ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

আমার মা যখন ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে যে চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চিকিৎসা শুরু হয়েছিলো তা নিয়ে অনেকদিন আগে থেকেই ইচ্ছে ছিলো কিছু লিখবো। কিন্তু লেখা হয়ে উঠে নাই। প্রথমতঃ মনে হয়েছে কি হবে লিখে, অবশ্য সেই পঁচানব্বই সালে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনকার মতো এতো উন্নত হয়ে উঠছিলো না। এরপরে অনেক বছর চলে গেছে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে চিকিৎসা নিয়ে আমার মা মোটামুটি সুস্থ্য হয়ে ফিরে এসেছিলেন। এবং বছর পাচেক পরে তিনি মারা যান। পরে আর সেই বিষয় নিয়ে লেখার সাধ জাগে নাই। কিন্তু আজ এই ২০১৬ সালে এসেও যখন দেখি বাংলাদেশের চিকিৎসা সে স্তরেই থেকে গেছে তখন মনের মধ্যে যে লেখার আশা ছিলো তা আর চেপে রখতে পারলাম না।

অনেক বড়ো বড়ো হাঁসপাতাল এবং ক্লিনিকে ভরে গেছে ঢাকা নগরী সহ সারা বাংলাদেশ। বহুতল ভবন আর পাঁচ তারা সুবিধা সম্বলিত হাঁসপাতাল আজ হাতের নাগালে। মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের সেইসব হাঁসপাতালে চিকিৎসা নেবার সুযোগ না থাকলেও মনে করতাম হয়তো উচ্চবিত্তরা এই হাসপাতালগুলো থেকে অবশ্যই সেরা সেবাটা বা সুবিধাটি পাচ্ছেন। হাসপাতালগুলোর চাকচিক্য আর বাহারি ডিজাইনের বিল্ডিংএ সাধারণ মানুষগুলোর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। অনেকে নিজের জমি জিরাত বেঁচে দিয়ে হলেও ছুটে আসেন এইসব হাসপাতালগুলোতে। যদি ভালো চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য হয়ে বাসায় ফিরতে পারেন। অবশ্য এইসব হাসপাতালে যারাই আসেন তাদেরকে আগেই সাতদিনের টাকা জমা দিতে হয়। এই ব্যবস্থা মনে করেছিলাম আমাদের মতো সাধারনের জন্যে। কর্তৃপক্ষের ভয় থাকে যদি আমরা পয়সা না দিতে পারি তাই আগে ভাগেই টাকা টা নিয়ে রাখেন। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নইম নিজাম ভাইয়ের সাথেও যে একই ব্যবহার করবে পরিচয় জানার পরেও তা ভাবি নি।  সেক্ষেত্রে আমরা তো কোন ছার।

এবার কিছু গল্প বলি-

এক, সাদমান। ঢাকা নগরীর খুবই দামী এক স্কুলের ছাত্র। এবার মে মাসে ও’লেভেল দিবে। কিছুদিন ধরে জ্বর আর পেট ব্যথা, বাবা পান্থপথের এক পাঁচ তারকা হাসপাতালে নিয়ে গেলেন চিকিৎসার জন্যে। ডাক্তার কিছু ওষুধ দিয়ে দিলেন। এর কিছুদিনের মধ্যে বাচ্চাটা আবার এলো সেই একই হাসপাতালে একই কমপ্লেইন নিয়ে। হাসপাতালের করতব্যরত ডাক্তার বললেন টাকা পয়সা জমা দিয়ে বাচ্চাটিকে ভর্তি করে দিন। পরেরদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাচ্চাটির মাকে বললো যে বাচ্চা টিকে লাইফ সাপোর্ট দিতে হবে। বাচ্চাটির লাইফ সাপোর্ট এ সাতদিন থাকার পরেও যখন তার পেট ব্যথা এবং বমি সহ জ্বর কমছে না এবং কোনই উন্নতি ধরা পরছে না তখন বাচ্চাটির মা ডাক্তারদের বললেন বাচ্চাটির রক্ত পরীক্ষা করেছেন? বাচ্চাটি কি জন্ডিসে ভুগছে? এই কথায় ডাক্তাররা বললেন ঠিক কথা বলেছেন। আসলেই তো রক্ত পরীক্ষা করা দরকার। আহা কী চিকিৎসা ব্যবস্থা। সাতদিন ধরে লাইফ সাপোর্টে থাকা বাচ্চার তখনো পর্যন্ত রক্ত পরীক্ষাই হয় না। সাদমান প্রায় দশদিন লাইফ সাপোর্ট এবং দুইদিন আই,সি ইউ তে কাটিয়ে কেবিনে ফিরে এলো। কিছুটা সুস্থ্য হয়ে এলে তার বাবা তাকে জাপান নিয়ে যান। সেখান থেকে পুরো পুরি সুস্থ্য হয়ে সে ফিরে এসেছে। সাদমান এবার ও’ লেভেলের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের পাঁচ তারকা হাসপাতাল তার রোগ ধরতেই হিমসিম খেয়েছিলো।

