ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

বাঙ্গালীর জাতিয় উৎসব পহেলা বৈশাখ আসছে। প্রায় দ্বারপ্রান্তে আসা নববর্ষকে বরন করতে সারা বাংলাদেশ নানা আয়োজনে, অনুষ্ঠানে প্রস্তুত হয়েছে। সম্রাট আকবর ফসলের খাজনা আদায়ের নিমিত্তে ফসলী সন বিন্নাসের যে উদ্যোগ গ্রহন করেছিলেন তারই বাস্তবায়ন এই পহেলা বৈশাখ। প্রথমদিকে চৈত্র মাস কে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হলেও পরবর্তীতে বৈশাখকে বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হয়, যেহেতু হিজরী সনকে ভিত্তি সন হিসেবে ধরে বাংলা সনের চালু তাই ৯৩৬ হিজরী থেকেই বাংলা সনের শুরু হয়। সেই হিসেবে ৯৩৬ বঙ্গাব্দ থেকেই বৈশাখ মাস থেকে বাংলা সনের উদ্ভব। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ অনুযায়ী ৯১২ হিজরী সালে সম্রাট আকবর এই বিষয়ে নিরদেশনা দেন। আর ৯৩৬ হিজরীতে এসে তার বাস্তবায়ন হয়। এই ব্যাবস্থা বাস্তবায়নে ইরানের জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজী সম্রাটের নির্দেশে কাজ করেন ( সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১২ই এপ্রিল, ২০১৬)।

বাংলাসনের উদ্ভব হয়েছে ফসলের খাজনা প্রদানকে কেন্দ্র করে। চান্দ্র মাস কে কেন্দ্র করে কৃষক খাজনা পরিশোধ করতো। কিন্তু চান্দ্র মাসের সঙ্গে ঋতু চক্রের গড়মিল হতে শুরু করায় সম্রাট একটি নতুন সনের উদ্ভাবনের চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। এখানে এই বাংলা সন উদ্ভাবনের সঙ্গে কোন ধমীয় অনুভুতি বা কালচারের প্রশ্ন কোনদিনও আসে নাই। আজ যারা পহেলা বৈশাখকে হিন্দু কালচারের অংশ বলে চেচামেচি করছে তারা মুলত অজ্ঞতার স্থান থেকেই করে চলেছেন। হিন্দু কালচারের অংশ যদি এই বর্ষবরন হতো তাহলে সেটা অবশ্যই কয়েক হাজার বছরের পুরানো হতো, সেক্ষেত্রে বাংলা সনের নতুন করে উদ্ভাবনের প্রয়োজন পরতো না।

নওরোজ ফার্সি সমাজের বর্ষবরণ। ইরান, ইরাক, আফগানস্থান, তুরকেমেনিস্থান, আজারবাইজান, পাকিস্তানের কিছু অংশ এবং ভারতের কিছু অংশে এই নওরোজ পালন করা হয়ে থাকে। প্রতি বছর ২১ মার্চ এই নওরোজ পালন করা হয়। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর বিপ্লবী সরকার এই নওরোজ পালন বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারাও ব্যর্থ হয়ে নওরোজ পালনে অভ্যস্ত হয়ে পরেছেন। নওরোজ ফার্সিদের জাতীয় উৎসব। আজ সারা পৃথিবীর এক বিশাল অংশ নওরোজ উৎসবে মেতে উঠে। নওরোজ উৎসবের সাথে ধর্মের কোন  বিরোধ নেই।

শুধুমাত্র আমাদের দেশের কিছু অতি উৎসাহী ধর্মীয় নেতা এবং কিছু অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী ব্যক্তি অসাধু উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের জাতির  নববর্ষকে ধর্মীয় লেভেল লাগিয়ে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এরা কিছু না জেনে, না বুঝেই নববর্ষের বিরোধীতা করে থাকে। এরা বাংলা বর্ষ বরনের বিরোধীতা করে কিন্তু ইংরাজী নববর্ষের দিনে বড়ো বড়ো শুভেচ্ছা পাঠিয়ে উদযাপন করে থাকেন।

