ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

১৩৪৮ বাংলা সনের বাইশে শ্রাবনের সকাল টা ছিলো একই রকম। তবে কলকাতার কিছু কিছু মহলে উৎকণ্ঠা ছিলো কোন এক বিয়োগ ব্যথার খবর শোনার অপেক্ষায়। বিশ্বের রবি আমাদের কবিগুরু বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ্য। অসুস্থ্যতার জন্যেই তিনি তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছিলেন কালিম্পং থেকে।

বাইশে শ্রাবন দুপুর বারোটার পরপরেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের কে কাঁদিয়ে দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। শ্রাবনের ঝরো ঝরো বারিধারার সাথে বাঙ্গালির চোখের জল একাকার করে তথা বিশ্ববাসীকে শোকে মুহ্যমান করে দিয়ে বিদায়ের বার্তা মুহুর্তেই ছড়িয়ে গেলো দিক দিগন্তে। সারা কলকাতার তথা বাংলাদেশের মানুষ চোখের জলকে সাথে নিয়ে জড়ো হলো রাস্তায়। বাড়িতে বাড়িতে স্বজন হারানোর শোকের হাহাকার।

সেই থেকে ৭৫ বছর ধরে বাংলার মানুষের কাছে ২২ শে শ্রাবন তাই স্বজন হারানোর দিন। শ্রাবনের বারিধারার সাথে চোখের জলের ধারা মেশানোর দিন।

রবীন্দ্রনাথ বাংলার মানুষকে ভালবাসা শিখিয়েছিলেন, শুনিয়েছিলেন পশ্চিমের জানালা খুলে দিয়ে নেবো আর দিবোর অভয় বাণী। প্রতিদিনের আটপৌরে জীবনে পুজা, প্রেম আর প্রকৃতির প্রতি বাঙ্গালির যে আজীবন টান সেটাকে তাঁর গান, কবিতা আর শিল্পের প্রতিটি ধারায় তুলে ধরেছেন। যে বাঙ্গালী শুধুমাত্র কৃষিকাজ আর ধর্মীয় আচার আচরনে ব্যস্ততার দিন কাটাতো সেই বাঙ্গালীর জীবনে প্রেম এনেছেন, প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা এনেছেন। প্রতিবাদে, যুদ্ধে, প্রেমে অপ্রেমে মানুষের মনে সংগীতকে এমনভাবে গেড়ে দিয়েছেন আজ পর্যন্ত সেই ধারাতেই পথ হাটছে বাঙ্গালী।

আমাদের জীবনের প্রতিটি আঁটে ঘাঁটে পরতে পরতে কবিগুরু বিভিন্নভাবে অপরিহায্য ভাবে বিরাজ করছেন। বাংলাদেশ কোনদিন স্বাধীন হবে, সেই চিন্তা তাঁর ভাবনায় ছিলো কিনা আমাদের জানা নাই, কিন্তু আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি গান লিখে গেছেন। আমার জ্ঞানে মনে হয় বিশ্বের একমাত্র জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা, যা গাইতে গেলে চোখে পানি আসে আবেগে, ভালবাসায়। সবচেয়ে সত্য কথা হলো এই যে প্রত্যেক দেশের জাতীয় সংগীতে হয় রাজার, হয় বিধাতার, নাহয় জাতি হিসেবে কে কতো যুদ্ধে জয়ী হয়েছে তারই মহিমা উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে এই দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আর দেশের কথা বলা হয়েছে। আর এটা শুধুমাত্র সম্ভব হয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জন্যেই। এক ডাক হরকরার মেঠো সুর আর গানকে মুল ধরে এতো সমৃদ্ধ গান রচনা আজো তৈরী করা কারো পক্ষেই হয় নাই।

তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশে কবিগুরু কতটূকু গরুত্ব বহন করেন তা আমাদের জানার প্রয়োজন পরে না। বাংলাদেশের মানুষের আত্মার আত্মা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর জন্মদিন অথবা মহাপ্রয়ান বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাকে শুধু স্মরণের দিন নয়। এ যেনো বাঙ্গালীর নিজের আত্মার জন্মদিন আর নিজের সত্বার মহা প্রস্থানের দিন। এই দুটো দিন বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের চেতনাকে নতুন করে তাঁর চেতনায় মিলিয়ে নেয়, শান দিয়ে শপথ নেয় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার।