ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

এবার কুমিল্লার সেনানিবাসের ভিতরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তনু ধর্ষিত হলো এবং খুন হলো। দেশের সবচেয়ে নিরাপদ এলাকায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্রীকে হতে হলো ধর্ষিত এবং নিহত। আমরা ক্রমশই কোথায় চলেছি কেউ জানি না। এই ধর্ষণ আজ আর কোন বিচ্ছিন্ন বা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন দুর্ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন শ্রেনীর বিভিন্ন বয়েসের মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। একদিকে ধর্ষণ অন্যদিকে বিভিন্ন মতাবলম্বী ধর্মীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হত্যার শিকার হয়েই চলেছেন। এ কীসের আলামত তা এখনো পর্যন্ত রহস্যজালেই আটকা পরে রয়েছে।

একেকটি মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে, খুন হচ্ছে, আমরা প্রতিবাদ করছি, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে মতামত দিচ্ছি, মানববন্ধন করছি, স্মারকলিপি দিচ্ছি। তারপরে সব চুপচাপ। আবার কিছুদিন পরে হয় দিনাজপুরে নাহয় রংপুর নাহয় তনুর মতো কোন সুরক্ষিত সেনানিবাসে ধর্ষিত হয়ে মারা যাচ্ছে। সেই ধর্ষণ এবং খুন নিয়ে তোলপাড় তুলছি গোটা দেশ জুড়ে। কিন্তু থামছে না ধর্ষণ, থামছে না খুন।

তনুর কাছে আমরা মাফ চাইতে পারি, আমরা সমবেত হয়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে পারি কিন্তূ প্রশাসনের ঘুম কবে ভাংবে তা জানি না।

গত কয়েকদিন আগে ডঃ মাহাবুব উল্লাহ স্যারের এক লেখা পড়ে ভালো লেগেছে। আমরা সবাই কালের গতি তাল মিলিয়ে আধুনিক হয়ে উঠার প্রতিযোগিতায় সামিল হচ্ছি। ইন্টারনেটের দ্বারা প্রত্যেকদিন নিজেদের সারা দুনিয়ার সাথে মিলিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতায় একজন আরেকজনকে পিছনে ফেলবার চেষ্টায় ইঁদুর দৌড় দৌড়াচ্ছি। কিন্তু মন মানসিকতায় কোন পরিবর্তন আনতে পারছি না। সমাজে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীটা সবসময় সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখতো সেই মধ্যবিত্ত সমাজ আজ বিলুপ্তির পথে। শুধুমাত্র জিন্স প্যান্ট আর টিস্যু পেপার ইউজেই আজ মধ্যবিত্ত তার কালচারকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। আগের সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণী তার মন মানসিকতায় হারিয়ে ফেলেছে।

যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী একসময় এদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা গ্রহন করেছিলো, সেই বাংলাদেশ আজ ধর্ষণের দেশে, জঙ্গীগোষ্ঠির দেশে পরিনত হচ্ছে। মননশীলতায়, সৃষ্টি শীলতায় মধ্যবিত্ত শ্রেনী তার নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। যেদিন থেকে আমাদের দেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ী গোষ্ঠি আসন গেড়েছে সেদিন থেকেই সমাজের মূল্যবোধ হরিয়ে যেতে বসেছে। ব্যবসায়ী যখন বনিকের আসনের সাথে রাজার আসনও গ্রহণ করে তখন সমাজে তার প্রতিফলন ঘটবেই। এই হত্যা, খুন, রাহাজানী, লুঠাপাঠ আর ধর্ষণের ঘটোনাই এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

এদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে এরশাদ বিরোধী রাজনীতির সময়েও দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো। যার ফলশ্রুতিতে নব্বই দশকের শুরুতেও সামাজের এতো অবক্ষয় দেখা যায় যায় নাই। দেশে তখনো ধর্মাশ্রয়ী দলগুলো বাংলাদেশকে পিছিয়ে নেবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো কিন্তু মধ্যবিত্তের সজাগ দৃষ্টি তাদের সেই ষড়যন্ত্রকে সফল হতে দেয় নাই। আজ যখন দেশের রাজনীতি সম্পূর্ণ ভাবে ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে তখন ধর্মাশ্রয়ী জঙ্গীগোষ্ঠী এবং সমাজে ওত পেতে থাকা স্বাপদেরা নির্ভয়ে চলাচল করছে। ধর্ষণ খুন, লুঠপাঠ, গলা কাটা সবই জায়েজ হয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীর রাজনীতির হিসেব নিকাসে।

আমরা লজ্জিত তনু। আমরা ক্ষমা প্রাথী। আমরা সেনানিবাসের মতো সূরক্ষিত এলেকাতেও তোমাকে রক্ষা করতে আজ অপারগ। ব্যবসায়ী এই রাজনৈতিক পরিমন্ডলে তোমাদের আমাদের সবকিছুই নিরধারিত হয় নগদ নারায়ণে। তোমার ধর্ষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কতোটুকু লাভ হবে বা ক্ষতি হবে সেটা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত এই ধর্ষণ, এই খুন, এই লুঠপাট চলতেই থাকবে। আমরা যারা তোমাদের সম্ভ্রম হানীতে বা তোমার মৃত্যুতে প্রতিবাদী হয়ে উঠি বা বিক্ষোভে ফেটে পরি তাও স্তিমিত হয়ে যাবে সময়ের কালযাত্রায়। হয়তো আরো কোন এক সকালে বা দুপুরে বা রাত্রে আরো এক তনু বা তাঁরা ধর্ষিত হলে বা খুন হলে য়াবারো ফেটে পরবো প্রতিবাদে ঘৃণায়।

রাজনীতির এই ক্ষমতায় যাওয়া আর আসার মাঝে যতদিন ব্যবসায়ীরা প্রনিধান হয়ে থাকবে ততোদিন তনুদের ধর্ষিত হতে হবে, খুন হতে হবে এবং নানারকম বাদবিতন্ডা চলতেই থাকবে। কখনো নারী দোষ দিবে পুরুষকে, আর পুরুষ বলবে নারী তার চাল চলনে ধর্ষণে উৎসাহী করেছে।