ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

অবজ্ঞার সুফল

কতো পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। দেখাই যায়না। কিন্তু কাকের কমতি নেই। কি শহর কি গ্রাম। পাখি কাক কখনোই মানুষের প্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। মানুষের ঘরের কাছে কাক ডাকলে ভয়। যাত্রাকালে কাক দেখলে ভয়। কাক মরলে ভয়। আবার কাকের বেঁচে থাকাতেও ভয়। জীবাণুর ভয়। মানুষের কাছে কোকিলের কু-কু সু-কাজ বলে চিহ্নিত হলেও kaakকাকের কা-কা যেনো এক ভয়ানক কু-কাজ। মানুষের এমন অবজ্ঞার শিকার কাকের পাশে সমব্যথী বলতে শেষ পর্যন্ত পেঁচা ছাড়া আর কেউ নেই। তবে নিজেদের উপর আরোপিত কলঙ্কের কালি যদি কাকেরা গায়ে মাখতো, তাতে কাক সম্প্রদায়ের বিরাট কোনো রঙ বিকৃতি ঘটতো বলে মনে হয়না। কারণ ওরাতো এমনিতেই বেশ কালো। আবার কাকেদের যদি বোধশক্তি আরও উন্নত হতো তবে ওরা নিশ্চয়ই খুব অবাক হতো এটা ভেবে যে, মানুষ একদিকে মা??????????নুষের মাংস খায়, আবার ওদিকে কাক কাকের মাংস খায় কি না খায় তা নিয়ে মাথা ঘামায় আবার তার সার্টিফিকেটও দেয়। তবে বলতেই হবে, কাক খুব ভাগ্যবান পাখি কারণ কাকের প্রতি আমাদের ছুঁড়ে দেয়া তাচ্ছিল্য আর উচ্ছিষ্ঠই কাককে বিলুপ্তপ্রায় পাখি হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। মানুষের অতি আদর পাওয়া সব পাখি শেষ পর্যন্ত মানুষেরই নিষ্ঠুরতায় মারা যায়। মরতে মরতে এক সময় বিলুপ্ত হয়। কাকের স্বর যদি মিঠা হতো, মাংস যদি খাওয়া হতো, কিংবা হামদর্দের মত বড় বড় সব কোব্রেজি প্রতিষ্ঠান যদি চড়ুই পাখির মস্তক বাদ দিয়ে কাকের মস্তক দিয়ে ওষুধ বানানো শুরু করতো—তবে পাখিপ্রেমীর শখের খাঁচায় আর মাংসলোভীর পেটে যেতে যেতে, এবং জটিল রোগের দাওয়াই হতে হতে কাকের বংশ নির্মূল হতে খুব বেশিদিন লাগতোনা। বেশ বেঁচে গেছে বেচারা কাক।

বাংলাভাষায় কাক

কাকের ক’য়ের এলিটারেশনটা (অনুপ্রাস) বেশ জানা আছে সবার। ওটাকে দেশীয় কায়দায় সাজিয়েছে একজন এমন করেঃ কারমাইকেল কলেজের কোণায় কতোগুলি কাক কা-কা করিতেছিলো। কমলা কান্তের কনিষ্ঠ কন্যা কাকলী কাকাকে কহিল, ‘কাকা, কাক কেনো কা-কা করে?’ কাকা কহিলেন, কা-কা করাই কাকের কর্ম।” আবার কাকভোর, কাকচক্ষু, কাকতালীয়, কাকভুষুণ্ডি, তীর্থের কাক, কাকের ঠ্যাং ইত্যাদি বাগধারা বা উপমার ব্যবহারও বাংলা সাহিত্যে বেশ চোখে পড়ে। আমাদের বাংলা ডায়ালেক্টে কাকের সরব উপস্থিতির দুটো উদাহরণঃ  ‘দিনদিন তোমার চেহারাতো কাউয়ার লাহান অইয়্যা যাইতাছে’, ‘মাথাটাতো কাউয়্যার বাসা বানিয়ে ফেল্‌ছো মিয়া, চুল কাটাওনা কেরে?’

