ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

p114

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়াদেরকে ভ্যাট দিতে হবেনা—এই সংবাদে আনন্দ পেয়েছি। সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খরচের আরও বড়ো বোঝা থেকে বাঁচিয়েছেন আমাদেরকে। তবে একটা শ্লোগান বরাবরই শুনে আসছি; অনেকবার মুখে বলেওছি; কিন্তু মানতে গিয়ে খটকা লেগেছে। শ্লোগানটি হলোঃ ‘শিক্ষা কোনো পণ্য নয়’। আচ্ছা,যা দিয়ে বাণিজ্য হয়, যাকে কেনা ও বেচা যায়—পণ্য যদি তা-ই হয়, তবে শিক্ষা কেনো পণ্য নয় –তা বুঝিনা। শিক্ষাকে পণ্য বলতে লজ্জা লাগে—এই জন্যই কি পণ্য বলবোনা? না কি এই জন্য যে, সক্রেটিস শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ পছন্দ করতেননা?

একটি প্রাইভেট স্কুল, কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটি কতোটা ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি দিতে পারে উদ্যোক্তাদের–এটা আমাদের অজানা নয়। সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাতে ডোনেসনের নামে কতো গুণতে হয় বাবা-মাকে– তাও আমরা জানি। কোচিং সেন্টারে, শিক্ষকের বাসায়, স্কুলে, কলেজে, বইয়ের দোকানে  শিক্ষা ও শিক্ষা-উপকরণ বিক্রি হবে, শিক্ষক নিয়োগে অর্থের বিনিয়োগ হবে –শিক্ষার বিক্রেতা থাকবে, ক্রেতা থাকবে, মিড্‌লম্যান থাকবে, লাভের ভাগাভাগি হবে; কিন্তু শিক্ষাকে পণ্য বলা যাবেনা –বিষয়টা কেমন লাগে?

শিক্ষার এ্যকাডেমিক চর্চার গোড়াপত্তন যেখানে, সেই গ্রিসেই শিক্ষার প্রথম পণ্যায়ন হয়েছিলো সোফিস্টদের হাতে। সোফিস্টরা ছিলেন সেইসব জ্ঞানীজন যারা মোটা অংকের অর্থের বিনিমিয়ে এলিটদের ও তাদের সন্তানদেরকে পড়াতেন নানান বিষয়ঃ বাগ্মিতা, বিতর্ক, দর্শন, বিজ্ঞান। সোফিস্টরা শেখাতেন কিভাবে যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে হারাতে হয়, কিভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়। কৌশলী বাক্যের ব্যবহার দিয়ে মুগ্ধতা তৈরির এক অপূর্ব দক্ষতা ছিলো এসব সোফিস্টদের। কোনো বিষয়ে জ্ঞান যতটুকুই থাকুক সেটুকুকে পূঁজি করেই শব্দের বিচ্ছুরণ দিয়ে, কতিপয় আপাত চমৎকার যুক্তির ঘেরাটোপে শ্রোতাকে আবিষ্ট করার এক বিশেষ ক্ষমতা ছিলো সোফিস্টদের। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে, এথেন্স-এ যখন জ্ঞানের চর্চা তুমুলভাবে চলছিলো, তখন এঁরা বক্তৃতা, বিতর্কের মাধ্যমে নিজেদের পারফর্মেন্স দেখিয়ে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। সম্ভবত এঁরাই পৃথিবীর প্রথম সফল বুদ্ধিজীবি। তবে তখন নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এঁদের নাগাল পেতোনা। এঁরা ছিলেন উচ্চবিত্তের সেবক, যদিও এটা ঠিক যে, সক্রেটিস জ্ঞানের এরূপ চর্চা ও বিতরণ পছন্দ করতেননা। তাতে কী?

সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পণ্য হিসেবেই প্রসারিত হয়েছে। নবী-রাসুল, বা সক্রেটিসের মতো জ্ঞানী-গুণী দার্শনিক, শিক্ষকদের শিক্ষা মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে, ন্যায়বিচার ও শান্তিকে  প্রমোট করেছে–সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর এটাও সত্য যে,  সব সময়ই শিক্ষার সাথে আদর্শ, মূল্যবোধ, নৈতিকতার একটা সমগোত্রীয় অবস্থান আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য মনকে আলোকিত করা,  মানবিক, নৈতিক মূল্যবোধে মানুষকে সমৃদ্ধ করা, শুধু জীবিকার প্রয়োজন মেটানো নয়–এরকম কথা-বার্তা শুনেছি, পড়েছি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ব্যবহারিক জীবনে, কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় সে শিক্ষা বাস্তবে কতোটা আদৃত হয়েছে সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে যে সত্য আমাদের সামনে চলে আসে তা হলো, কালক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চৌহদ্দি থেকে সেই আদর্শিক আর নৈতিক বোধের দূরত্ব বেড়েছে। এবং সেটা আমাদের দেশের মতো এতো ভয়াবহ পর্যায়ে আর কোথাও থাকলেও থাকতে পারে। এখন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন যে, রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হবে, ছাত্র-ছাত্রী ভর্তিতে অবৈধ বাণিজ্য হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান অনিয়ম করবেন, প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ করবেন, টাকা দিয়ে সার্টিফিকেইট পাওয়া যাবে, বেসরকারিকরণের মাধ্যমে শিক্ষার বাণিজ্যকে প্রসারিত করা হবে, শিক্ষককে সেল্‌স পারসন বানিয়ে গ্রাহক সেবার ট্রেইনিং দেয়া হবে— এসবে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু শিক্ষাকে পণ্য বলতে যতো লইজ্জা!

শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে বিবেচনায় রেখেও একে দুর্নীতি, অনিয়ম, আর অবৈধ বাণিজ্যের শিকার হওয়া থেকে বাঁচানো যেতো কি যেতোনা সেটা নিয়ে ভাবা যাবে।  ভবিষ্যতে বাঁচানো যাবে কিনা সেটাও দেখা যাবে। আগে আসুন লজ্জা ভাঙি।

https://www.facebook.com/kazishahidshawkat