ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

Bangabandhu-2

“আবে ওই হারামজাদা শাকিল, গাড়ী লাগা”। এইরকম হারামজাদা শাকিলদের দেখা মেলে নগরের সব টেম্পু বা লেগুনা স্ট্যান্ডে। মধ্যবিত্তের দ্রুত চলাচলের একমাত্র ভদ্র এবং সাধ্যের নাগালের বাহন এই টেম্পু বা লেগুনা। আর এইসব টেম্পুতে বা লেগুনায় চড়লেই শাকিলদের পাবেন অবধারিত ভাবে। শাকিল, মিন্টু, শাহাদাত, বা শাওন বা বাদশা অনেক নাম, অনেক শিশু। শহর নগরের টেম্পু বা লেগুনার হেল্পার এইসব শিশু কিশোর।

শাকিল বা বাদশাদের কারো বাবা আছে, মা নেই। আবার কারো মা বাবা দুজনে থাকলেও তাকে দিয়ে রোজগার করানো ছাড়া অন্যকোন পথ থাকে না। তবে বেশীরভাগ শকিলদেরই মা আছে, বাবা যেনো কোথায় হারিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে মা আর অন্যান্য ছোট ছোট ভাইবোনদের মুখ দুটো ভাত তুলে দেওয়ার নিরন্তন সংগ্রামে নেমে পড়তে হয় নিজেদের শিশু আর কৈশোরের সুন্দরতম দিনগুলোর মায়া কাটিয়ে। যে বয়সে শাকিলদের হেসে খেলে বেড়ানোর কথা সেই বয়সে এসে বাস্তবের কষাঘাতে সংসার নামক ঘানীটাকে টেনে নিয়ে যেতে হয় জীবনের ঝুঁকি হাতে নিয়ে।

সকাল ছয়টা থেকে শুরু হয়ে রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত অবিরাম ডিউটিতে কর্মরত এই শিশু বা কিশোর শ্রমিকদের কোন অবসর নেই, বিশ্রাম নেই। শুধু আছে যাওয়া আর আসা। নির্দিষ্ট জায়গার জন্যে প্যাসেঞ্জার ডাকা, চালককে সাহায্য করা, ভাড়া তোলা এবং প্যাসেঞ্জারের চাহিদা মতো স্থানে নামিয়ে দেওয়ার মধ্যেই কেটে যায় সকাল দুপুর আর রাত। শাকিলদের বয়স দশ হতে শুরু করে পনেরো – ষোলো। কিছু ক্ষেত্রে আরো কম বয়সী শিশুকেও এই কাজে দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের জন্য ১৪ বছর পর্যন্ত একজন শিশু হিসেবে গন্য হয়। ১৪ থেকে ১৮ পর্যন্ত কিশোর হিসেবে এবং আঠারো বছরের উপর হলে প্রাপ্ত্য বয়স্ক হিসেবে গন্য করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভাবে ১৫ বছর পর্যন্ত শিশু হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। কোন ১৪ বা ১৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত একজন শিশুকে আপনি শ্রমে নিয়োগ দিতে পারবেন কিন্ত্য প্রথম সর্তই হবে তাকে দিয়ে কোন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে না। এবং সেই শিশু শ্রমিকের কাজের ঘন্টা নির্ধারিত থাকবে মাত্র পাঁচ ঘন্টা এবং অবশ্যি সেইশিশুর পুষ্টিগত খাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে, পড়ালেখা করার ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাধুলার জন্যে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।

আমাদের টেম্পু এবং লেগুনা গুলোতে যেসব হেল্পার কাজ করছে তারা সবাই শিশু বা কিশোর। এইসব শ্রমিকের প্রায় সবাই চৌদ্দ বা পনেরো বছর বয়সের নীচে। এই সব শিশু শ্রমিকেরা প্রতিদিন জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকছে। মহাজন আর ড্রাইভারের মৌখিক বা কায়িক নির্যাতনে প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে।

আমরা শুধু মালিক মহাজন বা ড্রাইভারের কথা বললে খুব কমই বলা হবে। আমরা যারা এইসব টেম্পু বা লেগুনার যাত্রী তাদের দ্বারাও এইসব শিশু কিশোর শ্রমিকেরা দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছে নিয়মিত। টেম্পু বা লেগুনা গুলোর যাত্রীরা এইসব শিশুদের আহবানে ভাড়া তো দিতেই চাই না। একবার বা দুইবার ভাড়া চাইলেই এমনভাবে তাদের প্রতি আচরন করি ম্নে হয় যেনো এরা মানুষের বাচ্চা নয়। এরা যেনো আমাদের কাছে কাঙ্খিত ভাড়া চেয়েই বড়ো অন্যায় করে ফেলেছে।

আমরা না জানতে চাইলেও সত্য যে এইসব শিশু শ্রমিকদের কাছ থেকে ভাড়ার টাকা বুঝে না পেলে মালিক মহাজন বা ড্রাইভাররা তাদের বেতন থেকে সেই টাকা কেটে নেয়।

এইসব শিশু শ্রমিকেরা সারাদিন টেম্পু বা লেগুনার পিছনে যে স্ট্যান্ড থাকে তাতেই চড়ে ডিউটি করে থাকে। এই স্ট্যান্ডটি অনেক সময়েই থাকে অনিরাপদ। এর উপর আমরা দুইজন তিনজন আরো বেশী করে উঠে পড়ি যাতে তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌছতে পারি। কিন্তু একবারো ভাবি না এই টেম্পুর শিশু শ্রমিকটি দাড়ানোর জায়গা পাচ্ছে কিনা। বরঞ্চ আরো বেশী করে শিশু শ্রমিকটাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে হাসতে হাসতে নিজেদের গন্তব্যে চলে যাই।

এইভাবেই আমাদের ঢাকা নগরীর অনেক শিশু কিশোরই ঝুকির মধ্যে কাজ করতে যেয়ে নিজের জীবনটাকে অবলীলায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

১৭ই মার্চ। শিশু দিবস। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের জন্মবার্ষিকী। স্বাধীনতার অব্যাহতি পর থেকে বাংলাদেশ এই দিনটিকে শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। আমরা এই শিশু দিবসে প্রত্যেকেই সাহসী হয়ে উঠি যেনো আমাদের সমাজে শিশু শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত না করি। আমরা জানি আমাদের এই দেশে শিশু শ্রম বন্ধ করার মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠে নাই। শাকিলদের ভরন পোষন করানোর মটো সমাজ ব্যাবস্থা আজো আমরা পাই নি। কিন্তু শাকিলদের মতো শিশু শ্রমিকদের সাথে হাসি মুখে কথা বলতে, তাদের সাথে খারাপ ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে, আর যেনো কোন রাজীব বা লিখন কে অত্যাচারে মরে যেতে না হয় সেব্যাপারে সজাগ অবশ্যই হতে পারি।

শিশু দিবসের এই ক্ষনে আমরা সবাই শিশুদের প্রতি সদয় হই এই প্রতিজ্ঞা তো আমরা করতেই পারি।