ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

সত্তর দশকের বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসার এক দুঃসাহসিক উদ্যোক্তার নাম লেনিন আজাদ। লেনিন আজাদ একাধারে সমাজবিজ্ঞানী, গবেষক এবং বিপ্লবী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধোত্তর যুগে যখন এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন বহুধা বিভক্ত। কখনো ভুল লাইনে রাজনীতি পরিচালনা, কখনো শ্রেণীশত্রু খতমের নামে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানো আবার কখনো নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে দিন কাটাচ্ছিল সেই সময় বাংলাদেশের পাঁচ ছয়টি বাম ছাত্র সংগঠনের বোধোদয় বাংলাদেশের বাম ছাত্র আন্দোলনে এক নজীরবিহীন পরিবর্তন আনে। সেই সুদুর প্রসারী পরিবর্তনে যে কয়েকজন ছাত্র নেতা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো লেনিন আজাদ ছিলেন তাদের একজন।

বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর এই ঐক্য কিন্তু একদিনে সম্ভব হয় নাই। যেমন হয়নাই দুয়েকটি মিটিং এর সিদ্ধান্তে। সেদিনের বাম রাজনীতির বিভেদ এবং মতানৈক্য সম্বন্ধে যার নূন্যতম জ্ঞান আছে সেই বুঝবে একটি ঐক্যে পৌঁছতে কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিলো।

প্রতিদিন, রাতের পর রাত তর্ক-বিতর্ক, মতদ্বৈধতা আর চুলচেরা বিশ্লেষণ যে পরিমাণে হয়েছিলো তা আজকের দিনে কল্পনাই করা যায় না। এর উপর সেই আশির দশকের প্রারম্ভে আজকের মতো ছিলো না কোন নূন্যতম যোগাযোগের আধুনিকতা।

বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মাঝে বিতর্ক এবং মতভেদ ছিলো প্রবল, মাঝে মাঝে মনে হতো ছাত্র সমাজের এই ঐক্য বোধহয় আর হলো না। কিন্তু লেনিন আজাদ ছিলেন ঐক্যের ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। লেনিন আজাদ সহ সেদিনের ছাত্র নেতৃবৃন্দের ঐকান্তিক চেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছিলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কার্যকর ছাত্র ঐক্য। তৈরী হলো বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী। পরবর্তীতে আরো কিছু ছাত্র সংগঠনের সাথে ঐক্যের পরে তৈরী হয়েছিলো বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।

বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী পরবর্তীতে এদেশের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে, সাম্প্রদায়িকতা এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে এবং সমাজ বদলের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের লাল ঝান্ডা উত্তোলনে বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। জামিল আখতার রতন, ফারুক, জুবায়ের চৌধুরী রিমু, পান্না সহ অসংখ্য মৈত্রী নেতাকর্মী বুকের রক্ত দিয়ে সকল আধিপত্যবাদ, সন্ত্রাস আর স্বাধীনতা বিরোধীদের সকল চক্রান্ত রুখে দিয়েছে। অসংখ্য শহীদের রক্তে ভেজা এই সংগঠনের অন্যতম নেতা ছিলেন আমাদের লেনিন আজাদ। কমরেড লেনিন আজাদ।

লেনিন আজাদ শুধুমাত্র একজন ছাত্র নেতা বা সংগঠকই ছিলেন তাই নয়। তিনি ছিলেন সমাজ বদলের একজন নিবেদিত শ্রমিক। সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে যে আদর্শকে তিনি ধারণ করেছিলেন শৈশবের সূচনা লগ্নে সেই আদর্শকে সারাজীবন লালন করেছেন, কাজ করেছেন সেই আদর্শের জন্য এক শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ গঠনের আন্দোলনে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন কিশোর হয়েও লড়াই করেছিলেন স্বাধীনতার লাল সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনতে। তারপরেও থেমে থাকেন নি লেনিন আজাদ। সমাজ বদলের যে স্বপ্নটাকে তিনি লালন করতেন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে কাজ করে গেছেন মাঠে ময়দানে এবং তাঁর গবেষণাক্ষেত্রে। রাজনৈতিক জীবনে একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। একাধিকবার কারাবরণ করেছেন ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে।

১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানঃ সমাজ রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিষয়ক গবেষণাকর্মের জন্য পি এইচ ডি ডিগ্রী অর্জন তাঁর গবেষণাকর্মের সূচনা। এই গবেষণা কর্মও তাঁর পরিচালিত হয়েছে সমাজ, দেশ এবং এদেশের সাধারণ মানুষকে নিয়ে।

প্রফেসর রেহমান সোবহান, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক হুমায়ন আযাদ, অধ্যাপক এম এম আকাশ এবং ডঃ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সহ দেশের স্বনামধন্য পন্ডিত ব্যক্তিদের সাথে কাজ করেছেন সমাজ এবং দেশটাকে পরোপুরিভাবে বোঝার জন্যে। কাজ করেছেন অধ্যাপক আনিসুর রহমান স্যার এর অনুপ্রেরণায় ভাষা আন্দোলনের উপর। বি আই ডিসির গবেষক হিসেবে ভাষা আন্দোলনের আর্থ সামাজিক পটভূমি শীর্ষক গবেষণা কর্মটি সম্পন্ন করেন। ভাষা আন্দোলনের শেকড় খুজতে গিয়ে তিনি মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস গভীরভাবে জানতে পেরেছিলেন। সেই গবেষণার সূত্র ধরেই ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তার গ্রন্থ ‘ভারতীয় সামন্ততন্ত্র ও মোগল আমলে বাংলার কৃষি কাঠামো’।

এই গবেষণা কাজ করতে যেয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সাথে মিলেছেন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম এর আদমজী পাটকলে শ্রমিক হিসেবে যোগদান তাঁকেও অনুপ্রাণিত করেছিলো এবং তিনিও আদমজী পাটকলে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ নিয়ে শ্রমিকদের সাথে কাজ করেছেন, সেখানে শ্রমিকদের নিয়ে নায্য দাবী আদায়ে আন্দোলন করেছেন।

জীবনের একটি পর্যায়ে এসে তিনি যে সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছিলেন সেই সমাজটাকে আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করবার জন্যে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর এলাকায় উন্নয়ন গবেষণা ফাউন্ডেশন নামে এক গবেষণা সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। অসুস্থ্য হবার আগে পর্যন্ত রাজধানীর জৌলসতা, নাম খ্যাতি আর বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির চাকচিক্যকে পাশ কাটিয়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন গ্রামের মানুষদের বোধকে উপলব্ধি করতে। তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে, তাঁর অর্জিত জ্ঞান আর উপলব্ধিকে গ্রামের সাধারণ কৃষক, মজুর আর শ্রমিকের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার কাজ করে গেছেন। বঞ্চিত মানুষের মুক্তির নিজস্ব ভাষা ও জ্ঞান বিনির্মাণের জন্য অক্লান্ত কাজ করে গেছেন যতক্ষণ সুস্থ্য ছিলেন। সমাজ এবং মানুষের মুক্তির জন্য বঞ্চিত মানুষের নিজস্ব অংশগ্রহণের বিকল্প নেই এই ধারণা সমন্ধে তিনি ছিলেন নিঃসন্দেহ।

লেনিন আজাদ কিডনী রোগে ভুগছিলেন। প্রায় ছয় বছর মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। রেখে গেলেন তার অসংখ্য ভক্ত, গুণগ্রাহী আর বিপ্লবী মিছিলের অসংখ্য সাহসী সহযোদ্ধা।