ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে উনিশ শতকের প্রথম দিকেই হঠাৎ করে রাজনীতির ময়দানে হাজির হলো মুসলিম লীগ, সাথে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি। এই দাবির সাথে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের কোন দিক-নির্দেশনা না থাকলেও শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য আলাদা একটা রাষ্ট্র হবে এই আনন্দেই সবাই মাতোয়ারা হয়ে গেল! কিন্তু আনন্দের ভিতরেই যে ভারতীয় মুসলমানদের সামাজিক-রাজনৈতিক পরাজয় হলো এটা কেউ চিন্তা করে দেখেনি। আসলে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাজনীতি বা রাষ্ট্রের দাবির মধ্যে যে সাধারণ মানুষের কোন সম্পর্ক নেই সেটা বুঝে ওঠার আগেই ভারত ভাঙ্গার সর্বনাশা খেলায় সবাই মেতে ওঠে। এই ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় সামিল হয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের বেশ কিছু নেতা। অথচ যারা ভারত ভাঙ্গার বিরোধী ছিলেন তারা পাত্তাই পেলেন না! বরঞ্চ, উভয় পক্ষের কাছে অনেকটা অপাংক্তেয় হয়ে উঠলেন।

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা পাওয়ার পরপরই পাকিস্তানি অংশের পূর্বাঞ্চলের মানুষ এই স্বাধীনতার আসল রূপ বুঝতে পারে। যখন পাকিস্তানি শাসকেরা এক ছোট রাজ্যের ভাষা উর্দুকে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। আসলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বৃহৎ অংশ পূর্ব-বাংলাকে দমিয়ে রাখতে এবং এই অঞ্চলের সম্পদকে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে কাজে লাগানোর চক্রান্ত হিসেবে প্রথম আঘাত হানতে চায় তার ভাষা তথা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। এই ইতিহাস আমাদের জানা। আমাদের পূব বাংলার ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সকল ষড়যন্ত্রকে রুখে দিয়েছিলো এবং সেই ভাষা অন্দোলনের সফলতার পথ ধরে পূর্ব বাংলা স্বাধীন হয় পরবর্তীতে।

একমাত্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরাই নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছে এবং বুকের রক্ত দিয়েছে, পৃথিবীর অন্য কারো এমন নজির নেই। এই ভাষা সংগ্রাম হয়ে উঠে সারা পৃথিবীর মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন। যার জন্যে অনেক দেরীতে হলেও জাতিসংঘে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃত।

এই বাংলাদেশে আমরা আমাদের অহংকার ২১ শে ফেব্রুয়ারি পালন করি অত্যন্ত সম্মান ও গাম্ভীর্যের সাথে। আমরা মনে করি ২১শে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে সারা পৃথিবীর ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এক অবিস্মরণীয়  রক্তাক্ত এবং বিজয়ের ইতিহাস। পৃথিবীর সমস্ত অবহেলিত ভাষার পাশে দাঁড়িয়ে বাংলা সাহস যোগাবে, বাংলা অবহেলিত ভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেকে সামিল করবে এটাই যৌক্তিক। কিন্তু সেই স্বাধীন বাংলাদেশে যখন দেখা যায়, এই দেশের উপজাতীয় ভাষাগুলো বাংলা ভাষার আধিপত্যে প্রায় হারিয়ে যেতে বসছে, তখন সত্যিই আশ্চর্য হতে হয়।

বাংলাপিডিয়ায় দেয়া তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে চাকমা, গারো, মারমা, খাশিয়া, মং, সাওতাল, মুনিপুরী, ওরাও, ত্রিপরা সহ প্রায় ৩০/৩২ টি উপজাতি দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে। এদের আছে নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার অনুষ্ঠান। সরকারি পর্যায়ে এই উপজাতী গোষ্ঠীগুলোর জন্য কিছু জায়গায় আদিবাসী ফাউন্ডেশন বা উন্নয়ন একাডেমি গড়ে ঊঠলেও এদের ভাষা বা সংস্কৃতির উন্নয়নে তেমন কোন কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে হচ্ছে না। আমাদের সংসদে একটি আদিবাসী ককাস নামে বডি থাকলেও কিছু বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত গবেষণাধর্মী প্রকাশনা আর সেমিনারের মধ্যেই তাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ।

