ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

hold-hand-ill-take-61043

প্রেম হলো স্বর্গীয় এক সুধা। আবার কারো কাছে প্রেম মানে বালতিভরা বিষ। কেউ বলবেন বেদনা, কেউ যাতনা, হতাশা, প্রলয়, মৃত্যু ইত্যাদি ইত্যাদি। হরেক রকম সংজ্ঞার ভিড়ে প্রেম কী,  তার চেয়ে কী নয় –সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এটা তো ঠিক যে, প্রেম নিয়ে গবেষণায় অনেক অগ্রগতি হলেও এর সংজ্ঞা আর রকমফের নিয়ে কোনো সম্পূর্ণ রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিংবা এসব বিষয়ে মনুষ্য প্রজাতির আগ্রহের বিলুপ্তি হয়েছে এমন মনে করবার কোনো কারণ নেই। দৃশ্যমাণ পরিবর্তন বলতে যা স্পষ্ট সেটা দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন, আর কিছু নয়। যতো কিছুই হোক বা না হোক, পৃথিবীতে প্রেম চলতে থাকবে, প্রেম নিয়ে গবেষণাও চলতে থাকবে—এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কলেজে পড়ার সময় আমাদের এক বন্ধু প্রেমের এক উদ্ভট এবং সত্যি বলতে, বেশ একটু ক্রুড টাইপের প্রকরণ তৈরি করেছিলো। ওকে আমরা সবাই জিনিয়াস মানতাম। খুব ঠোঁটকাটা ছিলো। ওর কাছেই প্রথম জেনেছিলাম তিন প্রকারের প্রেমের কথা। প্রথমটি হলো এ্যকচ্যুয়্যাল প্রেম। এটাই সত্যিকারের প্রেম। বাকি দুটোর একটি হলো সেক্সুয়্যাল আর অন্যটি কমার্শিয়্যাল। যেহেতু এর চেয়ে ভালো কোনো প্রকারভেদ আমাদের জানা ছিলোনা, আমরা এটাকেই সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নোত্তর হিসেবে জানতাম। তখন প্রযুক্তি এতোটা এগিয়ে ছিলোনা যে, গুগল করে সব পাওয়া যেতো। জানবার file (ss3)পথে সমস্যা আরও ছিলো। তখন কলেজের ইংরেজি বইয়ে ব্রিটিশ কবি রবার্ট গ্রেইভ্‌স-এর একটা কবিতা ছিলো। নাম ‘এ ফ্রস্টি নাইট’। আমাদের স্যার ছিলেন খুব চমৎকার মানুষ এবং একটু রক্ষণশীল টাইপের। এটা আরও বোঝা গেলো যেদিন তিনি ক্লাসে বললেন যে কবিতাটি তিনি পড়াবেননা। প্রমিত বাংলায় কথা বলা আমাদের প্রিয় এই ইংলিশ স্যার বললেন, “বাবারা, এটা প্রণয় সংক্রান্ত কবিতা, আর আসলে বাবা এটা পড়াতে আমার ইচ্ছে করেনা। তোমরা নিজেরা পড়ে নিও।” স্যারের অনাগ্রহ আমাদের কাছে সুড়সুড়ি হয়ে লাগলো। সেদিন কলেজ থেকে ফিরে আমি হাই ভোল্টেজ্‌ড আগ্রহ নিয়ে ওটা পড়ার চেষ্টা করে গেলাম, কিন্তু না। কবিতার শেষদিকের এক পঙক্তির আই লাভ ইউ ছাড়া আর বিশেষ কোনো মানেটানে বুঝতে পারলামনা; স্যারের বিব্রতবোধের কারণটাতো নয়ই। অনেক পরে  আবারও ওই কবিতাটা পড়ে স্যারের বিব্রত হওয়ার কারণ অনুমান করে আমি নিজেও বিব্রত হয়েছিলাম কারণ আমার উপলব্ধি হলো, আমাদের স্যার একটু না, অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিলেন।