স্বাধীনতার পর থেকে খুবই উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ পালন হয়ে আসছে। সামরিক শাসকদের আমল থেকেই শুরু হয়েছে পাকিস্থান আমলের ন্যায় বাংলার বর্ষ বরনকে নিয়ে নানান ষড়যন্ত্র। পহেলা বৈশাখ হিন্দুদের, হিন্দু সংস্কৃতির অংশ, এইসব মুসলিম ধর্মের সাথে চলে না বিভিন্ন আজগুবী মতাদর্শে এর মাহাত্মকে ম্লান করার চেস্টা চালিয়ে আসছে। এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ পহেলা বৈশাখকে হিন্দু ধর্মের লেভেল লাগিয়ে সব রকম অপচেস্টা চালিয়েও যখন ব্যর্থ হয়েছে তখন তারা গ্রেনেড হামলা করে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলো। অথচ গ্রেনেড হামলার পরের বছর আরো দ্বিগুণ উৎসাহে জনগন পহেলা বৈশাখকে বরন করে নিতে দলমত নির্বিশেষে ঝাপিয়ে পরেছে। এর পরে শুরু হলো নানারকম ষড়যন্ত্র। পহেলা বৈশাখের উৎসবে মা বোন যৌন হয়রানি তা্দের সর্বশেষ অপচেষ্টা।

গতবছর বিকেলে একদল যুবক পহেলা বৈশাখের উৎসবে পরিকল্পিত ভাবে মা বোনদের উপর যৌণ হররানী করে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে কলঙ্কিত করার অপচেস্টায় নামে। এবার সেই অপচেস্টার ফলাফল হাতে নাতে পেয়ে গেছে সেইসব ধর্মীয় ব্যবসায়ীরা। সামাজিক মাধ্যমে যেমন আপামর মানুষ এই যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। ঠিক তার পাশাপাশি স্বার্থান্বেষী মহল এই যৌন হয়রানীকে পুজি করে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান বন্ধের পাঁয়তারা করে চলেছে। তার সাথে সাথে সরকারে ঘাপ্টি মেরে থাকা কিছু শয়তান এবং সরকারের  কিছু অঙ্গ সংঘঠন পহেলা বৈশাখের উৎসব কে সংকুচিত করে তোলার গান গাইতে শুরু করেছেন।

পহেলা বৈশাখ হলো বাঙ্গালীর একমাত্র সার্বজনীন উৎসব। এই উৎসব কোন ধর্ম বিশেষের নয়, এই উৎসবে কোন দলাদলি নেই, এ শুধুই নিজেদের সংস্কৃতির এক মহা মিলন উৎসব। গত ৫২০ বছর ধরে ফসলের মাঠের উৎপাদিত ফসলের সাথে সাথে এই উৎসব হয়ে  আসছে। খাজনা পরিশোধ থেকে শুরু করে বিগত বছরের ব্যবসার হিসেব নিকেশ ঝালাই করে নতুন খাতা চালুর মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ তাদের নতুন করে পথ চলা শুরু করেছে। সেখানে তারা তাদের নিজ ধর্মের আচার অনুষ্ঠান কে সংযোজন করেছে, কিছু বিয়োজন করেছে কিন্তু সবই সেই পহেলা বৈশাখের আনন্দকে ধরে রেখেই। গ্রাম বাংলার হাটে ঘাটে মাঠে মেলা বসিয়ে, জারী সারী যাত্রা গান আর পালা গানের আসর বসিয়ে নিজেদের রাঙ্গিয়ে নিয়েছে নিজেদের মতো করে। সেই রঙের আমেজেই সারা বছর আবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদন করেছে ফসল, করেছে ব্যবসা, সেই সাথে পরিশোধ করেছে নিজেদের বকেয়া খাজনা। যার রেশ ধরে আজো পথ চলছে বাংলা কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ আর ছোট খাটো ব্যবসায়ি সমাজ।