ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

 

file

বিখ্যাত এক শিল্পী এলেন। গুণী শিল্পী। আমরা উস্তাদ বলে মানি তাঁকে। একক সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন চলছে। মঞ্চের আলোয় সন্ধ্যার মায়া। দর্শক সারিতে ঠাঁই নেই। অনেকেই দূর থেকে দেখছেন দাঁড়িয়েই। তবু কোন রা নেই কারো মুখে। সবাই মুগ্ধ, বিস্ময়ে হা। এমন বাঁশি কী করে বাজান তিনি! বাজানোর ফাঁকে তিনি কথা বলছেন। বিনীত বাক্যচয়নে চলে আসছে নানা প্রসঙ্গ।  কখনও রাগ পরিচিতি। কখনও শৈশব স্মৃতি। এমনি কথার এক পর্যায়ে সাম্প্রতিক সঙ্গীত চর্চা নিয়ে তাঁর মনোভাব আমাকে সহসাই দূরে ঠেলে দিলো। আহত করলো। মনোভাবটা কী? উদাহরণস্বরূপ, রক মিউজিক নিয়ে তাঁর মন্তব্য ছিলো এরকম— “গানের নাম দিসে রক। রক মানে যতদূর জানি পাথর। বা শিলা। এই শিলা আর পাথর দিয়া ঢিলাঢিলি করা যায়, কিন্তু গান কিভাবে হয় আমার মাথায় ধরেনা। আমাদের দেশ সবুজের দেশ, কৃষকের দেশ। এখানে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি চর্চা করে তরুণরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এটাই তো আশা ছিলো। কিন্তু গানের নামে এই সব উন্মত্ত চিল্লাচিল্লি করে শিল্পের সর্বনাশ ছাড়া আর কী হচ্ছে?…।”

আরেকজন গুণী লেখকের লেখা পড়লাম দৈনিকের সাপ্তাহিক সাপ্লিম্যান্টারিতে। তাঁর কথায় তরুণ প্রজন্ম বিশেষত ষোলোত্তীর্ণ ছেলেমেয়েদের কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, কানে লাগানো তার আর রাস্তায় চলতে চলতে মাথা দোলানো, চুলের বিরূপ কাটিং ইত্যাদি প্রসঙ্গ এমন একপেশে হয়ে এসেছে –যা দেখে সহজেই মনে হবে, হয় তিনি এই প্রজন্মের শত্রু নয়তো এরা তাঁর। প্রজন্ম নিয়ে তাঁর এতো হায়-হায় আর ডিপ্রেশন আসলে এক ধরণের কমন ক্রোধের পোষাকী প্রকাশ, যা দূরত্বকে সংক্রমিত করে দুই দিকেই।

ওরকম বিদগ্ধ কোনো বিজ্ঞ বয়োজ্যষ্ঠকে এই লেখার চেহারা দেখে ভ্রু কুঁচকাতে দেখলে আমি অবাক হবোনা। বাংলা ইংরেজির এরকম মিশেল দেখে তাদের মনে হবে ভাষার ভাড়ারে শকুন লেগেছে। ভাষা বুঝি এই ভেসে গেলো। অথচ এসবকে স্বাভাবিক মেনে নিয়ে বাংলা শেখানোর প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনে আরও প্র্যাগম্যাটিক এপ্রোচ ইনিশিয়েট করার কথা তাঁরা বলবেননা। কোনও উদ্যোগও নেবেননা। অথচ গেলো গেলো জপসব ননস্টপ।

কিন্তু একেবারেই যে বলেননা কেউ –ব্যাপারটা তেমন নয়। যেমন ফেইসবুকে শুবাচ (শুদ্ধ বানান চর্চা) নামে একটা পেইজ আছে। স্যোশাল সাইটে বাংলা শেখার বিরাট এক জায়গা বলে মনে হয় আমার কাছে।  বড় বড় বিদগ্ধ ক’জন পণ্ডিত ওতে কন্ট্রিবিউট করে যাচ্ছেন। অনেক শিখেছি, শিখছি ওখান থেকে। তবে ওই চরমপন্থি বিশুদ্ধবাদের ভূতের ছোঁয়াচ থেকে তাঁরাও দূরে নন। যেমন একদিন এক পোস্টে বললাম, শুদ্ধ বাংলা বলাটা যেমন জরুরী, তেমনি বাংলার সাথে ইংরেজি যেসব শব্দ প্রায়ই বলা হচ্ছে কিন্তু চেয়ার, টেবিল, রোমান্টিক শব্দের মতো আত্নীকরণ হয়নি, সেগুলোকে শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করাটাও জরুরী। উদাহরণ দিয়ে বললাম ‘ইনভাইটেশন’ ‘ডেস্ট্র্যাকশন’, ‘ছুগার’ ইত্যাদি শব্দের এমন ভয়াবহ বিকৃত উচ্চারণ বন্ধ করে ‘ইনভিটেশন’ ‘ডিস্ট্রাকশন’, ‘শুগার’ বলা উচিৎ। এরপর শুরু হলো বিজ্ঞজনের মন্তব্য। একজন বললেন, তাহলে তো আনারস-এর আদি শব্দ ‘আনানাস’ বলতে হয়। আরেকজন বললেন, এটা বাংলা ভাষা চর্চার স্থান ইংরেজি নয়। ডগমা’র দেমাগ বেশ টের পেয়ে আমি অবাক হতে পারিনি কেনো, তা ভেবে হতবাক হয়েছি সেদিন।

একটা প্রশ্ন…না, বরং এটাকে আশঙ্কা বলাই শ্রেয়। অনেকদিন আগে থেকেই অস্থির এই আশঙ্কাটা অহেতুক আহত করে চলছে। আর সেটা হলো, আমাদের গুরুজনদের বেশিরভাগই কি তাদের ঔদার্য স্বল্পতাকে স্বকীয়তা বা শুদ্ধতার থকথকানি দিয়ে ফিলোসফাইজ করতে পছন্দ করেন? মানে তাঁরা যা পারেন করেন এবং করেছেন, সেটাই প্রতিশ্রুত এবং টাইমলেস, এরপর অন্য কোন ধরণ বা চলন কাম্য নয়—এই রকমের একটা ডগম্যাটিক আইডিয়্যলজিতে অনেকেই এমন বুঁদ হয়ে থাকেন, তখন তাদের শিল্প সাধনার, অর্জনের জ্যোতি ম্লান হয়ে যায়। মনে হয় বিনয়ের মোড়কে তাদের উচ্চারণে তারুণ্যের প্রতি এক ধরণের উষ্মা, বিতৃষ্ণা আর তাদের নিজেদের কষ্টার্জিত অর্জন আর আকর্ষণীয় পারফর্ম্যান্সের মার্জিত নিবেদনের আবডালে ফোঁড়ার আদলে ফুটে উঠা অহমের অসুন্দরকে ডিলিট করা আর পরিবেশ দূষণ মোকাবেলা এক কথা। দূষণ যেমন থেমে নেই, তাঁদের ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করে দেয়া ইনসুলারিটিরও বিলোপ নেই।

তবে প্রশ্ন তো থেকেই যাচ্ছে একটাঃ

বড়দের যদি হয় ভিমরতি

তবে ছোটদের হলে ক্ষতি কী?