পরবর্তীতে আরও অনেকের মতো আমাদেরও ধারণার অসম্পূর্ণতা কমেছে কিছু, আর তখন আরও অনেক কিছুর সাথে প্রণয় সংক্রান্ত বিশ্বাস আর ধারণাতেও নানাবিধ পরিবর্তন এসেছে। জানলাম প্লেটোনিক আর রোমান্টিক প্রেমের কোন্‌টা কী। আত্মিক সম্পর্ক আছে, কিন্তু শরীরবৃত্তীয় কোনো আকর্ষণ সক্রিয় নয় এমন সম্পর্কই প্লেটোনিক প্রেম। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো এই সংজ্ঞা দিয়েছেন, আর তাই তাঁর নামানুসারে এই নাম। তবে প্লেটোর ডায়ালগ Symposium-এ সক্রেটিসের বক্তব্য আমাদেরকে প্রেমের দুইটি ধরণের সাথে পরিচিত করায়। একটি হলো ‘ভালগার এরোস’ (Vulgur Eros) তথা জাগতিক বা ভোগবাদী প্রেম, যেখানে শরীর সৌষ্ঠব, যৌনতা আর  পণ্যাশ্রয়ী  আকাংক্ষা ভালোবাসার উৎস হয়ে কাজ করে। আর অন্যটির নাম ‘ডিভাইন এরোস’ (Divine Eros) বা স্বর্গীয় প্রেম, যা ভোগের উর্ধ্বে এক আধ্যাত্মিক আকর্ষণ দিয়ে ব্যক্তির অন্তরকে পূর্ণ করে, আলোকিত করে। তবে সক্রেটিসের মতে, ভালগার এরোস থেকেই ধীরে ধীরে ডিভাইন এরোসের দিকে যাত্রা শুরু হয়। অবশ্য সক্রেটিস প্রেমের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বলতে দার্শনিক সিদ্ধি অর্জনকে বুঝিয়েছেন, অর্থাৎ তিনি যে বিষয়টির উপর জোর দিয়েছেন তা হলো প্রজ্ঞাপ্রেম।

এদিকে ফ্রয়েড প্রেমকে যৌনতার সাথে আদর-সোহাগের মিথষ্ক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। শিশুর স্তন্যপান, আঙুল লেহন- এসবের মাধ্যমে যৌনতার সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছেন তিনি এবং প্রেমের প্রাথমিক প্রকাশ হিসেবেও একেই বুঝিয়েছেন। এছাড়াও প্রেমের প্রকরণ বর্ণনায় ফ্রয়েড আরও তিন ধরণের অভিধা ব্যবহার করেছেন যেগুলো হলো ‘লিবিডিন্যাল এনার্জি’, ‘এরোস’, এবং ‘এরোস প্লাস’। বর্তমানে ফ্রয়েডিও এসব থিউরির ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা থাকলেও ডারউইনের বিবর্তনবাদের ‘বান্দর থিউরির’ মতোই ফ্রয়েডের এই থিউরি নিয়েও যথেষ্ঠ মতানৈক্য আছে।

Uxxntitled

এবার আরেকজনের কথায় আসি। তাঁর নাম জন লী। ১৯৭৬ সালে বহুসংখ্যক প্রেমিক-প্রেমিকার অংশগ্রহণে তাঁর পরিচালিত গবেষণা থেকে ছয় ধরণের প্রেমের সংজ্ঞা তৈরি করেছেন তিনি। এগুলো হলোঃ