এইসব উপজাতিদের বসবাস প্রধানত রাজশাহী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ২০-৩০ লক্ষ উপজাতীয় লোক স্ব-স্ব ভাষায় কথা বলে (যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ি এই সংখ্যা মাত্র ৭ থেকে ৮ লক্ষের বেশি নয়)। উপজাতীয় ভাষাগুলির মধ্যে ওরাওঁ, খাসিয়া, গারো, চাকমা, মগ, মণিপুরী, মুন্ডা ও সাঁওতাল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া রয়েছে কাছাড়ি, কুকি, টিপরা, মালপাহাড়ি, মিকির, শাদ্রি, হাজং ইত্যাদি। (সূত্র: বাংলাপিডিয়া।)

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও সিলেটের চা-বাগান এলাকায় প্রায় লক্ষাধিক লোকের মাতৃভাষা ওরাওঁ। খাসিয়ারা ওয়ার নামক ভাষায় কথা বলে। ‘আচিক কতা’ অর্থাৎ পার্বত্য গারোভাষা বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং ভারতের মেঘালয় সীমান্তে পার্বত্য গারো অঞ্চলে প্রচলিত। রংপুর, সুনামগঞ্জ এবং ঢাকা জেলার শ্রীপুরেও কিছুসংখ্যক গারোভাষী লোক আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন লক্ষাধিক লোক চাকমা ভাষায় কথা বলে। মগভাষার আদি স্থান আরাকান। বাংলাদেশে দু-লক্ষাধিক লোক মগভাষায় কথা বলে। প্রায় ২৫০ বছর পূর্বে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে মণিপুরী ভাষার প্রচলন হয়।  বাংলাদেশে মুন্ডাভাষীর সংখ্যা ১৫-২০ হাজার। দেশের উত্তরাঞ্চলে সাঁওতালভাষীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। উত্তর ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইলে অর্ধলক্ষাধিক হাজং এবং কিছুসংখ্যক কাছাড়িও স্বকীয় ভাষায় কথা বলে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় দুহাজার মুরং ও রিয়াং উপজাতীয় টিপরা ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশে প্রায় নয় হাজার লোকের মাতৃভাষা মালপাহাড়ি। সিলেটের কিছুসংখ্যক লোকের ভাষা মিকির। মালো, মাহাতো, গঞ্জু, কোলকামার এবং কিছু ওরাওঁ উপজাতীয় মিলে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক লোকের ভাষা শাদ্রি। (বাংলাপিডিয়া অনুসারে।)

উপজাতীয় ভাষাগুলির আদর্শ রূপের অভাব, শিক্ষার্থীর স্বল্পতা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে কোনো উপজাতীয় ভাষাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়নি। দু-একটি ছাড়া সব উপজাতীয় ভাষাই অলিখিত, অর্থাৎ সেসবের কোনো লিখিত রূপ নেই। চাকমা ও মগ ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার নিজস্ব বর্ণমালাও নেই।

এই যে এক বিশাল সংখ্যক উপজাতি ভাষা, আমাদের প্রায় বিশ-ত্রিশ লাখ জনসংখ্যার ভাষা, সেই ভাষাগুলো আজ প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলো শুধু অবহেলিতই হচ্ছে না, উপজাতি জনগোষ্ঠীকে বাঙালিকরণের প্রক্রিয়ার মতো তাদের ভাষাগুলোকেও আজ ভুলিয়ে দেবার বা নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে- যা একুশের চেতনার সাথে কিছুতেই মিলে না।

একুশ আমাকে মাতৃভাষায় কথা কথা বলে অধিকার দিয়েছে। এই অধিকার কারো দান নয়, এই অধিকার শুধু বাংলা ভাষার জন্য আজ আর প্রজোয্য নয়। ২১ শে আজ সারা পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার জন্য। সকল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাতৃভাষা কে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে আরো ২১শে তৈরী হলেও আমরা পাশে থাকতে চাই। বুকের রক্ত দিয়ে হলেও সেই মাতৃভাষাকে সমুন্নত রাখতে চাই।