ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমার বাবা। বাবা দিবসের লেখা লিখতে যেয়ে আমার বাবার কথাই আজ ভীষন ভাবে মনে পড়ছে। খুব সাদামাটা মাপের একজন মানুষ ছিলেন আমার বাবা। কুমিল্লার এক পীর বাড়ীর ছেলে হয়েও আমার বাবা অসাম্প্রদায়িক মুক্তমনের একজন মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। মধ্যমানের সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে যথেষ্ট সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন গোটা চাকরী জীবনে। সরকারী চাকরী করে যতোটা সম্ভব সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন।

চাকরী করেছেন সেটেলমেন্ট অধিদপ্তরে, সংস্থাপনে, থানা, মহুকুমা পর্যায়ে, চাকরী করেছেন দাপটের সাথে কিন্তু কোনদিন ঔদ্ধত্ব দেখান নি। আমরা ছয়ভাইবোন  খুব আড়ম্বরহীন ভাবে মানুষ হয়েছি। বাবার চাকরী সুবাদে কখনো কোনদিন কারো কাছ থেকে কোন সুবিধা নেওয়ার কথা চিন্তাও করি নি। আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময় এই সুবিধাগুলো পাওয়া আমাদের জন্য কোন ব্যাপারই ছিলো না। কারণ সেই সময় রাজনীতি ছিলো শুদ্ধ আর জনসেবামুলুক। আর সরকারী কর্মচারীরা ছিলো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সরকারী কর্মচারীর সন্তানদের রাজনীতি করা ছিলো একরকম নিষিদ্ধ। অথচ আমরা তিন ভাই সেই সময়েই ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হয়েছি। এজন্যে আমার বাবাকে প্রায় অসস্তিতে পরতে হয়েছে। বাবার প্রচন্ড শাসনের সমুক্ষীন হতে হয়েছে বার বার। পড়ালেখায় ভালো থাকার পরেও রেজাল্ট আমাদের আসানুরূপ ছিলো না। সে নিয়েও ছিল বাবার অন্তর্বেদনা। তার ইচ্ছে ছিলো আমরা ভাইবোনেরা সরকারী চাকুরে হই। সেখানেও আমরা কেউ তার ইচ্ছের দাম দেই নি। এ নিয়ে তার দুঃখবোধ ছিলো কিন্তু আমাদের সামনে প্রকাশ করেন নাই। আমাদের অন্যান্য সাফল্যগুলোকেই হাসিমুখে গ্রহন করেছিলেন। আজ এই বাবা দিবসে বাবাকে নিয়ে যখন লিখছি তখন মনের ভিতর গুমরে উঠছে আমাদের অপরিনাম দর্শিতার কথা ভেবে আর বাবাকে কষ্ট দেওয়ার কথা ভেবে। আজ নিজেরা যখন সন্তানের বাবা হয়েছি তখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি বাবা কেনো স্বপ্ন দ্দেখতেন আর সেই স্বপ্ন গুলোকে আমরা যখন ভেংগে দিয়েছিলাম তার সেই কষ্ট টা তার বুকে কতোটা বুকে বেজেছিলো।

আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। জানি না মুক্তিযোদ্ধার সংঘা এখন কি? বাবা মুজিবনগর সরকারের একজন কর্মচারী ছিলেন। তাহলে কি তিনি মুক্তিযোদ্ধা? আমরা কিন্তু আরো হাযার হাযার স্বীকৃতিহীন মুক্তিযোদ্ধার মতো আজো কোন স্বীকৃতি পাই নি। অথচ পাকিস্তান ফেরত সরকারী চাকুরী জীবীরা এসে আজ অনেক উপরে অবস্থান করেছেন। করছেন। শুধু তাই না যারা নয়মাস পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অধীনে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় চাকরী করেছেন তারাও অনেক সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন। অবশ্য এখানেও আমাদের গর্ব। আমাদের বাবা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেও কোন কিছু প্রাপ্তির আশা করেন নাই। বাবার মুখে শুনেছি আমাদের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা। নির্মমতার কথা। আমার বাবা সরকারী কর্মচারী হয়েও ২৩শে মার্চ তদানীন্তন পাকিস্তান দিবসে তার সরকারী অফিসে  স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়েছিলেন। নিজের জীবনের কথা, পরিবারের কথা চিন্তা না করেই স্বাধিনতার প্রারম্ভ থেকেই স্বাধীনের পক্ষে কাজ শুরু করেছিলেন। এপ্রিলের প্রথম দিকেই ভারতে যেয়ে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি কাজ শুরু করেছিলেন।

যুদ্ধের নয়মাস রাধিকাপুর, কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ, ইটাহার, কুসমুন্ডি, তেতুলিয়া এবং পঞ্চগড়ের প্রসাশনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। যেখানেই গিয়েছেন পরিবারের সকল সদস্যকে সাথে নিয়ে গিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি সৈয়দ আহমেদ সাহেবের কলিগ এবং বন্ধু হবার পরেও কোন আনুকুল্য চাননি। এমনই ছিলো তার ব্যক্তিত্ব। আমরা ভাইবোনেরা স্কুলে থাকাকালীন সময়েই তিনি অবসর নিয়েছিলেন। অথচ আমাদের বুঝতে দেন নাই সংসারের অভাব অনটন। বংগবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পরে বাবার কুমিল্লা বাড়ী হবার সুবাদে খুনী মোস্তাক সরকারের কাছ থেকে সুবিধা প্রদানের কথা বলা হলেও তিনি প্রত্যাখান করেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে।

বাবার স্বপ্ন ছিলো আমরা তার পথ অনুসরন করে তার মতো সৎ সরকারী কর্মকর্তা হবো। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আমরা কেউই পুরন করতে পারি নাই। তার এই দুঃখবোধ হয়তো সারাজীবন থেকেছে কিন্তু আমাদের বুঝতে দেন নাই। হাসিমুখে আমাদের পেশাকে মেনে নিয়ে বন্ধুদের কাছে আমাদের সফলতার কথা প্রকাশ করেছেন।

আজ বাবা দিবসে যে কথা কোনদিন আমাদের রাশভারী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বাবাকে বলতে পারিনি সেটাই আজ চিৎকার করে বলতে চাই, বাবা আমরা তোমাকে ভালবাসি। পরলোকের কোন অলিন্দে দাঁড়িয়ে নিশ্চয় আমাদের ভালবাসার কথা তিনি শুনতে পাবেন। আজ যখন আমরা বাবা হয়েছি তখন বুঝছি বাবা হওয়া কি কষ্টের। বাবাদের একাকীত্ব কতো কষ্টের। আমাদের শখগুলো যখন মেটাতে পারতো না তখন যে চাপা কান্না আমাদের ছিলো তারো চাইতে বাবার ছিলো না দেবার চাপা যন্ত্রনা। সেটা তখন বুঝি নি, আজ বুঝতে পারি। বাবাদের কতো দিন, কতো রাত গুমরে গুমরে কাদতে  হয় সন্তানের আবদার পুরন করতে না পেরে।