ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ছোট বেলায় আমাদের পাঠ্য পুস্তুকে পিটোসবার্গের ভাষণ পড়ানো হতো। অথচ বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের এক ঐতিহাসিক ভাষণকে অস্পৃশ্য করে রাখা হয়েছিলো। রাজনীতির নোংরা খেলায় আমাদের দেশের অনেক  ঐতিহ্যকে, ইতিহাসকে, আমাদের সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানকে আমরা অবলীলা ক্রমে ভুলে যেতে পারি বা ভুলিয়ে দেবার চক্রান্তে মেতে উঠি । যে যখন ক্ষমতা আসে সে তখন নিজের মতো করে ইতিহাসের চর্চা করা শুরু করে দেয়। আর যার ফলে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা নিজেদের দেশের ইতিহাস সম্বন্ধে প্রায়  অজ্ঞ থেকে যায় অথবা ভুল ইতিহাসের জ্বালায় নিজের দেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরে। নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান না থাকায় অন্য দেশের বাজে ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে মাতামাতি করতে থাকে। নিজের ইতিহাসের খবর রাখে না, অথচ অন্যের ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামায়।

বাংলাদেশ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এক গৌরবোজ্জল ইতিহাস নিয়ে পৃথিবীতে অবস্থান করে আসছে।এই বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশীলতা বিশ্বের বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর নজর পড়েছে। কখনো তাদের কূটকৌশলের কাছে আমাদের এই বাংলা পরাজিত হয়েছে। আবার সেই পরাজয়ের প্রতিশোধও গ্রহন করেছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই আমাদের ইতিহাসে সাতই মার্চের ভাষণ ছিলো বাংলার ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জল দিক নির্দেশনা।

ব্রিটিশ শাসকেরা এই বাংলাকেই প্রথম টার্গেট করে এবং পরবর্তীতে সারা ভারতবর্ষ তারা দখল করে নেয়। আবার এই বাংলা থেকেই ব্রিটিশেরা প্রথম প্রতিরোধের সম্মুক্ষীন হয়। সেই সময় সারা ভারতবর্ষে একটা প্রবাদ বা কথা চালু ছি্লো, ’বাংলা আজকে যা চিন্তা করে সারা ভারত তা করে আগামিকাল’। সারা ভারতবর্ষের রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বাংলা ছিলো প্রাণকেন্দ্র। শত শত কৃষক বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহে ব্রিটিশ রাজ সবসময় ছিলো তটস্থ। সেই আগুন ঝরা প্রতিরোধের ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নিয়ে বাংলার মানুষ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছে, আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নায্য দাবি আদায় করেছে।

এই সংগ্রাম, আন্দোলন আর প্রতিবাদের ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠা পাকিস্তানিদের ছলচাতুরি বুঝতে সময় নেয়নি বাংলার মানুষ। তাই মাত্র সাত মাসের মধ্যেই বাংলা ভাষা বাতিল করে উর্দু রাষ্ট্র ভাষা করার চক্রান্ত রুখে দেবার জন্যে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরে। ’৫২ তে এসে যার বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু তারপরেও থেমে থাকে না চক্রান্ত। নানা চক্রান্ত আর সামরিক বেসামরিক শাসনের নামে পূর্ব বাংলাকে বঞ্চিত করার ইতিহাস, নানা বৈষম্যের শিকারে অবহেলিত করে রাখা পশ্চিম পাকিস্থানিদের ঔপনিবেশিক মন-মানসিকতার বহি:প্রকাশ ঘটতে থাকে।

বাংলার মানুষ এই ঔপনিবেশিক শাসন-শোষন থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে। এই ক্রান্তিকালীন সময়েই বঙ্গবন্ধু তার তেজোদীপ্ত নেতৃত্বে বাংলাদেশের আপামর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হোন। মজলুম জননেতার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষে সহযোগীতা  বঙ্গবন্ধুকে জনগনের অবিসংবাদিত নেতাতে পরিনত করেন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি বঙ্গবন্ধুর পিছনে এক কাতারে দাঁড়িয়ে পরে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির মনের কথা, প্রাণের দাবিগুলোকে বুঝতে শিখেছিলেন, উপলব্ধিতে এনেছিলেন এবং জীবন বাজি রেখে সেই দাবি আদায়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন। সেই আন্দোলন সংগ্রামের সকল ইতিহাস তিনি তাঁর সাতই মার্চের ভাষণে তুলে ধরেছিলেন।

গতকাল আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণকে পৃথিবীর ইতিহাসের এক বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল ঘোষনা করেছে। পৃথিবীর অনেক নেতা অনেক রাষ্ট্রপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ কোন গতানুগতিক ভাষণ ছিলো না। এই ভাষণে ছিলো ইতিহাস, এই ভাষণে ছিলো শোষন বঞ্চনার ইতিকথা, এই ভাষণে ছিলো পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার, নির্যাতন আর মানুষ হত্যার কথা।বাংলার মানুষের বঞ্চনা আর শোষিত হবার ইতিহাস।

সাতই মার্চের ভাষণ কোন লিখিত ভাষণ ছিলো না। বাঙালির মধ্যে থেকে বাঙালির নেতা হয়ে বাঙালির মনের কথাগুলো তুলে ধরেছিলেন সাবলীল ভাষায়। কখনো শুদ্ধ বাংলায়, কখনো ফরিদপুরের আঞ্চলিক ভাষায়। এ যেন এক হ্যামিল্টনের বাঁশিওয়ালা। তিনি তাঁর বাঁশিতে বাংলার সুখ-দুঃখের সুর তুলেছেন আর কোটি কোটি মানুষ সেই সুরে সুর মিলিয়ে স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছে।

সাতই মার্চের ভাষণ একদিকে যেমন ছিলো বাংলার ইতিহাসের এক করুণ কাহিনী। অন্যদিকে এই করুণ নির্যাতনের হাত থেকে কিভাবে মুক্তি আসবে তার পথ নির্দেশনা। তিনি বাঙালি অবাঙালি, হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, আদিবাসী, জাতি-উপজাতি  সবাইকে উদ্বুদ্ধ হতে বলেছিলেন। নিজেদের মধ্যে হানাহানি করতে মানা করেছিলেন। আবার ঘরে ঘরে যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হুকুম দিয়েছিলেন।

হরতালে কী চলবে কী চলবে না তার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীদের বলেছেন তাঁর হুকুম মেনে চলতে। একটা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কী হতে পারে বা পারেনা তার সকল নির্দেশনা তিনি তাঁর সাতই মার্চের ভাষণে দিয়ে গিয়েছেন। তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। তাই ভবিষ্যতের নির্দেশনাও বলে গেছেন তার বক্তৃতায়।

সেই বক্তৃতার ৪৬ বছর পরে এসেও বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণ সেই সময়কার মতোই প্রাসঙ্গিক। আজ ইউনেস্কো সাতই মার্চের ভাষণকে ইতিহাসের ঐতিহ্য বিশ্ব প্রামাণ্য ঘোষনা করে ইউনেস্কো নিজেকেও সন্মানিত করেছে।