ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বহুল আলোচিত এবং প্রত্যাশিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল গত ১৫ মে। কিন্তু মহামান্য হাইকোর্টের এক আদেশে গাজীপুরের নির্বাচন স্থগিত হয়ে গেলেও নির্ধারিত তারিখে শুধু খুলনায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক প্রায় সত্তর হাজারের বেশি ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০০৮ সালে মেয়র নির্বাচিত হয়ে অনেক উন্নয়ন কাজ করেছিলেন তিনি, তারপরও পরবর্তী ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর কাছে হারেন আবদুল খালেক। সে অধ্যায় এখন ইতিহাস।

 

 

 

এবারে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং জোট নির্বাচনকে ঘিরে নানা প্রস্তুতি ও প্রচারণা চালায়। সেই সাথে নির্বাচন কমিশনের কাছে পারস্পারিক দোষারোপের রাজনীতিও চলতে থাকে। বাংলাদেশি গণতন্ত্রের এটা যেন এক অলিখিত ঐহিত্য! এই দোষারোপের খেলা ছাড়া ভোটই সম্পন্ন হয় না। যত নিরপেক্ষতার চাদরেই নির্বাচন হোক না কেন, দলগুলো পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনবেই, সে বিরোধী দল হোক কিংবা সরকারি দল। খুলনা সিটি করপোরেশনের (খুসিক) নির্বাচনে শুরু থেকেই প্রধান দুই দল নির্বাচন কমিশনে একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেছেন। মজার বিষয়, বিএনপির পাশাপাশি সরকারি দলও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছিলেন। এমনকি যে দল প্রায় পাঁচ লাখ ভোটারের মধ্যে মাত্র পাঁচ শতাধিক ভোট পায়, তারাও প্রেস কনফারেন্স ডেকে পক্ষপাতিত্ব এবং ভোট কারচুপির অভিযোগ এনেছে!

যাই হোক স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে খুলনা সিটির নির্বাচন অনেকটাই শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। নির্বাচনের সময়কালে এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম ভোট ডাকাতির বা বিশাল পরিমাণে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হতে পারে এমন কোন খবর দেয়নি। হ্যাঁ অনিয়ম কিছু হয়েছে। পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ এসেছে, জাল ভোট দেওয়ার কিছু খবর আর কেন্দ্র দখলের চেষ্টার খবর কিছু কিছু এসেছে। কিন্তু এসব যে হারে হয়েছে তা নির্বাচনের ফল পরিবর্তনে কার্যকরি হওয়ার মতো নয়।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন সাহেবও বলেছেন নির্বাচন মোটামুটিভাবে ভাল হয়েছে। আর আমাদের দেশে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা মনে হয় কেউই করে না। অন্যদিকে একটি বিশেষ গোষ্ঠী এবং তাদের সংবাদ মাধ্যম, যারা এখনো ‘মাইনাস টু’ বাস্তবায়নের স্বপ্নে দিন গুনেন, তারা নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন আলাপে মেতেছেন। নির্বাচনের দিনে তেমন কিছু না বললেও দ্বিতীয় দিন থেকে তারা বিভিন্ন অভিযোগ ও ‘অনিয়মের’ তালিকা তুলে ধরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা শুরু করেছেন, যা কিনা স্পষ্টত বুঝা যায়।

আর আমাদের দেশে যে-ই বিরোধী দলে থাকে তারা নির্বাচনে হেরে কারচুপি, ভোট ডাকাতি, কালো টাকা বা পেশি শক্তির কারণে হেরে গেছেন- এমন অভিযোগ করে থাকেন। স্বাভাবিকভাবে এবারেও বিএনপি সহ অন্য দলগুলোও তাই করেছে। এমনকি যারা ৩০০ বা ৫০০’র মতো ভোট পেয়েছেন তারাও একই অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলন করে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন।

দেশের সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর অবস্থা আজ প্রায় প্রান্তিক সীমায় পৌঁছেছে। কিন্তু তারপরেও এঁদের বোধোদয় হয় না। সাংগঠনিক কাজ করার কোন আলামত খুঁজে পাওয়া যায় না। উল্টো সাধারণ জনগণকে অপমান এবং ছোট করার মতো বক্তব্য দিয়ে তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকবার অপপ্রয়াস চালান। তারা অভিযোগ করেন, কালো টাকা এবং পেশিশক্তির কাছে হেরে গেছেন। এ কথার অর্থ হলো জনগণ সবসময় নিজেদের ভোট কালো টাকার কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন! যদি তাই হয় তাহলে বলবো, আমাদের সমাজতান্ত্রিক দলগুলোই ব্যর্থ। তারা তাদের আদর্শ বা রাজনীতি জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারেন নি। আসলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে লোভী বা ভিতু অপবাদে অপমানিত করছেন।

শিল্পাঞ্চল হিসেবে খ্যাত খুলনা শহরে শ্রমিক শ্রেণির আধিক্যইই বেশি। সেখানে যদি সমমনা অন্য বাম দলগুলোর সমর্থন পাওয়া একটি বিখ্যাত ও পুরানো কমিউনিস্ট পার্টি মাত্র ৫৩৪ ভোট পান, তবে এই ব্যর্থতা কার- দলের নাকি জনগণের? অথচ সেই দলই আবার প্রেস কনফারেন্স করে জনগণকে অপমান করে ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলে! এ লজ্জা আসলে কার?