ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

49384346957_7389580057487742795_n

বিখ্যাত এক লক-পিকিং এক্সপার্টের (চাবি ছাড়া তালা খুলায় সিদ্ধহস্ত যে) কথা মনে পড়ে গেলো। যদিও তার মূল পেশা তালা মেরামত করা, চাবি বানানো। বেশ কিছুদিন আগের কথা। যেখানে কাজ করতাম, সেখানে অনেক তালা। দরজার জন্য চারটি, কেবিনেটের আট আর ড্রয়ারগুলোর জন্য ষোল-সতেরোটি। চাবি যার কাছে থাকে, সে একদিন লাঞ্চ করতে বাইরে গেলো, আর আসার সময় কোথায় যেনো চাবিগুলো ফেলে রেখে চলে এলো। প্রতিটি তালারই দু-তিনটি বাড়তি চাবি থাকে। কিন্তু কোনো একটি হারিয়ে গেলে, ওগুলোর উপর নির্ভর করে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকতে চায়না কেউ। সুতরাং চাবি হারিয়ে গেলে নতুন তালা কেনাটা জরুরী। তবে এক্ষেত্রে ঘটলো অন্য বিপত্তি। বাড়তি চাবিগুলোও ছিলো ডেস্কের কোনো এক ড্রয়ারে, যার চাবি আর কারো কাছে নেই। তখনও অফিসের অনেক কাজ বাকি। ম্যানেজারের নিজস্ব ব্যবহারের প্রয়োজনেই ওই মূহুর্তে তালা কেনার চেয়ে তালা খুলা ছিলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই সুবাদে এই তালা বিশেষজ্ঞের প্রতিভা দর্শনের সুযোগ হয়েছিলো। তিনি এসেই চিকন কয়েকটা লোহার কাঠি আর তার দিয়ে আলতো করে খুঁচিয়ে পটাপট সবগুলো তালা খুলে ফেললেন। আমি জানতে চাইলাম আরও বড়সড় তালাও এমন করে খুলা যায় কিনা। তিনি বললেন, “তালার সাইজ আর দাম কোনো বিষয় না। আপনে আমারে আইন্না দেন, দুই মিনিটের মধ্যে খুইল্লা দিয়াম।” মূল দরজার তালার একটা চাবি আমার কাছে ছিলো। তালাটি খুলে আবার লাগিয়ে দিয়ে তার হাতে দিলাম। সাড়ে তিনশো টাকার তালা। গায়ে “টপ সিকিউরিটি” লেখা। তিনি স্মিত হেসে তালাটি নিয়ে কাঠি দিয়ে খুঁচাতে শুরু করলেন। দু’মিনিটের অনেক আগেই তালার টপ সিকিউরিটি ফ্লপ করলো। তিনি হাসিমুখে তালাটি আমার দিয়ে বাড়িয়ে দিলেন। আমার মুখ বিস্ময়ে হা, এবং সত্যি বলতে আমি ভীষণ হতাশও হলাম। তিনি বললেন, “স্যার, দামী তালা হইলো আসলে মনের শান্তি। আর কিচ্ছু না। যার খুলার দরকার সে সময় মতো খুলবোই। আপনি চাবি দিয়া খুলবেন। আরেকজন বাইরাইয়্যা শব্দ কইরা খুলবো, আর আমি শব্দ ছাড়া খুলি। এই পেশায় সতেরো বছর ধইরা আছি। তালা আমার হাতো আইলেই পোষ মাইন্যা যায়।” আমার চাবি হারানোর রোগ আছে। বছরে তিন চারবার তালা বদলাতে হয়। এই গুণী শিল্পী আমার বিরাট উপকার করেছেন। আমি আর কখনও খুব দামী তালা কিনিনি।

প্রসঙ্গটি আমাদের জাতীয় জীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। অপরাধ দমনে আইনের কেতাবী কঠোরতা, প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে বত্রিশ সেট প্রশ্ন করার ঘোষণা, অবৈধ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ব রোধে বাজারে অভিযান পরিচালনা, ফরমালিন মুক্ত খাবার পেতে ফরমালিন পরীক্ষার যন্ত্র কেনার পরামর্শ—এই সবই তো ওই তালা সদৃশ আপাত শান্তির ভুয়া আয়োজন, যখন মন্ত্রী এবং আমলা, মনিব এবং তার কামলা, পুলিশের বড়কর্তা, বিচারপতি, গীর্জার ফাদার, মন্দিরের পুরোহিত, মসজিদের ইমাম (কেউ কেউ করেই অনেক হয়ে যায়) নিজেরা নীতিভ্রষ্ট হয়ে কানুন প্রতিষ্ঠায় অত্ননিয়োগ করে, আর আমাদেরকে নছিহত করে। ধরুন, কেউ দাঁড়িয়ে জলবিয়োগ করে। এটা ঠিক নয়—এই বলে আরেকজন তাকে বসে কাজটি করার পরামর্শ দিলো এবং বিনামূল্যে একবাক্স টয়লেট টিস্যুও দিলো সদ্ব্যবহার করতে। ভালো কাজ, নিঃসন্দেহে। খানিক বাদে পরামর্শদাতা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ‘মুইত্যা ড্রেইন ভাসায়া’ দিলো। এরপর জিপার টানতে টানতে টিস্যু গ্রহীতাকে বললো, “খুব চাপ পড়ছিলো তো…”–এই রকম প্রেষণা নিয়ে আমরা কতটা বদলাতে পেরেছি?

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ তালার প্রয়োজন তবু অনস্বীকার্য। তবে আন্তঃব্যক্তিক (পাবলিক বা প্রাইভেট) রিলেসনের ক্ষেত্রে তালা ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। তালা বাড়ায় জ্বালা। জরুরী জিনিষটা হলো পারস্পরিক বিশ্বাস, যা বন্ধনের দৃঢ়তা বাড়ায়। আর বন্ধন মানে শৃঙ্খল বা তালা নয় মোটেও। বিশ্বাস করে ভুল করেছেন? আপনি দূর্ভাগা। তবে বিশ্বাসের বিকল্প খুঁজতে যাবেননা