ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমরা বাঙ্গালীরা হুজুগে জাতি। যখন যেটা নিয়ে লাগি সেটাতেই মনোনিবেশ করি। আমরা সবাই হুজুগে চলি। তাই কানের পাশ দিয়ে এক হাজার ধর্ষণ হলেও কিছু করার নাই। কারণ এখন আমরা ব্যস্ত তনু কে নিয়ে। তারপরে আবার কোন ঘটনা আমাদের চিত্ত কে নাড়িয়ে দিয়ে গেলে তখন তা নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করি। মাঝ খানে অনেক কিছুই ঘটে যায় কিন্তু আমরা নজর দিতে চাই না। এখন আমরা তনু হত্যা এবং ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছি। সারাদেশ ব্যাপী তুনু হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছি। তনু হত্যা এবং ধর্ষণের বিচার আমরা চাই।  আমরা চাই আর কোন তনুকে এমন নির্মম ভাবে প্রাণ দিতে না হয়, আর কোন বোনের সম্ভ্রম হানী যেনো না ঘটে। প্রতিদিন এখন সংবাদ পত্র খুললেই ধর্ষণ, খুন আর নির্যাতনের সংবাদ আমাদেরকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

তনু হত্যাকান্ডের পরপর বেশ কিছু হত্যা এবং ধর্ষণ ঘটে গেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। এইসব হত্যাকান্ড এবং ধর্ষণএর ঘটনা কোন অংশেই তনুর হত্যাকান্ডের চেয়ে কম নিশংস্ব নয়। অথচ আমাদের প্রতিবাদের ভাষা পড়লে মনে হবে বাংলাদেশে শুধুমাত্র তনু খুন হয়েছে এবং ধর্ষিত হয়েছিলো। তনু কলেজের ছাত্রী এবং সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলো বলেই কি এতো প্রতিবাদ এতো সমর্থন! অন্যদিকে সাধারন নারীদের ক্ষেত্রে আমাদের দায়ীত্ববোধ একেবারেই নেই। হয়তো বলতে পারে তনু হত্যার প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আমরা অন্যান্য হত্যা, গুম, ধর্ষণ আর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাচ্ছি বা এর প্রতিকার চাচ্ছি।

এরমধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বিষয়। বাংলাদেশের বিশ্ববেহায়া রাষ্ট্রপতি স্বৈরশাসক হোমো এরশাদ ১৯৮৮ সালে আমাদের সংবিধানে তার নোংরা রাজনীতির কৌশল হিসেবে ইসলাম কে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংযোজন করেন। তিনি নিজে ছিলেন একনাম্বার লুচ্চা এবং চরিত্রহীন কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিকে কঠিণ করে তোলার জন্য  এই আইনটি সংবিধানে সংযোজন করে দিয়ে যান। যখন এই বিলটি পাশ হয় তখন থেকেই এদেশের ছাত্র সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িক জনগন এটা মেনে নিতে পারেন নাই। সেইসময় ১৫জন বিশিষ্ঠ নাগরিক এক সংঘঠনের মাধ্যমে আদালতে এর যৌক্তিকতা এবং বাতিল চেয়ে রিট করেন। এরপরে ২৮ টি বছর চলে গেছে। স্বৈরাচারী এরশাদ গণঅভ্যুত্থান এর মধ্য দিয়ে উচ্ছেদ হয়েছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দুইবার বিএনপি এবং বিএনপি জামাত জোট ক্ষমতায় এসেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছেন এ নিয়ে তিনবাব, শুধু তাই নয় এর মধ্যে তিনবার তও্বাবধায়ক সরকার নামক অদ্ভুত ধরনের সরকার জনগন দেখেছে। কিন্তু এই আটাইশ বছরে একবারও এই বিষয় নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় নাই।

বাংলাদেশের কিছু বাম সংঘটন এই আইনের সংযোজনের বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিবাদ করেছে এবং করে আসছে। তবে  তাদের সামর্থ্য কম থাকায় কোন আন্দোলন জমিয়ে তুলতে পারেন নাই।

গত ২৮শে মার্চ গত ২৮ বছর আগের রিটের শুনানীর দিন ধার্য করা হয়েছিলো। সেইদিন মাননীয় আদালত হঠাত করেই বলেছেন এই রিট যথাযথ মাধ্যমে করা হয় নাই। মহামান্য আদালত বলেছে কোন সংঘঠনের এই বিষয়ে রিট করার এক্তিয়ার নেই। অতএব এই মামলাটি খারিজ করে দেওয়া হলো।