দুই, তাসপিয়ার মা। অনেক অসুস্থ্যতা নিয়ে ভর্তি হলেন ছায়ানটের পিছনের এক হাসপাতালে। অনেক রংচঙ্গা বিজ্ঞাপনের দ্বারা প্রভাবিত এই হাসপাতাল ঢাকা নগরের এক শ্রেণীর মানুষের কাছে খুবই আদরনীয়। যা হোক সেই হাসপাতাল তাসপিয়ার মাকে ডায়াগনস্টিক করে ভর্তি করে নিলো এবং চিকিৎসা শুরু করে দিলো। প্রতিদিন অনেক ঔষুধের সাথে এক কাপ করে কড লিভারের তেল খেতে দেওয়া হলো। বেচারী দীর্ঘ দিন এই অকথ্য কড অয়েল খেতে খেতে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে গেলেন। পরিশেষে লন্ডনে যেয়ে ডাক্তার দেখালে ডাক্তার বললেন এই কড লিভার অয়েল কে খেতে বলেছে? তিনিও সুস্থ্য হয়ে দেশে ফিরেছেন।

তিন, শুক্রবার ছুটির দিন। সকালে ফোন। শুনলাম আমার ছেলের বন্ধুর মা মারা গিয়েছেন। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। ছেলের বন্ধুটির নাম সাজিদা। সাজিদার মাকে সেই ছায়ানটের পিছনের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ডাক্তার প্রথমে বলেছে সব শেষ। মেয়ের কান্নাকাটিতে  ডাক্তাররা শেষ চেষ্টা হিসেবে আই সি ইউ তে নিয়ে যান, এরপরে লাইফ সাপোর্ট দেন। গতকাল রাতে শুনলাম সাজিদার মায়ের হার্ট বিট পাওয়া যাচ্ছে। তবে খুবই ক্ষীণ। জানিনা তিনি সুস্থ্য হবেন কিনা। জানিনা উনার হায়াত আছে কিনা। তবে আমাদের প্রশ্ন শুক্রবারের সকালে সাজিদার কান্নায় যদি সাজিদার মাকে আই সি ইউ তে না নেওয়া হতো তবে কি তাঁকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে দাফন সম্পন্ন করা হতো?

(এই লেখা টি প্রকাশের আগেই সাজিদার মা মারা গেছেন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি) ইন্না লিল্লাহে…… রাজিউন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন জিরাবো বাজারের কাছে মহিয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন্নেসা হাসপাতালের উদ্বোধনে বলেছেন তিনি আর বিদেশে চিকিৎসা নিতে চান না। তিনি দেশের হাসপাতালেই চিকিৎসা নিবেন। সেই সুবিধা এখন বাংলাদেশে বিদ্যমান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার জন্যে কোন অসুবিধা নেই। আপনার চিকিৎসার সময় বাংলাদেশের সকল চিকিৎসাকের নজর থাকবে আপনার উপর, সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কিনা বারবার খেয়াল করবে। কিন্তু সাধারনের অবস্থা উপরের তিনটি গল্পের মতোই । সেখানে সাধারণের প্রবেশ সর্ত সাপেক্ষ, সঠিক চিকিৎসার অভাব এবং সামর্থ্য আছে কি নেই সেটাও প্রধান প্রশ্ন। উপরের তিনটি গল্পের সবাই কিন্তু সমাজের পয়সা ওয়ালা মানুষ। তাদের চিকিৎসায় ব্যয় কোন ব্যাপার না। সঠিক চিকিৎসাটাই প্রধান। সেই সঠিক চিকিৎসাটাই কিন্তু তারা পান নাই। চিকিৎসা ব্যবস্থা মানুষের জীবন মরণের প্রশ্ন। একজন ডাক্তার এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা না থাকলে একটা দেশের কোন উন্নয়নের জোয়ারই মানুষের কাজে লাগবে না।

আমরা জানি বাংলাদেশের অনেক চিকিৎসাক আছেন যারা দেশ বিদেশে অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন। সেক্ষেত্রে নিজের দেশে তাঁরা তাদের সেই সুনামের কিছুটা ছোঁয়া কেনো দিচ্ছেন না তাই বুঝে পাই না। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কে সাধারনের নাগালে আনতে হবে, সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতি বছর কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা চিকিৎসার জন্যে দেশের বাহিরে চলে যাচ্ছে। শুধুমাত্র সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের অভাবে দেশের মানুষ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর আস্থা আনতে পারছে না। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা জরুরী হয়ে উঠেছে।