ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ছোটবেলায় ট্রেনে করে ঢাকা আসার সময় পূর্ববঙ্গের একটি বিশেষ স্টেশন এলেই সবাই তটস্থ হয়ে যেতাম।  হাত বাইরে রাখা যাবে না, গলা সাবধানে রেখো, জানালা বন্ধ করো – এরকম নানা কথা আর জানালা বন্ধের তৎপরতা শুরু হয়ে যেত। আমরা ছোটরা বড়দের এই সব দেখে আরো বেশি ভীত হয়ে বড়দের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করতাম। অনেক সময় ভালো মানুষকেও মনে মনে ডাকাত বা ছিনতাইকারি ভেবে অযথাই ভয়ে ভয়ে তাকাতাম। কল্পনার রাজ্যে অনেক কিছু করে ফেলতাম।

বড় হয়েও আমরা সেই স্টেশন এলেই অযথা সতর্ক হয়ে যেতাম, আজকাল আর সে রকম নেই। তবে এখন সতর্ক হতে হচ্ছে আমাদের এই প্রিয় ঢাকা শহরেই। গত কিছুদিন ধরে ঢাকা নগরের বিভিন্ন জায়গায় ছিনতাইয়ের ঘটনা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করে সুযোগ মতো ছিনতাই করার ঘটনায় এই মাসে দুইজনের অধিক প্রাণ হারিয়েছে। বেশ কিছু বিকাশ কেন্দ্রের টাকা বহনকারীর টাকা ছিনতাই হয়েছে এবং বহনকারী প্রাণ হারিয়েছে ছিনতাইকারীদের হাতে।

আজকের একটি জাতীয় দৈনিক ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তার নাম উল্লেখ করে ছিনতাই হওয়ার খবর প্রকাশ করেছে এবং সেইসব এরিয়া এড়িয়ে বা সাবধানে পার হবার সতর্কতা দিয়েছে।

পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনানুযায়ী এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের কলেজগেট থেকে রিং রোড, ধানমণ্ডির শুক্রাবাদ থেকে ২৭ নম্বর, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরের পুরোটা, আগারগাঁওয়ের সংযোগ সড়ক, খিলক্ষেত থেকে বিমানবন্দর সড়ক, মৌচাক মার্কেট থেকে মগবাজার, সদরঘাট থেকে সূত্রাপুর-দয়াগঞ্জ, ওয়ারী, উত্তরা থেকে আবদুল্লাহপুর, ঝিগাতলা থেকে রায়েরবাজার-শংকর, মিরপুরের রূপনগর-বেড়িবাঁধ, যাত্রাবাড়ীর দোলাইরপাড়-শ্যামপুর, গাবতলী থেকে মিরপুর ১, ঝিগাতলা থেকে শংকর, গুলিস্তান থেকে পল্টন, সার্ক ফোয়ারা থেকে রমনা পার্ক, কাঁটাবন থেকে নীলক্ষেত, পলাশী থেকে আজিমপুর উল্লেখযোগ্য। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর)

এইসব এলাকায় বর্তমানে অহরহ ছিনতাই এবং রাহাজানি হয়ে চলেছে। রিক্সা বা মোটর সাইকেল আরোহী হচ্ছে এইসব ছিনতাইয়ের টার্গেট। মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, স্বর্ণের চেইন হচ্ছে ছিনতাইকারীদের প্রধান লক্ষ্য। এক মোটর সাইকেল থেকে আরেক মোটর সাইকেল দিয়ে ছিনতাই করা, রিক্সা আরোহীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া- এইসব ছিনতাই ঘটনা ঘটে রাতের বেলা, ভোরবেলা এবং অনেক সময় সন্ধ্যায় । এইসব অঞ্চলে পুলিশের টহল গাড়ি থাকলেও কোন লাভ পাওয়া যায় না। প্রায় দেখা যায় ছিনতাই যখন হচ্ছে তখন  আশেপাশে পুলিশের দেখা মেলে না। ছিনতাই সম্পন্ন হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে টহল পুলিশ এসে হাজির হয়। এবং তখন দেখা যায় যারা ছিনতাইয়ের শিকার তাদের উপরেই হম্বিতম্বি চালান পুলিশের টহল দল।

ঢাকা শহরে এক সময় ছিনতাই এবং ‘টানা পার্টিদের’ দৌরাত্ম এতোই বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে মানুষ স্বাভাবিক চলাচলেও ভয় পেতো। কিছু এলাকায় ভয়ে সন্ধ্যার পর মানুষ বা রিক্সাওয়ালারা যেতে চাইতো না। মাঝখানে এইসব দৌরাত্ম অনেকদিন না থাকলেও ইদানিং সেই ভয়, সেই ছিনতাই এবং ‘টানাপার্টির’ দৌরাত্ম আবার  ফিরে এসেছে এবং আরো ভয়ঙ্কর হয়ে। এবার সরাসরি জীবনহানির ঘটনা প্রথম থেকেই ঘটছে। বেশ কিছুদিন আগে টহল পুলিশের মধ্য থেকেও ছিনতাই এবং ‘টানাপার্টির’ অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা এখনো তদন্তাধীন।

এই ছিনতাই, রাহাজানি আর ‘টানা পার্টির’ দৌরাত্মের সাথে সাথে যোগ হয়েছে নতুন উপসর্গ, হিজড়াদের বিভিন্ন পাবলিক বাসে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক জ্যামের সুযোগে চাঁদাবাজি। এই সব হিজড়ারা অনেকটাই জোর  করে সাধারন মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। এইসব চাঁদাবাজিতে আইন-শৃংখলা বাহিনীর কোন ভ্রুক্ষেপ থাকে না। অথচ দিনের পর দিন এইসব হিজড়ারা অবাধে চাঁদাবাজি করে চলেছে এবং চাঁদা না দিলে অসভ্যতার আশ্রয় নিয়ে মানুষদেরকে অপমান করছে।

রাজনৈতিক ডামাডোলে পুলিশের ব্যস্ততায় এইসব ছিনতাই-রাহাজানি আর ‘টানা পার্টির’ দৌরাত্ম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এইসব ছিনতাই, রাহাজানি বা ‘টানা পার্টির’ কাজ না চললেও মাদক নেশার জন্য অনেকাংশ দায়ি এইসব ছিনতাই-রাহাজানি।