ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

খবরটি এখন আর কারও অজানা নয়। টেক্সাসের ডালাস কাউন্টি’র আরভিং শহরের ম্যাক আর্থার হাইস্কুলের ছাত্র  আহমেদ মুহাম্মদ শখ করে একটি ডিজিটাল ঘড়ি বানিয়েছিলো। ঘড়িটি সাধারণ সাইজের তুলনায় বেশ বড়ো ছিলো। ধাতব বাক্স, ডিজিটাল ডিসপ্লে, সার্কিট বোর্ড, বিভিন্ন রকম তার, স্ক্রু এবং অন্যান্য ইলেক্ট্রিক্যাল উপাদানের সমন্বয়ে সে ঘড়িটি তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলো তার স্কুলে। তার এই আবিষ্কারটি সে তার ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষককে দেখাতে চেয়েছিলো। দেখিয়েওছিলো। ওই শিক্ষক বলেছেন এটা ভালো হয়েছে তবে তিনি ঘড়িটি অন্য কোনো শিক্ষককে দেখাতে নিষেধ করেছিলেন। কেনো নিষেধ করেছিলেন তিনি? সেটি আমরা জানিনা।

AAAAA

তবে বিপত্তি ঘটে ইংরেজি ক্লাসে, যখন ব্যাগের ভেতর রাখা আহমেদের ঘড়িটির এ্যলার্ম বেজে উঠে। ক্লাসের শিক্ষিকা দেখতে চাইলেন কী সেটা। দেখে তাঁর বোমা মনে হলো।  আহমেদ বললো বোমা নয়; এটা তার বানানো ঘড়ি। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করলেননা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো হলো। পুলিশ এলো। স্কুলের প্রিন্সিপাল আহমেদকে  ক্লাস থেকে ধরে স্কুলের অন্য একটি রুমে নিয়ে গেলেন। চার/পাঁচ জন পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে বসলেন। তাদের একজন আহমেদকে দেখেই বলে উঠলেন, “Yup. That’s who I thought it was.” (হ, মনে মনে যেইডা ভাবছিলাম এইডা তো সেইডাই)। আতঙ্কিত এই কিশোরকে নির্মম ইন্টারোগেশনের শিকার হতে হলো। দেড় ঘণ্টা ব্যাপী সেই ইন্টারোগেশনে পুলিশ চেষ্টা করে গেলো তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে প্রমাণ করার। তাকে  হাতকড়া পরানো হলো। ধরে নিয়ে যাওয়া হলো।  স্কুল থেকে তাকে বরখাস্ত করা হলো।

ঘড়িটি সত্যিই অদ্ভূত। তবে তার চেয়ে অদ্ভূত ব্যাপার হলো, স্কুল কর্তৃপক্ষ কিন্তু একটি বারের জন্যও আহমেদের বাবাকে ফোন করেনি। এমনকি আহমদ নিজেও পুলিশের কাছে আর্জি জানিয়েছিলো তার বাবার সাথে কথা বলার অনুমোতির জন্য। মেলেনি। আহমেদের বাবা, যিনি সুদান থেকে ওই দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিরিশ বছর আগে,  তার ছেলের কথিত বোমার কথা প্রথম জানতে পেলেন যখন পুলিশ তাকে ফোন করলো। কী অবাক কাণ্ড, শিশু অধিকারের ব্যাপারে যে দেশের সরকার এতো উচ্চকিত, সেখানেই স্কুলের শিক্ষকের কাছে শিশুর অধিকারের চেয়ে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা বড়ো হয়ে দেখা দিলো!

XXXXX

ঠিক একদিন পর ঘটনা মোড় নিলো অন্যদিকে। ততক্ষণে বিশ্বজুড়ে এই ক্ষুদে আবিষ্কারককে নিয়ে সব মিডিয়াতে তোলপাড়, প্রশংসার ফুলঝুড়ি। ওবামা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন হুয়াইট হাউসে। তিনি এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, “”Cool clock, Ahmed. Want to bring it to the White House? We should inspire more kids like you to like science. It’s what makes America great.” (চমৎকার ঘড়ি, আহমেদ। হুয়াইট হাউসে এটিকে আনবে কি? তোমার মতো আরও অনেককে বিজ্ঞানে আগ্রহী করে তুলতে চাই। বিজ্ঞানই আমেরিকাকে সমৃদ্ধ করেছে।)   মার্ক জুকারবার্গ তার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “Ahmed, if you ever want to come by Facebook, I’d love to meet you. Keep building.” (আহমেদ, যদি কখনও ইচ্ছে হয়, ফেইসবুকের অফিসে ঘুরে যেও । আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। উদ্ভাবন চালিয়ে যাও।)   আহমেদের গায়ে ‘নাসা’র লোগো লাগানো টিশার্ট দেখে নাসার বিজ্ঞানীরাও তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

এই ঘটনায় মার্কিন মুলুকের এন্টি-ইসলামিক মনোভাবের আরেকটি নগ্ন প্রকাশ বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হলো। পুলিশ বলেছে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পেয়েই তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। স্কুলের শিক্ষকরা বলছেন তাঁরা ওটাকে বোমা মনে করে পুলিশকে জানিয়েছিলেন। ভালো কথা। কিন্তু ওই ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষক তো জানতেন এটা কী এবং কেনো এটিকে আহমেদ বাড়ি থেকে এনেছিলো। তিনি কেনো স্কুল কর্তৃপক্ষকে বা পুলিশকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেননা? কেনোই বা করবেন, ওই ব্যাটা ইমিগ্র্যান্টের পোলা যে, তার উপর আবার মুচলমান যে!

আহমেদের বাবার কাছ থেকে জানা গেছে, অনেকবারই সে তার বাবার কম্পিউটার, মোবাইল, কিংবা গাড়ির কোনো সমস্যা হলে নিজেই সারিয়ে দিয়েছে। এছাড়া, সে ওখানকার middle school robotics club-এর সদস্য। তার আবিষ্কারের জন্য পুরস্কারও জিতেছে সে। এসব কি তার বন্ধুরা জানতোনা? তার স্যারেরা জানতেননা? ইমিগ্র্যান্ট ফোবিয়া কিংবা ইসলামোফোবিয়া যা-ই হোক না কেনো, মার্কিন শিক্ষিত সমাজের ব্যাপক একটা অংশ যে অন্ধ সেটার বড়ো প্রমাণ আর কী হতে পারে?

আর ওবামা যখন এই শিশুর উপর জুলুম-নির্যাতনের জন্য শাস্তির নির্দেশ না দিয়ে শুধু ‘কুল ক্লক’ বলে আর হুয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়ে দায় সারেন, তখন ভালো লাগা ছাপিয়ে আরেকটি ‘কুল ক্যালকুলেশন’ চোখের সামনে চলে আসেঃ কতো মুসলমানে কতো ভোট—এটা তিনি ছাড়া আর কে ভালো জানেন?

ভিডিওঃ পুলিশের কাছ থেক মুক্তি পাওয়ার পর সাংবাদিক, শুভানুধ্যায়ীদের সাথে তার স্বপ্নের কথা শেয়ার করছে আহমেদ।

তবে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর সোস্যাল মিডিয়াগুলোতে মার্কিন নাগরিকদের অনেকেই যেভাবে পুলিসের এবং ওই স্কুলের  শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হীন দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছেন, তাতে মনে হয়না যে, সাম্প্রদায়িক ক্ষুদ্রতা থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছ দৃষ্টিতে ঘটনাকে অবলোকন করার চোখ ফুরিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমে।

https://www.facebook.com/kazishahidshawkat