ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

আমাদের দেশে এক অদ্ভুত সিস্টেম চালু আছে। যে যতো বেশী দুই নাম্বারি করে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় তার গলার  জোর ততো বেশি। কেউ অন্যের কোম্পানিতে চাকরি করতো সেই ভদ্রলোক হঠাত করে নিজেই কোম্পানী খুলে বসলেন  এবং তিনিই সমাজে সর্বেসর্বা হয়ে উঠার প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আবার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রাজাকারি করলেন, মানুষের সম্পদ লুন্ঠনে সহায়তা করলেন, মানুষ হত্যা করলেন, নারী ধর্ষনে বাংলার মা বোনকে পাকিস্তানী জানোয়ারদের হাতে তুলে দিলেন কিছুকাল পরে ধর্মের লেবাস গায়ে চাপিয়ে হয়ে গেলেন আলেম মাওলানা। এইসব লোকেরা প্রতিষ্ঠানের নামকরণে বা জীবিকা অর্জনে ধর্মীয় অনুভুতি কাজে লাগানোর ব্যাপারে থাকেন অনেক সক্রিয়।

কয়েকজনের কথা বলি।

এক, এক ভদ্রলোক ঢাকা শহরের এক নামকরা চেইন ফাষ্টফুড প্রতিষ্ঠানের জিএম ছিলেন। বেশ কিছু বছর ধরে তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের জি এম হিসেবে কাজ করার পরে তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন। শোনা যায় পুর্বের প্রতিষ্ঠানের অনেক কিছুই তিনি নিজের করে নিতে পেরেছিলেন বলেই নিজের প্রতিষ্টানের উন্নতি করতে বেগ পেতে হয় নাই । তিনি বাজারে এসে তার প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে “একশত ভাগ হালাল খাদ্যের প্রতিষ্ঠান” স্লোগানটি যোগ করে ফেললেন। যে লোক নিজের প্রতিষ্ঠান চালুর জন্যে পুর্বের প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি সাধন করে চলে এলেন, সেই ভদ্রলোক কিনা বিক্রি করছেন হালাল খাদ্য!! যার নিজের চারিত্রিক সততা নেই তিনি কিভাবে হালাল খাদ্য বিক্রয় করেন তা বোঝার বোধগম্য হয় না। অবশ্য এই হালাল খাদ্য কথাটিও একেবারেই স্ট্যান্ট বাজী ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

দুই, এক ভদ্রলোক বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীতে চাকরী করতেন, তিনিও অনেক উচ্চ পদে চাকরী করতেন সেই প্রতিষ্ঠানে। বহুবছর তিনি চাকরী করেছে প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে। এরপরে সেই ভদ্রলোক চাকরী ছেড়ে দিয়ে নিজেই এক কোম্পানী দিয়ে ফেললেন এবং এখন অনেক প্রতিষ্ঠীত শিল্পমালিকে পরিনিত হয়েছেন। শোনা যায় এই ভদ্রলোকও এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সময় আগের প্রতিষ্ঠানের অনেক কিছুই নিজের নামে চালান করে দিয়েছিলেন। এবং তিনিও এক বিশেষ স্বাধীনতা বিরোধী ইসলামী দলের সাথে যুক্ত ছিলেন।

এইসব উদহারন হয়তো কারো সাথে মিলে যেতেও পারে আবার নাও মিলতে পারে। কেউ হয়তো বলতে পারেন তারা তাদের যোগ্যতা দিয়েই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠার পিছনের যে কাহিনী গুলো থেকে যায় বা লোক মুখে শোনা যায় তাতে করে নিজেদের জাতিগত জাত্যাভিমানে কতোটূকু স্পর্শ করে তা ভাব্বার বিষয়।

