ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় মোঘল আমলে এই উত্তরবঙ্গ ছিলো অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড। সারা বাংলা থেকে যা খাজনা আদায় করা হতো তার প্রায় অর্ধেকের বেশি আয় হতো রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল থেকে। কৃষি নির্ভর এই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিলো যেহেতু কৃষি, তাই জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসতো এই কৃষি থেকেই। সমস্ত প্রশাসন গভীরভাবে অপেক্ষা করতো  এই অঞ্চলের রাজস্ব আদায় থেকে। হিমালয়ের পাশে এবং সবচেয়ে সমতলভূমি হওয়ায় এখানের জমি ছিলো সবচেয়ে উর্বর। ফসলের আধিক্য এবং জনসংখ্যার স্বল্পচাপ এ অঞ্চলের মানুষকে স্বচ্ছল হতে সাহায্য করেছে। পাট, ধান আর তামাকের চাষে এ অঞ্চলের মানুষ স্বাচ্ছন্দে বছরের খোরাক যোগাড় করে কিছু উদ্বৃতের মুখ দেখতো। যার ফলে এই অঞ্চলের মানুষের বাহিরে কাজের সন্ধানে যাওয়ার ইচ্ছেটাই ছিলো না।

কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পথ ধরে ভারতবর্ষেও যখন শিল্প প্রতিষ্ঠার যুগ শুরু হলো, সেই সময় থেকেই দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলের সুখ সমৃদ্ধি কমতে থাকে। কিন্তু এ অঞ্চলের সামন্ত প্রভুদের ঘুম ভাঙ্গে নি। তখনো তারা তাদের জমির এবং কৃষির নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারেনি। পূর্ব পুরুষদের পথ ধরে তরুণ প্রজন্মও এক গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে এসেছে। ধান ঊঠলে তাদের ফুটানী থাকতো আবার সিজন চলে গেলে অলস দিন কাটাতো। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম রংপুর দিনাজপুরের মানুষ বহির্বিশ্বের সাথে নিজেদের আলাদা করে রেখেছে। বৃটিশ ভারতে এসে কিছু স্কুল-কলেজ হলেও ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিলো খুবই নগণ্য। গুটিকয়েক মানুষ এই শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহী হয়েছে, কিছু  মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে চাকরী বাকরীতে ঢুকেছিলো কিন্তু শিল্প বা ব্যবসা-বাণিজ্যে কখনোই মনোযোগী হয় নাই।

আজ যখন সারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জোয়ার এসেছে, যখন অন্যান্য জেলাগুলো অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তখন বৃহত্তর দিনাজপুর-রংপুর জেলা তথা সমগ্র রংপুর বিভাগ ক্রমশঃ পিছিয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬ সালের অর্থনৈতিক জরিপে রংপুর বিভাগের পিছিয়ে পড়ার চিত্র খুব স্পষ্ট। এবারের জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১২ দশমিক ৯ শতাংশ অতিদরিদ্র, যা ২০১০ সালে ছিল ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশের সাত জেলার দারিদ্র্যের হার ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রামে বসবাস করে।  একসময়ের মঙ্গাকবলিত এ জেলার ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখনও দরিদ্র। কুড়িগ্রামের ভৌগলিক অবস্থান এই দরিদ্রতার অন্যতম কারণ।

এই জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বাংলাদেশের বৃহত তিনটি নদী, এই তিন নদীর প্লাবন এবং নদী ভাংগন এ অঞ্চলের মানুষকে দরিদ্র করে তুলেছে। ৮০’র দশকের আগে এই অঞ্চলে মোটর যানের সংখ্যাও ছিলো দুঃষ্প্রাপ্য। এই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতারা এ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষগুলোকে শুধুমাত্র ভোটের সময়েই মনে করেছে। দিনাজপুরে দরিদ্রের হার ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ, জামালপুরে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ ও মাগুরায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য। আর বান্দরবানের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ ও খাগড়াছড়ির ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এসব জেলার অতিদারিদ্র্যের হারও জাতীয় অতিদারিদ্র্যের তুলনায় অনেক বেশি। (পরিসংখ্যান ব্যুরো)।

জরিপ অনুযায়ী সবচেয়ে দারিদ্র পীড়িত জেলা হচ্ছে কুড়িগ্রাম, এই জেলার আজো ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ দরিদ্র। এরপরেই আসে দিনাজপুর জেলার নাম। প্রায় ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ আজ দারিদ্র্যসীমায় বসবাস করছে।

