মতো ঘটনাও যে ঘটে নাই এমন কথাও বলা যাবে না। কিন্তু আগেই বলেছি তা সিন্ধুর মাঝে বিন্দু সমান। নারীকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে যুদ্ধ হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে অনেক নগর জনপদ কিন্তু সবগুলোই ছিলো নারির সৌন্দয্যকে পুরুষের হাতে করায়ত্ত করার জন্যে। হিন্দু পুরাণে কিছু দেবীর শক্তির কথা উল্লেখ থাকলেও সেই শক্তিও ছিলো নারীর একক ক্ষমতার শক্তি নয় বরঞ্চ সকল দেবতার সন্মিলিত শক্তির আধার হিসেবেই পৃথিবীতে আগমন হয়েছিলো। তাই কোন ইতিহাসেই নারীকে ক্ষমতার আধার হিসেবে তুলে ধরবার কোন প্রচেষ্টাই কোনদিন করা হয় নাই। এরই মাঝে কেটে গেছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। কেটে গেছে হাজার হাজার বছরের পথচলা। বদলে গেছে মানুষের জীবন ধারনের ধরন ধারন, পরিবর্তন এসেছে মানুষের জীবন জীবিকার, বিজ্ঞান এসেছে মানুষ আর তার সভ্যতার আশীর্বাদ হয়ে। অনেক আবিস্কারে মানব জাতি নিজেদের উৎকর্ষতার প্রমাণ রেখেছে কিন্তু পরিবর্তন আসে নি নারী সমাজে। সভ্যতার ক্রমবিকাশে সেই যে নারী বন্দী হয়েছিলো গৃহের চার দেয়ালে, তার থেকে কোন পরিবর্তনই আসে নাই। কিছু পড়াশুনা আর কিছু কিছু কাজের সুযোগ ছাড়া আর কোন পরিবর্তনই পুরুষ শাসিত সমাজ মেনে নেয় নাই বা সুযোগ করে দিতে চায় নাই।

১৮৫৭ সাল এই প্রথম কিছু নারী সমেবেত হওয়ার চেষ্টা চালালো এবং সারা বিশ্বের নজরে এলো।সমাজে নারিদের যথাযোগ্য মর্যাদা এবং সমান সুযোগ সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে প্রথম নিউইয়র্ক শহরের সেলাই শ্রমিকরা তাদের নায্য দাবী আদায়ের লক্ষ্যে রাস্তায় নেমে আসেন। সেই থেকে শুরু হলো নারী আন্দোলনের পথ চলা। ধীরে ধীরে সারা বিশ্বের নারীরা তাদের নায্য দাবী আদায়ে সংঘঠিত হতে শুরু করেন। এরমধ্যে প্যারিসের বাস্তিল দুর্গ পতন এবং প্যারিস বিপ্লব নারী জাগরনেও নারীদের উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব নারীমুক্তি আন্দোলনকে সার্বজনীনতায় রুপ দেয়। এই একশত বছরে নারী তার কাঙ্খিত মুক্তির পথে পুরোপুরি পৌছতে না পারলেও আজ বিশ্বের সকল উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহন সর্ব স্বীকৃত। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার আজ অর্ধেক হলো নাধেকেই অর্ধেক জনসংখ্যাকে ঘরের মধ্যে বন্দী রেখে সমাজ এবং জাতির উন্নয়ন যে সম্ভব নয় তা আজ কারোর অজানা নয়।

কিন্তু আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রারম্ভে এসে নারীকে একদিকে আবারো গৃহ বন্দী করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে একদল ধর্মান্ধ গোষ্ঠী অন্যদিকে লোভী বহুজাতিক কোম্পানীগুলো অধিক মুনাফার জন্যে নারীকে বানাচ্ছে পণ্য। নারী মুক্তির নামে নারীকে খোলামেলা উপস্থাপন করে নারীকে মুনাফা লাভের সহজলভ্য পণ্যে পরিনত করছে। এই সহজলভ্যতা নারীকে করে তুলছে বিপদাপন্ন। সমাজে একশ্রেনীর মানুষ মনে করছে নারী হলো পণ্য, তাই তাকে নিয়ে যেকোণ উপায়ে ব্যবহার করা যায়, নিরীকে পণ্যে পরিনত করার এই আত্মধ্বংসী কর্মকাণ্ডে নারীর উপড় নেমে আসছে বিভিন্ন ধরনের হিংসাত্মক আক্রমন। অন্যদিকে ধর্মান্ধ গোষ্টী যারা প্রতিনিয়তই নারীকে শুধুমাত্র ভোগ্য পণ্য হিসেবে মনে করে আসছে তারা আবার নারীকে গৃহের চার দেয়ালে বন্দীর ফতোয়া জারী করছে।

১৮৫৭ সালে নিউইয়র্ক শহরে গুটিকয়েক সাহসী নারী নারী মুক্তির লক্ষ্যে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন আজ ১৫৯ বছর পরে এসে আবার নারীকে রাস্তায় নামতে হবে নিজেদের পণ্য হবার হাত থেকে বাঁচার লক্ষ্যে, লড়াই করতে হবে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর বন্দী করার হীন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে, টিকে থাকতে হবে পুরুষ নামক কিছু পশুর হাত থেকে নিজেদের বাঁচানোর লক্ষ্যে। সস্তা বিজ্ঞাপনের মোহে পরে শুধুমাত্র কিছু বহুজাতিক কোম্পানীর চাকচিক্যে নিজেদের বিকিয়ে দেবার বোকামী থেকে নারীকেই গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ। নারী কোন পণ্য নয়, নারী একজন মানুষ, একজন পুরুষ যেমন মানুষ, তেমনি একজন নারী মেয়েমানুষ নয়, মানুষ। এই হোক আজকের নারী দিবসের শ্লোগান।