  • Eros Love: এটি খুব উচ্চমানের রোমান্টিক প্রেম, যা প্রচণ্ড আবেগ, দৈহিক আকর্ষণ, এবং গভীর ঘনিষ্ঠতায় টইটুম্বুর।
  • Ludas Love: এটি হলো প্রেম-প্রেম খেলা, কিন্তু খুব সিরিয়াস ঘনিষ্ঠতা বা তীব্রতা এতে অনুপস্থিত। ইংরেজিতে একে গেইম প্লেইং লাভ বলা হয়।
  • Storge Love: প্রগাঢ় বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠা প্রেম। পারস্পরিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, এবং দুজনের বোঝাপড়া যথেষ্ঠ মাত্রায় বিদ্যমান, তবে শরীর-ঘনিষ্ঠতা খুব কম।
  • Pragma Love: এটি হলো storge এবং ludus love এর মিলিত রূপ। এটি এক ধরণের বাস্তবধর্মী ও যুক্তিনির্ভর প্রেম, যেখানে প্রেমিক/প্রেমিকার অন্তত একজনের এরকম হয় যে, সে মনে করে  ‘আমি এই রকম একটা ছেলেকে বা মেয়েকেই খুঁজছিলাম’।
  • Mania Love: Eros এবং ludus love এর মাখামাখিতে তৈরি হয় এই প্রেম। একে সমস্যাক্রান্ত প্রেমও বলা হয়। এতে তীব্রতা এবং ঘনিষ্ঠতা এতো বেশি হয় যে এই প্রেমে ঈর্ষা ও অতি নির্ভরশীলতা খুব স্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকে। ‘ও সব সময় আমার সাথেই থাকবে, অন্য কাজের চেয়ে আমি সবসময় গুরুত্ব পাবো, এমনকি অন্য ছেলের (বা মেয়ের) দিকে ফিরেও তাকাবে না’- এরকম একটা মানসিকতা ক্রিয়াশীল থাকে প্রেমিক/ প্রেমিকার মনে। সবসময় একটা ভীতি কাজ করে, ‘এই বুঝি অন্য কেউ ওর প্রেমে পড়ে গেলো’। এসব নিয়ে দুজনের মাঝে মান-অভিমান, ঝগড়া-ঝাঁটি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
  • Agape Love: এটা কে হাজী মুহসিন প্রেম বলা যায়। eros আর storge- এই দুয়ে মিলে এই প্রেম তৈরি হয়। কোনোকিছুর আশা না করেই শুধু দেবার মাঝে আনন্দ পায় প্রেমিক/প্রেমিকা। একে অন্যের জন্য ত্যাগ করতে সদা প্রস্তুত থাকে। মানে ত্যাগে ত্যাগান্বিত অবস্থা। নেয়ার চেয়ে দেয়াতে তৃপ্তি বেশী। অনেকেই এই প্রেমকে খাঁটি প্রেম বলে থাকেন। বলে তো থাকেন, কিন্তু কয়জন করে থাকেন—এটা দেখার বিষয় বটে।

তবে ব্যক্তিগতভাবে রবার্ট জেফারি স্টের্নবার্গ-এর বিশ্লেষণ আমার খুব পছন্দের। বর্তমানে Cornell University-তে কর্মরত ৬৫ বছর বয়ষ্ক এই মার্কিন মনোবিজ্ঞানী তিনটি উপাদানের ভিত্তিতে প্রেমের স্বরূপ নির্ণয় করেছেন। উপাদানগুলো হলো: Intimacy(ঘনিষ্ঠতা),Passion(আবেগ), Commitment/Decision(দায়িত্ব/সিদ্ধান্ত)।এসব উপাদানের কোনটি কী পরিমান আছে, তার উপর তিত্তি করে তিনি আট ধরণের প্রেমের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন, যা স্টের্নবার্গের triangular theory of love নামে পরিচিত। নিচে এগুলো সংক্ষেপে আলোচিত হলো।