জরিপ বলছে, ২০১৬ সাল শেষে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ দরিদ্র ছিলো। এর আগে ২০১০ সালে করা জরিপে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ছয় বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া আরও ১৯টি জেলা রয়েছে, যেসব জেলার  দারিদ্র্যের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। সামগ্রিক দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্য উভয় ক্ষেত্রেই রংপুর বিভাগ সবার ওপরে রয়েছে। (সুত্রঃ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতীয় দৈনিক সমূহ)

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই, জরিপে উঠে এসেছে তা হলো, যে জেলা গুলো ছিলো একসময় খুবই দারিদ্র পীড়িত সেই জেলা গুলোর অনেক গুলোই আজ সবচেয়ে কম দরিদ্র সংখ্যার জেলাতে নেমে এসেছে। রাজধানীর পাশের জেলাগুলোতে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে কম। সবচেয়ে কম দারিদ্র্য নারায়ণগঞ্জে। শিল্পসমৃদ্ধ এ জেলার মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। নারায়নগঞ্জ অবশ্য আগে থেকেই সমৃদ্ধ ছিলো। ব্যবসা বানিজ্য, নৌ বন্দরের কারণে এই জেলার মানুষ অনেক আগে থেকেই সমৃদ্ধ। এর পরেই রয়েছে মুন্সীগঞ্জ। এ জেলার দারিদ্র্যের হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ৩ দশমিক ৭ শতাংশ দারিদ্র্য নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পদ্মাপাড়ের জেলা মাদারীপুর। আরেক শিল্পসমৃদ্ধ জেলা গাজীপুরে দারিদ্র্যের হার ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ফরিদপুরে দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ফেনীর দারিদ্র্যের হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ। রাজধানী জেলা ঢাকার দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশ।

আমাদের ছোট বেলায় এইসব জেলার মানুষ দিনাজপুর রংপুর অঞ্চলে বিশেষ করে বৃহত্তর দিনাজপুরে জীবন জীবিকার সন্ধানে বস্তি গড়তো। দিনাজপুর  অঞ্চলে জনসংখ্যার হার ছিলো অনেক কম, যার ফলে এইসব এলাকার লোকজন দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করতো। সেইসব জেলার মানুষ আজ উন্নত জীবনের সন্ধান পেয়েছেন। এই সব অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা একেবারেই কম। তিন থেকে দশ শতাংশের মধ্যে। অধিক দরিদ্রের সংখ্যা নিতান্তই নেই বললেই চলে।

দিনাজপুর রংপুর অঞ্চলে বৃটিশ আমলে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ ছিলো না এবং এই অঞ্চলেই বড়ো বড়ো কৃষক আন্দোলন এবং কৃষক বিদ্রোহ সংঘঠিত হয়েছে, ভুমি ব্যবস্থার কোন উন্নয়ন হয় নি, শিল্পের বিকাশ ঘটে নি, দুই একটা চিনি কল ছাড়া কোন শিল্পই গড়ে উঠে নি আজো।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ জেলার মধ্যে রংপুর – দিনাজপুর অন্যতম। সব সময় এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি থাকার কারণে এই অঞ্চলের উন্নয়নে অন্য দলগুলো ক্ষমতায় থেকে তেমন কোন উন্নয়ন করেনি। আবার আওয়ামী লীগের আমলেও এখানে কখনো সে রকম উন্নয়ন করা হয়নি। শুধুমাত্র এরশাদের আমলে এবং আওয়ামী লীগের ইদানিংকালে কিছু অবকাঠামো গত উন্নয়ন ছাড়া কোন শিল্পের বিকাশ নেই বললেই চলে। কিছু অটোমেটিক চালকল আর মান্ধাত্তা আমলের চিনিকল ছাড়া আজো কিছুই পরিলক্ষিত হয়না। ইদানীং নীলফামারীতে  ইপিজেড  আর পঞ্চগড়ের  চা শিল্পের বিকাশ কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় বা দারিদ্র নিরসনের জন্য খুবই অপ্রতুল। আর সে কারণেই এক সময়ের সমৃদ্ধশীল জেলা দিনাজপুর-রংপুর আজ সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত জেলার মধ্যে অন্যতম।