ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

৯০ দশকের মাঝামাঝি দক্ষিন কোরিয়ায় ডিপ্লোমা নেবার সুবাদে প্রায় ছয়মাস থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই দক্ষিন কোরিয়ার দুটি ঘটনা তখন আমার মনকে ভীষন নাড়া দিয়ে যায়। দক্ষিন কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জোয়ারে তখন সারা বিশ্বে তোলপাড় । সেই উন্নয়নের জোয়ার পরিবারগুলোতেও লাগতে শুরু করেছিলো। হোটেল গুলোতে বৃদ্ধ বৃদ্ধারা আশ্রয় নেওয়া শুরু করেছে। সন্তানেরা আলাদা হয়ে ছোট ছোট পরিবারে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে উচ্চবিত্তেরা প্রায় তাদের ছেলেদের আমেরিকা পাঠাচ্ছে পড়াশুনা আর আরো উন্নত জীবনের আশায়।

দক্ষিন কোরিয়ায় সেই সময় বেশ কয়েকটি ঘটনা বাবা মাদের সংগে সন্তানাদিদের দুরত্ব আরো তরান্বিত করে তুলেছিলো। আমেরিকার  জৌলুষময় জীবনে আর অবাধ স্বাধীনতায় অনেক ছেলে মেয়েই অঠেল খরচের গড্ডালিকায় ভেসে যেতে থাকে, এই অর্থের উতস হচ্ছে দেশ থেকে বাবা মায়ের পাঠানো অর্থ। কিন্তু সন্তানদের অমিতব্যয়ী খরচে যখন বাবা মা দিশেহারা হতো তখন বেশ কিছু বাবা মা সন্তানদের হাতে খুন হতে শুরু করে। এই খুনের ঘটনাগুলো দক্ষিন কোরিয়ার সমাজে বেশ বিরুপ প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে আমার মনে হয়েছিলো আমাদের দেশে এই রকম ঘটনার কোন সম্ভাবনাই দেখি না। কারণ একাত্তরের মহা বিপর্যয়ের পরেও পরিবার গুলো যৌথভাবেই নিজেদের পুনর্বাসনে সচেষ্ট হয়েছিলো।

অথচ মাত্র বিশ বাইশ বছরে বাংলাদেশের সংবাদ পত্রের সংবাদ এক ভয়াবহ চিত্রের পরিসংখ্যান আমাদের সামনে তুলে ধরছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের মতে চলতি বছরের গত সাত মাসে খুন হয়েছে ১৯১ জন শিশু। এদের মধ্যে মা বা বাবার হাতে খুন হয়েছে  ৩১ জন শিশু। মায়ের হাতে খুন হয় ১৫ জন এবং বাবার হাতে খুন হয় ১৬ জন। গত বছর খুন হয় ৩৫০ জন তাদের মধ্যে ১৫  জনই খুন হয়েছে পরিবারে ।

গত কয়েক বছরে বাবা মা এর হাতে সন্তান খুন বা সন্তানের হাতে বাবা মা খুন যেনো স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে। পারিবারিক কলহের জের, আর্থিক অসচ্ছলতা আর সামাজিক রিতি নীতির বেড়াজালে পরে মানুষ নিজের আত্মজকেও হত্যা করতে বা বাবা মাকে হত্যা করতে দ্বিধা করছে না।

গত ২২ শে অক্টোবর উত্তর বাড্ডায় দুই সন্তান কে বিষপান করিয়ে নিজে বিষপান করে আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন এক মা। এর মধ্যে এক শিশুর মৃত্যু ঘটে আর মা সহ আরেক শিশু ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি। স্বামী পলাতক।

১লা অক্টোবর সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার আট বছরের শিশু সোহানা কে স্বাশ রোধ করে হত্যার পর বাবা নিজে আত্মহত্যা করেন।

২৫ শে সেপ্টেম্বর মাদকদ্রব্য কেনার টাকা না দেওয়ায় সরিষাবাড়ীর ৬৫ বছর বয়স্ক বাবাকে হত্যা করে ছেলে উমর।

১৭ সেপ্টেম্বর চট্রগ্রামের পুর্ব গোসাইল্ডাংগা এলাকায় মাকে কুপিয়ে হত্যা করে সুমিত নামে এক ছেলে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়।

১৬ই সেপ্টেম্বর ফরিদপুর শহরের ফারদিন হুদা মুগ্ধ। বাবাব্র কাছে হোন্ডা কেনার টাকা চেয়ে না পাওয়ায় বাবা মাকে পুড়িয়ে মারার জন্য আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে হাসপাতালে বাবা মারা যান।মা এখনো হাসপাতালে।

২৮ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকার বনশ্রীতে নিজেদের বাসায় রহশ্য জনক ভাবে মারা যায় ১৪ বছর বয়সী কিশোরি নুসরাত ছয় বছর বয়সী আমান। প্রথমে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছে দাবী করলেও পরবর্তীতে মা স্বীকার করেন হত্যার ঘঠনা।

এর আগে পুলিশ অফিসার দম্পত্তির নিজ মেয়ে ঐষীর হাতে খুন হওয়ার ঘটনা সবারই জানা।

পারিবারিক কলহের জের ধরে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১৩টি খুনের ঘটনা ঘঠছে। এছাড়া আত্মহত্যা করছে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জন । প্রতিনিন নারি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন ৫৭ জন নারী।

পরিসংখ্যান মতে (পুলিশ সদর দপ্তর) ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত মোট খুন হয়েছে ১০০০০ জনের মতো। এর মধ্যে ৪০ শতাংশই খুন হয়েছে পারিবারিক কলহের কারনে।

এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন গুলো ভেঙ্গে পরা, দক্ষিন কোরিয়া ষাটের দশকে যে গৃহযুদ্ধের তাণ্ডবলীলা সহ্য করেছে, যে অভাব দারিদ্রতার মুখোমুখি হয়ে টিকে থাকার লড়াই চালাতে হয়েছে সেই ধাক্কাতেই পরিবারের বন্ধনগুলো ভেঙ্গে পরেছিলো। আমাদের ৭১  এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ধ্বংসলীলাতেও পরিবারের বন্ধনগুলোকে ভাংগতে পারে নি এই একবিংশ শতকের প্রথম দিকে এসেও। অথচ   মাত্র কয়েকবছরের মাঝে এসেই পরিবারের যে বন্ধন তা আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। অভাব, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, নিজে একটু ভালো থাকার স্বার্থপরতা, বিদেশী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর তথ্য প্রযুক্তির অবাধ ভান্ডারে মানূষ শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পরছে। এখানে বাবা মায়ের প্রতি ভালোবাসা, ভাইবোনের প্রতি ভালোবাসা, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা সব কিছুই আজ অর্থের মানদন্ডে মাপা হচ্ছে।কে কত স্বার্থপর হওয়া যায় এবং কতো তাড়াতাড়ি নিজে শুধু উপরে উঠা যায় তারই ইঁদুর দৌড় আজ সমাজের সর্বত্র। এখানে মানবিক মুল্যবোধ বা অন্যের প্রতি দয়া দাক্ষিন্য বা ভাব ভালোবাসা শুধুই বাতুলতা। যার ফলশ্রুতিতে বাবা মা সন্তানকে খুন করছে, সন্তান বাবা মাকে খুন করতে দ্বিধা করছে না।