ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

পঁচিশে বৈশাখ কবিগুরুর ১৫৫তম জন্মতিথি উদযাপিত হলো সারা পৃথিবী ব্যাপি। বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলায় কবিগুরুর জন্মদিন এবং তিরোধান দিবস মোটামুটি ভালো ভাবেই উদযাপিত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে ইদানীং এই দুইদিনের যে কর্মসূচী আমরা গ্রহণ করি তাতে বেশ একদিনের আড়ম্বরতা ভালোই থাকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র দিবস পালনের মধ্য দিয়ে স্মরণীয় হতে পারেন না। যারা আজকে রবীন্দ্র সংগীত নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছে, রক বা র‍্যাপকে সংযোজন করছে তারাও কিন্তু একধরনের ভালো লাগা থেকেই করছে। সেইসাথে আমরা যারা রবীন্দ্রনাথের মৌলিকতা বজায় রাখার কথা বলে মাঠ গরম করছি তারা কিন্তু কিছু না করেই করছি।

রবীন্দ্রনাথ নিজ উজ্জ্বলে উজ্জ্বলিত থাকবেন যদি তার বাণী, কথা, দর্শন এবং জীবন যাপনের সাধারনত্বকে ধারণ করে সমাজের বৈষম্য দূর করার কাজে নিয়োজিত হতে পারি তবেই রবীন্দ্রনাথকে আমাদের মাঝে অবিকৃত রূপেই আমাদের মাঝে রেখে দিতে পারবো। কোন ক্ষনিক মোহ বা উদ্দাম রবীন্দ্র ভাবনার পরিবরতন বা পরিবর্ধন করতে পারবে না।

দুই বাংলাতেই বেশ কিছুদিন ধরে রবীন্দ্র সংগীতের উপর ইয়ং জেনারেশন বিভিন্ন কাজ করে আসছে। সংগীতে বিদেশী যন্ত্রপাতির ব্যবহার অবশ্য অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছিলো। এরপরে শুরু হলো অনেকটা রক স্টাইলে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশনা। এতে অনেকেই সুর অবিকৃত রেখেই গান করার চেষ্টা করেছেন আবার অনেকে গানের ভিতর র‌্যাপ স্টাইলে কথা ঢুকিয়েছেন। এতে করে রবীন্দ্র সংগীতের যে আবহমানতা তা ক্ষুন্ন হয়েছে। সংগীতে এক্সপেরিমেন্ট নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন গানের মধ্যে কিছু সংযোজন করতে যেয়ে গানের ভাব চেঞ্জ হয়ে যায় তখনই প্রশ্ন আসে রবীন্দ্র সংগীতের আধুনিকায়তন প্রয়োজন আসে কি নেই। একটি গানের রেশ বা রবীন্দ্র সংগীতের আবেদব নির্ভর করে তার মেলোডি, তার আবেদন এসবের উপর। এপর্যন্ত বহু আধুনিক গান সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু টিকে থেকেছে কয়দিন। কিন্তু রবীন্দ্র সংগীতের পুরানো উপস্থাপনার গান আজো সমান জনপ্রিয়। রবীন্দ্র সংগিতের উপর এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে হোক, এতে করে বাধা দেওয়ার মতো প্রভাব ফেলতে পারে নাই। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির জীবনে এতো ব্যপকভাবে মিশে আছেন তাতে করে দুই একটা পরীক্ষা রবীন্দ্রনাথের গানকে প্রভাবিত করতে পারবে না।

রবীন্দ্র সংগীতকে বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন শুরু হয়েছে খোদ তার জন্মভূমি পশ্চিম বাংলাতেই। বরঞ্চ আমরা বাংলাদেশিরা কবিগুরুকে যথেষ্ট সন্মান এবং অবিকৃত রেখেই চর্চা করে আসছি। একটা সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রসংগীত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীরাই গেয়ে এসেছেন। ভারতে আশাজী, কিশোর কুমার সহ বিভিন্ন আধুনিক গানের শিল্পীদের এলবাম বের হলেও আমাদের দেশে অনেক প্রথিতযশা শিল্পীও এই কাজটি করেন নাই।

পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন সিনেমায় আধুনিক গানের সাথে মিক্সড করে ভিন্ন আংগিকে রবিন্দ্র সংগীতকে উপস্থাপন করা হয়েছে যার কোনটাই আমাদের দেশে করা হয় না। ইদানীং এক বিদেশি কোম্পানি তাদের মিউজিক শাখা ওপেনিং করার জন্যে এদেশের প্রায় সকল রক, পপ, আধুনিক গানের প্রথিতযশা ও তরুণ শিল্পীদের নিয়ে রবীন্দ্র সংগীতের রেকডিং সম্পন্ন করেছে। আবার কিছু শিল্পী নিজ উদ্যোগে কিছু কিছু রবীন্দ্রসংগীত বাজারে ছেড়েছেন। তবে তার মধ্যে সুরের ব্যতিক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। ইনুস্ট্রেমেন্টাল কিছু সংযোজন এবং সেই সাথে কিছু সাউন্ড এফেক্টের কাজ করে রক ধাচ দেওয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন। কতটা সফল হয়েছেন এখনই তা বিচার করা যাবে না।

রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মাঝে বেঁচে আছেন বাঙালির দৈনন্দিন আটপৌরে জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সকল পুজায়, প্রার্থনায়, আচার রীতিতে, এবং জীবনের সকল প্রেমে অপ্রেমে। রবীন্দ্রনাথকে কেউ বিকৃত্ করে উপস্থাপন করতে গেলে বাঙ্গালী নিজেই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।