ব্যস শুরু হয়ে গেলো জনগনের প্রতিবাদের ঝড়। যেনো মনে হলো বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার গত ২৮ শে মার্চ ২০১৬ তে রাষ্ট্রধর্মকে সংবিধানে সংযোজন করেছে। বাংলাদেশ এখন শরিয়া আইন চালু করলেই হয়, বাংলাদেশ আর বাসযোগ্য নেই এমন অনেক কথার ফুলঝুরিতে ভরে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যম গুলোর পাতার পর পাতা।

একটি দেশের কোন ধর্ম থাকতে পারে না। দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন ধর্মের প্রতি আনুগত্য থাকতে পারে এবং থাকেও। ধর্ম ছাড়া পৃথিবীতে মানূষ নেই বললেই চলে। যারা নিজেদের ধর্মহীন হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চান তারাও বলে থকেন তাদের ধর্ম হলো মানব ধর্ম। সেক্ষেত্রে ধর্ম বিহীন কোন মানুষ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকবে এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। পৃথিবীতে মাত্র চারটি দেশে রাষ্ট্র ধর্ম সংবিধানে আছে। আর কোন মুসলমান দেশেও রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে ইসলামকে সংবিধানে সংযোজন করা হয় নাই।

ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম যে সংবিধান বা সনদ তৈরী হয়েছিলো সেখানেও প্রতিটি ধর্মকে স্বীকার করে নিয়েই রচিত হয়েছিলো। এসবই পুরানো ঘটনা এবং ইতিহাস। এসব ব্যাপারে সবাই অবগত আছে। বাংলাদেশের  সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্মম হিসেবে ইসলামকে সংবিধানে সংযোজন শুধুমাত্র এরশাদ এবং জিয়াউর রহমানদের মতো সামরিক স্বৈরাচার দের নোংরা রাজনীতির এক কৌশল ছাড়া আর কিছুই না। ধর্ম প্রাণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় ধর্মের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিকে নোংরামীতে পরিনত করার হীন চক্রান্তের ফসল এই পদক্ষেপ।

রাষ্ট্রের কোন ধর্ম নেই। যদি থাক্তো তবে আজ থেকে চৌদ্দ শত বছর আগেই তা হতো। কিন্তু তা হয় নাই। কারণ ইস্লামই সর্বশেষ ধর্ম। রাষ্ট্র ধর্মের ব্যাপারে আমিও বিরোধী। কিন্তু আজ যখন কোর্ট মামলাটই আবেদনের ত্রুটি দেখিয়ে খারিজ করেছে তখন আমরা সোচ্চার হচ্ছি। সোচ্চার হচ্ছি দেশ পাকিস্তান হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। কিন্তু এই রাষ্ট্র ধর্ম আমাদের সংবিধানে কিন্তু ৮৮ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সংযোজন করেছিলো। যা আজো বহাল আছে। গত দিঙ্গুলিতেও ছিলো। এটা নতুন কিছু না। আমরা এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারি, প্রতিরোধ করতে পারি কিন্তু তাই বলে এইটা নিয়ে নোংরা রাজনীতি করে মৌলবাদী এবং জঙ্গী গোষ্ঠী গুলোর হাতে নতুন ইস্যু তুলে দিতে পারি না।

আজকে যারা রাষ্ট্র ধর্মের মামলা খারিজের বিরুদ্ধে সরকারের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে নেমেছেন তারাই কিন্তু ভোটের সময় এই আওয়ামী লীগ বা বিএনপি জামাত জোটের পক্ষে ভোট দেন। বাঙ্গালী এখন তনু হত্যা এবং রাষ্ট্র ধর্ম নিয়ে উথাল পাতাল হয়েছে অন্য কোনদিকে মনোযোগ দেবার সময় নেই। সরকারো তাই চাইছিলো। আমাদের দেশে বরতমানে যে বিরোধী দল আছে তারা ব্যস্ত তাদের নিজেদের রক্ষার কাজ। এদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারলো না। সরকার জনগনের সমস্ত মনোযোগ তনু আর রাষ্ট্র ধর্ম মামলা খারিজের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়ে নিজেদের রাজনীতিকে আবার নিস্কণ্টক করে রাখলো।