অহেতুক অপবাদ

কাক নিয়ে কথকতার নানা আয়োজনে কাকের উপর চাপানো হয়েছে নানা অপবাদ। বাংলাদেশে তো বটেই য়্যুরোপ-??????????আমেরিকার অনেক দেশেও কাককে অশুভ প্রাণি হিসেবে গণ্যকরা হয়। কাকের ডাকের সাথে নাকি আজরাইল ফেরেস্তার আগমনের সম্পর্ক আছে, যদিও এসব কুসংস্কার বৈ কিছু নয়। আরেকটা খুব কমন ধারণা হলো কাক কুশ্রী পাখি। এই পাখি গান গাইতে পারেনা কোকিলের মতো। প্রশ্ন হলো, কালো মানে কি অসুন্দর? তাহলে কোকিল কিভাবে সুন্দর পাখি হয়? গায়ের রঙে তো কোনো ফারাকHouse_Crow_eggs_I_IMG_1890 নেই। আর কু-কু করা মানে গান গাওয়া—এইটা কিরকম কথা? ভালো করে দেখুন, কাকও একটি অতি সুন্দর পাখি। আর এর গায়ের কালো রঙে একটা নীলচে আভা আছে, যা এর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া কাক হলো একমাত্র বাংলাভাষী প্রাণি। কা-কা কর্কশ হতে পারে বাট এটি খাঁটি বাংলা শব্দ, যা কাক অনায়াসে উচ্চারণ করে। কুকু’র চেয়ে কাকা ভালো। কথায় বলে, এমন কি গানেও আছে, গাছে বেল পাকিলে তাতে কাকের কী— মানে হলো কাক বেল খায়না। ফাটা বেল না হলে খাবে কি করে? কাকের তো কাঠঠোকরার স্বভাব নেই। সত্যি কথা হলো, বেল কাকেদের বেশ প্রিয়। পাকা বেল ফেটে গেলে, আর তা সুযোগমতো পেলে এরা খুব মজা করে খায়।

জীবন যাপন

কাক খুব যূথচারী, পরিশ্রমী পাখি। ছেলে কাক আর মেয়ে কাক দুজন মিলে যত্ন করে বাসা বানায়। নিজের এবং কোকিলের এতিম বাচ্চাদেরকে যত্ন করে পালন করে। অথচ কোকিল কাকের খালি বাসা পাওয়ার তালে থাকে আর ডিম ঢেলে দিয়ে পালিয়ে যায়; কোনোদিন সন্তানের খোঁজ নিতে পর্যন্ত আসেনা—যদিও ব্যতিক্রমী স্বভাবের প্রজাতিও আছে এদের। কাক-দম্পতিরা পরস্পরের খুব বিস্বস্ত হয়। জীবনভর একসাথে থাকে।

সর্বসাম্প্রতিক তথ্য

ক্যাম্বৃজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ক্রিস্টোফার বার্ড-এর নেতৃত্বে কাকের উপর পরিচালিত এক গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে, যা ঈশপের ‘কাক ও কলসি’ গল্পের নায়ক কাকের বুদ্ধিমত্তার যে বর্ণনা আছে তার সাথে শতভাগ মিলে যায়। প্রফসর বার্ড-এর  মতে, কাক বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে বনমানুষ তথা APES-এর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। (তথ্যসূত্রঃ Current Biology, Volume 19, Issue 17, Page 731, Taylor Alex; Gray Russell. ‘Animal Cognition: Aesop’s Fable Flies from Fiction to Fact’)

শেষ কথা

কাকের কা-কা’তে ক্লান্ত হইলে তাহকে কর্কশ কহিলে সমস্যা নাই। তাই বলিয়া আপনার শুভ-অশুভ’র সাথে তাকে যুক্ত করা উচিৎ বোধ হয়না। ইহা ভীষণ অন্যায়। নিজের সঙ্গীতের চাহিদা পাখির দ্বারা পূর্ণ করার বিলাস মানুষের শোভা পায়না। কাককে গাইতে দিন। দূষণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভীতিজীবি না হয়েও বলা যায়, ক’দিন পরে কাকই হবে এদেশের একমাত্র সরব পাখি। তারও কিছুদিন পরে ছড়া/কবিতাতেও হয়তো দেখা যাবে নতুন কোনো লাইনঃ খাঁখাঁ আকাশ বড্ড ফাঁকা… কতোদিন কাক দেখিনা… আহা! কি মধুর সুর কা-কা