ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
Aziz-Anik-02

আমাদের সহযোদ্ধা সাতক্ষীরার একটি আসনের সাংসদ মোস্তফা লুতফুল্লাহের ছেলে অনীক আজিজ খান  আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যা করেছে নিজ ঘরে ডিস লাইনের তার গলাতে পেঁচিয়ে। এমন আত্মহত্যা আমাদের সমাজে অহরহই হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে অনীক আত্মহত্যা করেছে এ মেনে নিতে পারছি না। অনীক ছোটবেলা থেকেই বাম ঘরানার বাবা-মায়ের পরিচর্যায় বাম সংগঠনের নেতা কর্মিদের কোলে পিঠে মানুষ হয়েছে, তাই মানসিকভাবেও সে বাম ঘরানার মধ্যেই মানুষ হয়েছে। কোন নেশা বা অন্য কোন বদ অভ্যাসের কথাও জানা যায়নি তার জীবন কালে।

অনীক গতকাল তার ছোট বোনসহ রপ্তানি মেলায় ঘুরেছে, বোনের সংগে বেড়িয়েছে, ছবি তুলেছে। ছবি তোলা তার নেশার মতো ছিলো। সে নিজেকে ফটোগ্রাফার হিসেবেই তৈরি করতে চেয়েছিলো, সেভাবেই তার পথ চলা। অথচ সব কিছু পিছনে ফেলে অনীক স্ব-ইচ্ছায় চলে গেলো জীবনের ওপারে। যেখান থেকে ফিরে আসার কোন পথ আজো জানা যায়নি। হতে পারে কোনো প্রেম ঘটিত জটিলতা, অথবা অন্য কোন অভিমান। এক নিরাপত্তাহীনতা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে উদ্ভ্রান্ত করেছে, এটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে অনীক তার বাব-মায়ের সংগে বন্ধু হিসেবেই মানুষ হয়েছে।  আমরা, তার বাবাসহ স্বপ্ন দেখতাম এই ঘুনে ধরা সমাজটাকে পরিবর্তনের, আমরা শপথ নিয়েছিলাম  আমাদের সন্তানদের একটা শোষনহীন, বৈষম্যহীন, উৎপাদনমুখী সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থাসহ এক সমাজ উপহার দিবো। যে সমাজে ঝরে পড়া থাকবে না, শোষন নির্যাতন থাকবে না, নারী নির্যাতন থাকবে না, নারী তার সিদ্ধান্ত নিজে নিত পারবে, প্রতিটি শিশু সরকারের খরচে শিক্ষা জীবন শেষ করবে। এমন এক সুন্দর স্বপ্ন আমরা ধারাবাহিক ভাবেই পেয়ে এসেছি।  আবার আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই স্বপ্নকে তুলে দিয়েছি, এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য হাজার হাজার নেতাকর্মী নিজেদের ভবিষ্যতকে উৎসর্গ করেছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।

অনীকের বাবাও সেই স্বপ্নের একজন সারথী, একজন নেতা, আমরা সবাই স্বপ্নই শধু দেখিনি হাজার মানুষকে সংঘঠিত করেছি, করেছিলাম।  কিন্তু  …। তবে কি অনীকের কাছে অনীকের বাবার সেই স্বপ্নকে অলীক মনে হয়েছিল? অনীক কি তাঁর বাবার স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখার কোন সম্ভাবনা দেখেনি বলেই কি আত্মহত্যা করলো?

আত্মহত্যা তো অনীকের বাবার বা আমাদের করা উচিত। আমরা যে স্বপ্ন, যে সমাজ ব্যবস্থার জন্য হাজার  নেতা-কর্মীদের জড়ো করেছিলেম বা আমাদের যারা জড়ো করেছিলেন তাদের কি ব্যথতার দায় ঘাড়ে নিয়ে আত্মহত্যা করা উচিত নয়। আমাদের শহীদ জামিল আক্তার, রিমু, ইয়াসির, ফারুক, পান্না সহ হাজার শহীদের মৃত্যুর দায় কাঁধে নিয়ে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে নিজেদের শেষ করে দেয়া উচিত নয়?

অনীক আজিজ খান, তোমার আত্মহত্যা আমাকে অপরাধী করে তোলে। তোমার চলে যাওয়া আমাদের ব্যর্থতাকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যায়। সমাজ পরিবর্তনের অনেক বড়ো বড়ো নেতা, দার্শনিক বা সমাজ বিশ্লেষক অনীকের আত্মহত্যা নিয়ে অনেক বিশ্লেষনে মেতে উঠবেন। শোক সভায় অনেক শপথ উচ্চারিত হবে কিন্তু অনীক যেমন আর ফিরে আসবে না তেমনি আমাদের সমাজ বদলের সেই স্বপ্নও সুদূর পরাহত হয়েই আমাদের কাছে থেকে যাবে। কারণ আমরা নিজেরাই এখন সেই স্বপ্নকে বাদ দিয়ে রাজনীতি করছি, সেই সমাজ বদলের রাজনীতি এখন শুধুই ক্ষমতায় যাওয়ার, থাকার বা পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।