  • Nonlove(অপ্রেম)– এ ধরণের প্রেমে উপর্যুক্ত উপাদানগুলোর কোনটিই থাকেনা। ব্যক্তির সাথে সাধারণ পরিচয়, কুশলাদি জিজ্ঞেস করার মধ্যেই এই সম্পর্ক সীমাবদ্ধ থাকে।
  • Liking/friendship(ভালোলাগা/বন্ধুত্ব) পারস্পরিক নৈকট্য, বন্ধনবোধ আর উষ্ণতার অনুভূতি সবসময় ক্রিয়াশীল থাকে। এ ধরণের প্রেমে আবেগ এবং দীর্ঘমেয়াদী কমিটমেন্টথাকেনা।Untitledytttr
  • Infatuated love(আবেগ সর্বস্ব প্রেম)intimacy এবং decision/commitment তেমন নেই কিন্তু প্রচণ্ড আবেগিক (passionate) স্ফূরণ লক্ষণীয়। প্রায়ই রোমান্টিক প্রেমের সূচনা হয় এ ধরণের প্রেম দিয়ে। তবে ঘনিষ্ঠতা ও দায়িত্ববোধের অনুপস্থিতে এ ধরণের ভালোবাসা হুট করে নাই হয়ে যেতে পারে।
  • Empty love(শূণ্য প্রেম) শুধু commitment আছে কিন্তু intimacy বা  passion অনুপস্থিত এই প্রেমে। গভীর কোনো প্রেম যদি হ্রাস পেতে থাকে তবে এক পর্যায়ে তা শূণ্য প্রেমে পরিণত হয়। সাধারণত এ্যরেঞ্জ্‌ড ম্যারিজ-এর ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর প্রেম শুরু হয় শূণ্য প্রেম দিয়ে এবং পরবর্তীতে ভিন্ন পর্যায়ে উন্নীত হয়।
  • Romantic love(রোমান্টিক প্রেম)  উচ্চমাত্রার ঘনিষ্ঠতা এবং আবেগের সমন্বয়ে রোমান্টিক প্রেম সৃষ্টি হয় আর এর ফলে পাত্র-পাত্রী শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও পরস্পরের প্রতি ভীষণ অনুরক্ত হয়। তবে এই প্রেমে স্থায়ী/দীর্ঘমেয়াদী কমিটম্যান্ট খুব একটা থাকেনা।
  • Companionate love(গভীর বন্ধুপ্রেম) এ ধরণের প্রেমে ঘনিষ্ঠতা এবং দীর্ঘমেয়াদী কমিটম্যান্ট যথেষ্ঠ থাকে, যদিও আবেগের উপস্থিতি থাকেনা বললেই চলে। বৈবাহিক সম্পর্ক অনেক বছর ধরে চলতে থাকলে অনেকেরই এরকম হয়ে থাকে।
  • Fatuous love(নির্বোধ প্রেম)  এক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে হুট করেই প্রেমে পড়ে যায়, বা প্রেমে পড়েই বিয়ে করে ফেলে। এ ধরণের ভালোবাসায় আবেগের মাত্রার উপর ভিত্তি করে কিছুটা দায়িত্ববোধ বা কমিটম্যান্ট থাকে বটে, তবে ঘনিষ্ঠতার উপস্থিতি সুস্থির থাকেনা। মূলত এটি  Infatuated love –এর মতোই একটি অতি আবেগতাড়িত ভালোবাসা।
  • Consummate love(নিখুঁত প্রেম) পরিপূর্ণ, আদর্শ প্রেম। Intimacy, passion আর Commitment/Decision-এই kabirsskabir_1336012460_1-1তিনের সমানুপাতিক/সমসত্ব মিশ্রণ হলো consummate love। মানুষ মূলত এটিই কামনা করে। আদর্শ দম্পতির মাঝে এ ধরণের প্রেম বিদ্যমান থাকে। স্টের্নবার্গের মতে, যে যুগল ১৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে একত্রে বাস করছেন ও প্রাণবন্ত যৌনতা উপভোগ করে চলছেন, এবং পরস্পর ভিন্ন অন্য কারও সাথে বেশি সুখী হতে পারতেন বা পারবেন-এরকমটি কখনও মনে করেননি তারা এই ‘নিখুঁত’ প্রেমের প্রেমিক যুগল। পারিবারিক, ব্যক্তিক কোনো সমস্যা হলে তারা দুজনে মিলে সমাধান করে নিতে পারেন। মতের ভিন্নতাকে শ্রদ্ধা করেন এবং ভিন্নমতকে সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে দেননা। তবে স্টের্নবার্গ যে বিষয়ে সতর্ক করেছেন তা হলো, এই ক্যাটাগরির প্রেম অর্জনের চেয়ে ধরে রাখা বেশি কঠিন। অর্থাৎ এই দুজনের মধ্যে consummate love  আছে মানে চিরকাল থাকবে— তা নয়। যদি প্যাশন তথা আবেগ কমতে থাকে তাহলে companionate love ক্রমান্বয়ে companionate love-এ রূপ নিতে পারে।

শেষ কথা হলো, এইসব রকম সকমকে নির্ভূল বা অবিতর্কিত মনে করা ঠিক হবেনা। দুদিন পরেই সংজ্ঞা বদলাবে। জীবন হয়তো বদলাবেনা। আর কোনো সংজ্ঞার মাত্রায় জীবনের ব্যাখ্যা খুঁজতে যাওয়ার উষ্কানি দেয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। প্রেমের ধরণ যেমনই হোক, শান্তিতে থাকাটাই হলো সবচেয়ে বেশি আরাধ্য। পৃথিবীর সকল অপ্রেমিক, প্রেমিক, প্রেমিকা, দম্পতি ও হবু দম্পতিকে স্রষ্টা যেনো শান্তিতে রাখেন। সামগ্রিক শান্তিবিধানে প্রেমের বিকল্প আর কী হতে পারে?