ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

“যদি কাউকে আঘাত করতেই হয়, তা এমন তীব্র করা উচিত যাতে তার প্রতিশোধপরায়নতাকে আর ভয় পেতে না হয়। “

” মানুষকে হয় আদর করা উচিত, নয়তো পিষে মারা উচিত। ছোটখাটো আঘাত করলে পরিশোধ নেবার সুযোগ নেবে, কিন্তু যদি তাকে সম্পূর্ণ অচল করে দেন তাহলে তাদের আর কিছুই করার থাকে না।”

“ধার্মিকতা দেখানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই।” 

“যুদ্ধ, এর আকার আর উপাদান ছাড়া একজন রাষ্ট্রনায়কের আর কোন বস্তু বা চিন্তা থাকা উচিত নয়। একজন শাসকের জন্য এটিই উপযুক্ত শিল্পকলা।”

–এগুলোর তাঁরই উক্তি। তিনি ছিলেন একাধারে রাজনীতিক, কূটনীতিক, দার্শনিক, লেখক। ৩ মে তাঁর জন্মদিন। গত ২১ জুন ছিলো তাঁর ৫৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তাঁর দর্শন বিভিন্ন ফর্মে যথেষ্ট দরদের সাথে চালু আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, তাঁকে কেউ ওভাবে স্মরণ করেনি কখনও। নিজের মাতৃভূমি, ইটালির ফ্লোরেন্স-এ তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন যেমন কেটেছে, তেমনি সেখানেই ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কারাবন্ধী হয়ে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে নির্মম শাস্তি। ইতিহাসে তাঁর সুনামের চেয়ে দুর্নামই বেশি রটেছে।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিলো নৈতিকতা বর্জিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতা অর্জন এবং এতে টিকে থাকবার জন্য জনগণ কিংবা বহিঃশত্রুর সাথে যেকোনো ধরণের কূট-কৌশল বা প্রতারণা গ্রহণ করতে পিছপা হওয়া চলবেনা। ক্ষমতায় টিকে থাকাই আসল কথা; সেটা যে করেই হোক। এসব থিউরি’র কারণে তাঁকে ‘ছদ্মবেশী শয়তান’ আখ্যা দিয়েছেন অনেকে। আবার অনেকেই তাঁকে আধুনিক(!) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক মনে করেন। যে যাই-ই ভাবুক, তাঁর থিউরি তো দেদারছে চলছে দেশে দেশে –অথচ কী আশ্চর্য, তাঁর নামে কোনো মোমবাতি, ফুল, কেক কিচ্ছু নেই! হ্যাঁ, ম্যাকিয়াভ্যালি’র কথাই বলছি।

এটি তো খুবই স্পষ্ট যে, মানুষের সামষ্টিক কল্যাণের যতো ব্যবস্থাপত্র পৃথিবীতে বিদ্যমান আছে, সেটা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র কিংবা অন্য যেকোনো নামে হোক, কোনোটিই মানুষের সামগ্রিক শান্তি আনতে পারেনি। কোনো বিশেষ ব্যক্তির প্রভাবে কোনো কোনো অঞ্চলে শান্তির প্রক্রিয়া চালু হয়েছিলো, পরে ব্যক্তির অন্তর্ধানে সেই শান্তির ধারাও থেমে গেছে—এরকম সাময়িক সময়ের বহু উদাহরণ ইতিহাসে আছে—যেগুলো এখনো বিভিন্ন ধর্ম ও মতাদর্শের অনুসারিদের কাছে স্বর্ণ যুগ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামিক শাসনতন্ত্র, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এখনও চলছে  পৃথিবীর নানান ভূখণ্ডে। আর এসব তন্ত্রের নামে খালি পুরনো দিনের গল্প। কবে কার দলের কে কী করেছে, কোন্‌ যুদ্ধে বিজয় অর্জন হয়েছে ইত্যাদি সব জাবর কাটা। কাজে কর্মে বর্তমানে ঠনঠন যে, তার অতীত ছাড়া শান্তির আশ্রয় আর কোথায় আছে?  অথচ মানব কল্যাণের আদর্শিক যে ভিত্তির উপর এসব মতবাদ প্রেসক্রিপশনে (ধর্ম গ্রন্থ, সংবিধান) সাজানো আছে, পরবর্তিতে সেই জায়গায় এগুলো আর থাকেনি। এসবের নামের ঐতিহ্যে ভর করে যাচ্ছেতাই করে গেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রভূরা। সংবিধানকে তাঁরাই নিজেরা লঙ্ঘন করেছেন, নিজেদের সুবিধামত পালটে নিয়েছেন এবং এর ফলে বরাবরই শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে, অবলুপ্ত হয়েছে—আর প্রতারনা, যুদ্ধ এবং মৃত্যুর ভেতর দিয়ে মুষ্টিমেয় ক্ষমতালিপ্সূদের গোষ্ঠী-স্বার্থ রক্ষা হয়েছে শুধু। এই ধারা এখনও চলছে। এখন নাকি সরকারের চেয়ে কর্পোরেশন ভালো চলে; ছলে-বলে-কৌশলে। আহা! গণতন্ত্র কী অপরূপ রূপান্তরে শাসন করে, শোষণ করে, তোমারে আমারে!

যাই হোক, কথা বলছিলাম ম্যাকিয়াভেলি সাহেবকে নিয়ে। ম্যাকিয়াভ্যালির ফিলোসফি যে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অলঙ্কৃত করেছে বছরের পর বছর ধরে—সে দেশে তাঁর জন্মদিনে কেক কাটা নেই। তাঁর মৃত্যুদিবসে শোক সভা নেই। কোথাও কোনো দেয়ালে-টেয়ালে তাঁর একটা ম্যুরালও নেই। তাঁকে নিয়ে কোনো টক শো নেই, নিউজ নেই, নেই ক্রোড়পত্র—এটা কেমন কথা?

 

https://www.facebook.com/kazishahidshawkat