ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

“আমি হিমালয় দেখিনি, আমি শেখ মুজিব কে দেখেছি,” বিশ্বের শোষিত মানুষের নেতা, কিউবা বিপ্লবের মহান নায়ক ফিদেল কাষ্ট্রো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন। সেই হিমালয়ের চেয়েও উঁচু বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধুকে যখন ঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিলো সপরিবারে তখন বাংলাদেশের মানুষ কি কোনই প্রতিবাদ করে নাই? বাংলার মানুষ তাদের প্রিয় নেতার হত্যাকাণ্ডে কি কোন প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি বা প্রতিরোধ প্রতিবাদ করেনি?

’৭৫ এর মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর পরেই বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর কোথাও কোন প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে উঠে নি, বরঞ্চ দেশের মানুষ স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলেছিলো। কোন কোন আওয়ামী লীগ নেতা বিদেশের রেডিও তে জালেমের পতন হয়েছে বা ফেরাউনের হাত থেকে দেশ ও জাতি মুক্ত হয়েছে এমন কথাও প্রচার করা হয়েছিলো। নিউ মার্কেটের গলি থেকে কয়েকজন লোকের আনন্দ মিছিল বের হওয়ার খবরো ততকালীন সংবাদ মাধুম প্রচার করার চেষ্টা চালিয়েছিলো। সেইসময় অবশ্য সংবাদ মাধ্যম ছিলো সীমিত, আর ছিলো নিয়ন্ত্রিত।

আজ ৪১ বছর পরে এসে বাংলাদেশ প্রতিদিনের মতো পত্রিকা গুলো সেই দিনের সেই কালো দিনগুলোর কথা জনগনের  সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সাধারন মানুষ এই নৃশংস হত্যাকান্ডকে মেনে নিতে পারে নাই সেই খবর আজ প্রকাশিত হচ্ছে। বরগুনা থেকে শুরু করে ময়মনসিং টাঙ্গাইল সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠে। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাস ছিলো বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে অস্ত্র আর্তসমর্পনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিলো সেই প্রতিরোধ যুদ্ধ।( সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন)

এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে যেয়ে বা প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিয়ে হাযার হাযার বঙ্গবন্ধু সৈনিক সাহসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। নিজেদের জীবনের মায়া কে ত্যাগ করে হাযার হাযার আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বছরের পর বছর শরনার্থীর জীবন যাপন করত্যে হয়েছে। পুলিশ, বি ডি আর এবং বি ডি আরের ছদ্মবেশে সেনা বাহিনীর সঙ্গে সন্মুখ যুদ্ধ করেছে অসীম সাহসের সংগে। বেশ কিছু থানা সহ ময়মনসিংহ টাঙ্গাইলের অনেক অঞ্চলকেই মুক্ত এলাকা হিসেবে দখলে নিয়েছিলো বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী প্রতিরোধী বাহিনী।

সেই প্রতিরোধ যুদ্ধের ইতিহাস আমরা কেউই জানি না। আজ যখন বাংলাদেশ প্রতিদিনের পাতায় ধারাবাহিকভাবে প্রকেশ হচ্ছে সেইসব প্রতিরোধের সাহসি ইতিহাস তখন নিজেদের কে আর বেঈমান মনে হচ্ছে না। সামরিক বেসামরিক জান্তা যতোই গোপন রাখার চেষ্ঠা চালিয়ে যাক না কেনো এই ইতিহাস যে একদিন সুর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হবে তা আজ প্রমানিত।

১৯৯৬ সাল থেকে আজ ২০১৬ সাল এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংঘটন আওয়ামী লীগ তিন বার ক্ষমতায় এসেছে। এই তিনবার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার থেকে শুরু করে জেলহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পর্যন্ত সম্পন্ন করার শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয় এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভুত উন্নয়ন সাধন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে এই কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার অব্যাহতি পরেই যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিলো বাংলার আনাচে কানাচে, যে বীরেরা এই প্রতিরোধ গড়ে তুলে ছিলো জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে সেইসব বীরদের আওয়ামী লীগ নাগরিক সম্বর্ধনা আজো দিয়ে উঠতে পারলো না কেনো সে প্রশ্ন আজ সবার মনে। সেদিনের সেই প্রতিবাদে কোন নামকরা নেতা ছিলো না। বরঞ্চ বরগুনার এস ডি ও সাহেব সিরাজউদ্দীন সাহেব সেই প্রথম প্রতিবাদ কারীদের সহায়তা করেছিলেন। সেই ইতিহাসও কিন্তু থেকে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।

আজ বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪১ বছর পরে এসে আমরা সেই বীরদের জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। জানিনা কোন স্মৃতি স্তম্ভ আছে কিনা। জানি না সেই বীরদের উদ্দেশ্যে কোন শোক পালন করা হয় কিনা। কিন্তু এটা সত্য বাংলাদেশের মানুষ যে তার নেতার জন্য বার বার জীবন দিতে পারে তা প্রমাণীত। নেতার সত্যিকার অনুসারিদের কোন পদ লাগে না, ব্যবসা লাগে না, কোন রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধারও প্রয়োজন পরে না। আজ কাদের সিদ্দিকী সহ সকল প্রতিরোধ যুদ্ধের সৈনিকদের জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

তাদের সেই সময়কার সাহসী পদক্ষেপ বাঙালি জাতিকে বেইমানের জাতি হিসেবে পরিচয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তাদের প্রতিরোধ এবং প্রতিবাদের সাহসী ইতিহাস দেরিতে হলেও বিশ্বের কাছে তুলে ধরা উচিত। এ প্রসংগে একটি সত্য ঘটনা বলি, আমার মামাতো ভাই সেইসময় বাগদাদে কর্মরত ছিল। পনেরোই আগষ্ট সকালে বাগদাদিরা আমার ভাইয়ের সাথে হাত মেলাতে রাজি হয় নাই। বলেছিল, তোরা গাদ্দারের জাতি। যারা শেখ মুজিবের মতো নেতাকে মেরে ফেলতে পারে তারা গাদ্দার ছাড়া আর কিছু নয়।