ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

উত্তরের শহর দিনাজপুর। মোঘল আমল বা তারো আগে থেকেই বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা ছিলো সমৃদ্ধশালী এলাকা। এখানের উর্বর জমি এবং বরেন্দ্র ভুমির একাংশ এবং হিমালয়ের পাদদেশের সমতল ভুমি, বসতি গড়ার ক্ষেত্রে সাধারন মানুষের ছিলো পছন্দের এলাকা।

Dinajpur-Cinama-hall-lg20150727144537

এ অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় এবং অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাসম্পন্ন মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ছিলো লক্ষণীয়। তারই ধারাবাহিকতায় দিনাজপুর ছিলো উত্তরবংগের সাংস্কৃতিক মিলনমেলার এক পাদপীঠ। শত বছরের চেয়েও পুরানো নাট্য সমিতির নাট্যমঞ্চ এবং নাটকের ইতিহাস তারই প্রমাণ দেয়। সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় পুর্ব বাংলার মধ্যে দিনাজপুর জেলার অর্ধেক অংশ নিয়ে গঠিত পুর্ব দিনাজপুর পাকিস্তানের মধ্যে পরলেও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড কখনোই থেমে যায় নি। বরঞ্চ আরো উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে।

দিনাজপুর শহর এই উত্তর অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং সবাক চলচ্চিত্রের আগমনের সাথে সাথে এখানেও গড়ে উঠে ক্রমান্বয়ে বেশ কয়েকটি সিনেমা হল। বাঙালি জনজীবনের মূল বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু সিনেমা এবং সিনেমা হল দিনাজপুরেও প্রভাব ফেলে। সিনেমার প্রতি মানুষের প্রবল আগ্রহ চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের সিনেমা হল প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলে।

ক্রমান্বয়ে  গড়ে উঠে সেই সময়ের উপযোগী আধুনিক সিনেমা হলগুলো। ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে উঠা ৪ টি সিনেমা হল  এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সেক্টর কমান্ডারের হেড কোয়ার্টার সংলগ্ন তাদের পরিচালিত সিনেমা হল, দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা সহ আশেপাশের থানা উপজেলার দর্শকদের সিনেমা দেখার চাহিদা পূরণ করতো। শুধু তাই নয় স্বাধীনতার পরে আরো একটি সিনেমা হল দিনাজপুর শহরে প্রতিষ্টা হয় শুধুমাত্র দর্শক চাহিদার কথা ভেবে।

দিনাজপুর শহরের সিনেমার দর্শক সবসময়ের জন্য খুবই ব্যবসা বান্ধব। যেহেতু এই সীমান্তবর্তী জেলায় এক নাটক ছাড়া অন্য কোন বিনোদনের ব্যবস্থা ছিলো না, তাই অন্যান্য জায়গার মতো সিনেমা হলই ছিলো সাধারণের বিনোদনের একমাত্র সার্বজনীন ব্যবস্থা। সিনেমা হলগুলো নিত্যদিনের জন্য থাকতো পূর্ণ। সিনেমা হলগুলোর নামেও ছিলো আকর্ষনিয়তা। মর্ডান, লিলি, বোস্তান এবং চৌরঙ্গী নামের সিনেমা হলগুলো মানুষদের আকর্ষণ করতো। সীমান্ত রক্ষীদের হলের নাম ছিলো কুঠিবাড়ী সিনেমা হল।

দিনাজপুরের সিনেমা হলের ইতিহাসে দুটি ঘটনা বেশ উল্লেখযোগ্য। প্রথম হলো মর্ডান সিনেমা হলে জীবন থেকে নেয়া ছবির শুভমুক্তি। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত অবাংগালী মালিকের হলে জীবন থেকে নেয়া মুক্তি এটাই ছিলো প্রথম উত্তেজনা। অবশ্য  হল কর্তৃপক্ষ সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ছবির মুক্তি উপলক্ষ্যে  হলের চেহারা চেঞ্জ করে ফেলেছিলো। রঙ করা থেকে শুরু করে ধোয়া মুছা এবং নতুন ডেকোরেশন পর্যন্ত করা হয়েছিলো। শোনা যায় দিনাজপুরের পুরো জেলায় এই সিনেমার মুক্তি সাড়া ফেলেছিলো যা আজো ইতিহাস হয়ে আছে।

দ্বিতীয়টি হলো স্বাধীনতার পরের ঘটনা। এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা। ৭৪ সালে লিলি সিনেমা হলে বিডিআরের গুলি চালনা এবং কয়েকজন দর্শকের প্রাণহানী ঘটে। সিনেমা চলাকালীন একদল দর্শকের সাথে কয়েকজন বিডিআরের সদস্যের কথা কাটাকাটি নিয়ে দুপক্ষের হাতাহাতি হওয়ায় বিডিআর সদস্যরা হল থেকে বের হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে হলে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালায় এবং কয়েকজন নিরীহ দর্শক প্রাণ হারান।

দিনাজপুরের পাঁচটি সিনেমা হলের মধ্যে আজ মাত্র দুটি ব্যক্তি মালিকানার সিনেমা হল এবং কুঠি বাড়ীর সিনেমা হল টিকে আছে। বাকী আজ ইতিহাস মাত্র। লিলি সিনেমা এবং বোস্তান সিনেমা হল দুটো আজ আর নেই। মর্ডান এবং চৌরংগী সিনেমা হল দুটো আজো আছে, এবং কোন রকমে টিকে আছে। নতুন করে অন্য কোন সিনেমা হলও আর তৈরী হয় নি। তবে ভালো সিনেমা আজো দিনাজপুরের দর্শকদের সিনেমা হলে টানে তার প্রমাণ সাম্প্রতিককালের কিছু ছবি।

ভালো ছবি, রুচি সম্মত ছবি দিনাজপুর তথা সমগ্র বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোকে আবার চাংগা করে তুলতে পারে। আবার সিনেমা হল মালিকেরা তাদের হলগুলোর সংস্কার বা আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হয়ে উঠতে পারে।