ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের সাতাত্তর তম মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা আর ভালবাসা দিয়েই এই লেখা শুরু করছি। কিছুটা সংগ্রহিত কিছুটা নিজের। ঋজু শালপ্রাংশু দেহের অধিকারী রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন সুস্বাস্থ্য ভোগ করলেও জীবনের শেষ চার বছর দীর্ঘস্থায়ী পীড়ায় কষ্ট পেয়েছিলেন। তাঁর মূল সমস্যা ছিল অর্শ। এই চার বছরে দুবার দীর্ঘসময় অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয় তাঁকে। ১৯৩৭ সালে একবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন কবি ; এই সময় কোমায় চলে গিয়ে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেন অত্যন্ত কাছ থেকে। আর তখন থেকেই তাঁর এই দীর্ঘকালীন অসুস্থতার সূত্রপাত। ১৯৪০ সালের শেষ দিকে আবার একই ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এবার আর সেরে ওঠেননি।

(সুত্রঃ উইকিপিডিয়া)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়তো ততটা আধুনিক ছিলেন না, কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে আজও মনে হয় সমকালীন। মনে হয় আজকের সময়ের এক আধুনিক মানব। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সাতাত্তর বছর পার হয়েও যেন মৃত্যুহীন অনন্ত জীবনের সাক্ষর বয়ে চলেছে আজও।

সেই ১৯৪০ সালের কথা। পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী পাশেই আছেন। অসুস্থ শরীরেই কবি লেখার ঘরে কবিতার খাতা নিয়ে এসে বসলেন। মংপু থেকে মৈত্রেয়ীদেবীও কালিম্পং-এর বাড়িতে চলে আসাতে কবি তাঁকে খুশি হয়ে কয়েকটি কবিতা শোনালেন। দুপুরে শরীর খারাপের মাত্রা আরও বাড়ল। চেতনাও আচ্ছন্ন। কাউকে তেমন করে চিনতে পারছেন না। সেই ঘোরের মাঝেও রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘‘আমার কী হল বল তো’’।

তিন জন চিকিৎসক নিয়ে কলকাতা থেকে কালিম্পং চলে এলেন শ্রীপ্রশান্ত মহালনবিশ। জীবনের শেষ নববর্ষের সময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর সাধের শান্তিনিকেতনে। সে দিন তাঁর কলমে রচিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংকট’ নামের অমূল্য লেখাটি। তারও ক’দিন পর ১৯৪১ সালেরই ১৩ মে লিখে রাখলেন, রোগশয্যায় শুয়ে—‘‘আমারই জন্মদিন মাঝে আমি হারা’’

এই সময়গুলোতে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত কাহিল, কখনও রোগশয্যায় আচ্ছন্ন। নিজে হাতে লেখার ক্ষমতাও তার আর নেই। তিনি তখন যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় কখনও শুয়ে শুয়েই বলে যাচ্ছেন, তাঁর মুখনির্সিত বাণী কবিতার ছন্দে লিখে রাখছেন রানী চন্দ। কবি কখনও রানী চন্দকে বলছেন লিখে রাখতে, ‘‘আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন—।

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের শেষ দিনগুলোতে কখনও তিনি শয্যাশায়ী, কখনও ওরই মধ্যে কিছুটা মন্দের ভাল। শেষের দিকে, ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই, শান্তিনিকেতনের আশ্রম বালক বালিকাদের ভোরের সঙ্গীত—অর্ঘ তিনি গ্রহণ করলেন তাঁর উদয়ন গৃহের পূবের জানলার কাছে বসে। উদয়নের প্রবেশদ্বার থেকে ছেলেমেয়েরা,

‘‘এদিন আজি কোন
ঘরে গো খুলে দিল দ্বার
আজি প্রাতে সূর্য
ওঠা সফল হল আজ’’

কবির মন বলেছিল, ‘‘সবার শেষে যা বাকি রয় তাহাই লব।’’
রবীন্দ্রনাথের মানসিকতা তাঁর বৌদ্ধিক দৃষ্টির রেশ থেকে গেছে সমস্ত রচনায়।

কিশোর বয়সে বন্ধুপ্রতিম বৌদি কাদম্বরী দেবীর অকালমৃত্যু ও আরও পরে স্ত্রীর মৃত্যু এবং একে একে প্রিয়জনদের মৃত্যুর নীরব সাক্ষী ও মৃত্যুশোক—রবীন্দ্রনাথের এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভে সহায়ক হয়েছিল। কবি জীবনস্মৃতিতে ‘মৃত্যুশোক’ পর্যায়ে অকপটে লেখেন, ‘‘জগৎকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে দূরত্ব প্রয়োজন, মৃত্যু দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার উপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম, তাহা বড়ো মনোহর।’’(সুত্রঃ আনন্দবাজার)

বিরহের সঙ্গে মিলনের, মৃত্যুর সঙ্গে অমৃতের, বেদনার সঙ্গে আনন্দের যে সম্পর্ক, সেই সৎ-চিৎ-আনন্দময় পরম ব্রহ্ম তথা আধ্যাত্মলোকের সন্ধান দেয় তাঁর সমূহ সৃষ্টি। বিশ্বপিতার অপার মহিমাকে মননে অনুধাবন করে কবি লিখেছিলেন,

‘‘হে সুন্দর হে সত্য, তুমি আমায় এ মোহ বাঁধন থেকে মুক্ত করো শূন্য করে দাও আমার হৃদয় আর এই শূন্যতার মাঝে আমার হৃদয় আসনে তুমি সুপ্রতিষ্ঠিত হও। দুঃখের অনলে দহনে মধ্য দিয়ে শোধন করে আমায় সুন্দর করো, গ্রহণ করো।’’

মৃত্যুকালীন সময় পর্বে অর্থাৎ অসুস্থ অবস্থায় রচিত রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতা ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে সৃজিত কিছু অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা। এই সময়কালের মধ্যেই জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু কবিতা রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। এই কবিতাগুলির মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুকে ঘিরে লেখা রবীন্দ্রনাথের কিছু অবিস্মরণীয় পঙক্তিমালা।

দীর্ঘ রোগভোগের পর, শল্য চিকিৎসার জটিলতার কারণে, ১৯৪১ সালের ৭ অগস্ট (২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোয় অবস্থিত বাসভবনের প্রয়াত হন রবীন্দ্রনাথ। (সুত্রঃ আনন্দবাজার)