ঠিক তেমনিভাবে আমাদের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা এদেশের স্বাধিনতাই বিশ্বাস করেন নাই। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনির সাথে যোগসাজশ করে সম্পদ এর পাহাড় করেছেন তারা পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের নেতা বনে গেছেন ততকালীন শাসক গোষ্ঠীগুলোর বদৌলতে।  আজ যখন বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পরে এসেও ভিক্ষাবৃত্তি বা রিক্সা চালিয়ে জীবন ধারন করছে তখন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা সম্পদের পাহাড়ের উপর বসে এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমের সোল এজেন্টে পরিনত হয়েছেন। এ শুধু সাধারন নাগরিক নয় সর্ব ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এবং এখানেও এই গোষ্ঠী ধর্মকে তাদের পুজি করেছে। ধর্মের লেবাস গায়ে চড়িয়ে, ইসলাম রক্ষার নামে এদেশের ধর্মভীরু মানুষদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্ঠা চালাচ্ছে।

স্বাধীনতার অব্যাহতি পর থেকেই মুক্তমনা, স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি এবং লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং প্রকাশকদের হত্যা করে আসছে এই স্বাধীনতা বিরোধি শক্তি। এই খুন হামলা সবই তারা চালয়েছে ধর্মের নামে, বা ধর্মের দোহাই দিয়ে। এরা শক্তিতে এতোই শক্তিমান যে বাংলাদেশের সকল গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এদের সাথে কখনো না কখনো আপোষ করে রাজনীতির খেলায় জয়লাভ করেছে।

এই গোষ্ঠী এদেশের বিরোধী দল থেকে শুরু করে পরোক্ষভাবে সরকারী দলেও ঢুকে পরেছে। সরকারের অনেক সাধু প্রচেষ্ঠাকেও তারা নসাত করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এবং এরাই গনতন্ত্রের জন্য দেশে বিদেশে মায়া কান্না করে বেড়াচ্ছে। স্বাধীনতার অব্যাহতি পরেই স্বাধীনতাকে বিফল করে দেওয়ার মানসে এই পরাজিত শক্তি যেভাবে বাম শক্তির ভিতর আশ্রয় নিয়েছিলো আজো তারা সেই বাম ঘরানার ভিতরে পুনরায় ঢুকে পড়েছে গনতন্ত্র উদ্ধারের নামে। সরকারী বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে এরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নামক দেশ টাকে ব্যর্থ রাষ্ট হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চায়।

উপরের দুটো ঘটনা অনেকটাই এই লেখার সাথে অনেকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে কিন্তু আমাদের ব্যক্তি এবং সমাজ জীবনের ঘটনা প্রবাহ থেকে সহজেই অনুমেয় যে একটার সাথে আরেকটির অবশ্যই পরম্পরা বিদ্যমান।

আমাদের অপরাধ করে দোষ স্বীকার না করা বা সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়া অনেক সহজ ব্যাপার হয়ে দাড়ীয়েছে বলেই এখন জাতির জন্য পুরো ব্যাপারটাই হুমকী হয়ে দাড়িয়েছে।

এপ্রসঙ্গে ফ্রান্সের একটা গল্প বলি, এক মজলিসে এক ভদ্রলোক অসাবধানতাবশত সশব্দে বায়ু ছেড়েছিলেন। এই বায়ু ছাড়ার কারণে ভদ্রলোককে সমালোচনায় ফ্রান্সের তার নিজের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো।প্রায় বিশ ত্রিশ বছর পর সেই ভদ্রলোক তার নিজের গ্রামে ফিরে এসে লোকের কাছে নিজের নাম করে বলেছিলেন যে উনি কোথায়, গ্রামের লোকজন তাকে বলেছিলো কার কথা বলছেন? সেই যে সমাজের আড্ডায় বায়ু ছেড়েছিলো তাকে খুঁজছেন? সেই ভদ্রলোক নিজের পরিচয় না দিয়েই তিনি ফিরে গিয়েছিলেন নিজ গ্রাম থেকে। এই গল্প সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের গল্প থেকে পড়া। আর আমাদের দেশে যে যতো বড়ো অপরাধ করুক না কেনো যদি সম্পদ এবং ধর্মের লেবাস তা লাগানো যায় তবে শত দোষ মাফ হয়ে যায়। সেই দোষী বা খুনী ব্যক্তি জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী সমাজপতি বা ধর্মীয় আলেম হয়ে যায়।