ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

10_Eid-cattle_051014_0001

ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে দেখে আসছি, মাসিক, সাপ্তাহিক মিলিয়ে পাঁচ-ছয়টি ইসলামিক পত্রিকা রাখা হয় নিয়মিত। দৈনিক পত্রিকার চেয়ে ওগুলোর উপর জোর দিতেন বয়োজ্যষ্ঠরা। এছাড়াও, এক চাচা মসজিদের ইমাম হওয়ার সুবাদে, নামাজ-কালামের ট্রেইনিংটাও হয়েছে হাতে-কলমে। সে সময়, অর্থাৎ কৈশোরের প্রায় পুরোটা সময় নিজের এবং আশপাশের গ্রামগুলোতে যতো বাৎসরিক ওয়াজ মাহ্‌ফিল হতো তার বেশিরভাগেই আমার উপস্থিতি ছিলো। ইসলাম ধর্মের ঐতিহাসিক সব ঘটনাবলী, সগিরা-কবিরা গুনাহের ক্ষেত্রসমূহ, বেহেস্‌ত-দোজখ, হুর-গেলমান এবং বিবিধ মাস্‌লা-মাছায়েল আলোচিত হতো রাতব্যাপী। হাল্‌কায়ে জিকিরের সাথে খ্যাতনামা বক্তাদের সুরেলা কণ্ঠে এসব শুনতে মন্দ লাগতোনা। তবে এতো সুবিধা থাকা স্বত্ত্বেও নিজের ভেতর ইসলামি আকিদা সেরকমভাবে প্রবেশ করেনি। নিজে আমি মুসলমান বটে, তবে অনেকের মতোই ‘প্র্যাক্‌টিসিং মুসলিম’ অভিধা আমার বেলায় খাটেনা। ব্যর্থতা যা, তার দায় আমারই। তবে ধর্মের নামে ভণ্ডামি, ধর্মের বিরুদ্ধাচরণের মতো প্রকাশ্য শত্রুতার চেয়েও ভয়াবহ—এটি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। যাই হোক, বাংলাদেশি মুসলিম সমাজে ঘটে চলা কিছু অসঙ্গত বিষয় বরাবরই আমার মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে।

অসঙ্গতির অন্যান্য বিষয়ের অবতারণা পরে হবে। যেহেতু ঈদের আমেজ চলছে, তাই আজ কোরবানির প্রসঙ্গেই কথা বলবো। কোরবানির প্রচলন মুসলিম সমাজে কিভাবে এসেছে সেকথা আমরা সবাই জানি। মূল ব্যাপারটি যে আত্মত্যাগ—তা-ও কারও অজানা নয়। আমরা জানি, কোরবানির পশুর রক্ত বা মাংস কিছুই স্রষ্ঠার চাইনা। তাঁর কাছে গূরুত্বপূর্ণ হলো বান্দা’র মানসিকতা—আত্মত্যাগের মহিমায় জারিত মানসিকতা। অর্থাৎ নিজের হালাল অর্থে পশু কিনে কোরবানি দেয়াটা একটা প্রতকী ব্যাপার, এখানে মূখ্য হচ্ছে নিজের ভেতরের পশুত্ব বা হীনতাকে বিসর্জন দেবার সংকল্প; আর সেটাকেই কুরবানি নামক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে স্রষ্ঠার কাছে উপস্থাপন করা হয়।

পশু কোরবানি দেয়ার রেওয়াজ যে শুধু ইব্রাহিম (আঃ)-এর জামানা থেকেই শুরু হয়েছে, তা কিন্তু নয়। তবে এর পূর্বে কোরবানি পশুর মাংস ভক্ষণের রেওয়াজ ছিলোনা। যার পশু কোরবানি কবুল হতো, অর্থাৎ যার নিয়ত সহিহ্‌ হতো, তার জবাই করা কোরবানির পশুটিকে আকাশ থেকে আগুনের হল্কা এসে ভস্ম করে দিতো। কবুল না হলে পশুটি ওই অবস্থায় পড়ে থাকতো। কোরবানিকারি বুঝতে পারতেন যে, স্রষ্ঠা এটিকে গ্রহণ করেননি। তাই তিনি আবার কোরবানির জন্য মনস্থির করতেন। মাংস ভক্ষণ কিন্তু কোরবানির ইব্রাহিম পরবর্তি সংস্করণের অনুমোদিত রেওয়াজ, যখন কবুল হওয়া, না হওয়ার স্পষ্টতর দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো এভিড্যান্স-এর সুযোগটি আর থাকলোনা; মানে ওই আগুন এসে ঝলসে দেবার ব্যাপারটি আর নেই এখন।

কোরবানির জন্য কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে সেটিও কারও অজানা থাকার কথা নয়। সহজ কথায়, নিজের কুপ্রবৃত্তিকে বিনাশ করার সংকল্পে, নিজের হালাল উপার্জনের অর্থে সুস্থ্ পশুকে (গরু, ছাগল, দুম্বা, উট ইত্যাদি অনুমোদিত পশু) স্রষ্ঠার প্রতি আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ জবাই করতে হবে। এবং জবাইকৃত পশুর গোস্‌ত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ আত্নীয়-প্রতিবেশিদের জন্য, এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য এবং আরেক ভাগ নিজেদের জন্য রাখতে হবে। যারা কোরবানির কাজে সাহায্য করবেন, অর্থাৎ জবাই, কাটাকাটি, বণ্টন ইত্যাদি কাজে যারা শ্রম দেবেন তাদেরকে আলাদা পারিশ্রমিক দিতে হবে, কোরবানির মাংস দিয়ে পারিশ্রমিক দেয়া যাবেনা। একই সাথে, ‘সবাই দিচ্ছে কোরবানি, আমি না দিলে কেমন দেখায় ব্যাপারটি’, কিংবা ‘আমার গরুর দাম ওর গরুর দামের চেয়ে বেশি না হলে তো ইজ্জত থাকেনা’—এরকম ভাবনা কোরবানির চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক—তাই এমন ক্ষেত্রে ‘কোরবানি দিচ্ছি’-এই ভাবনা নিজের এবং অন্যের সাথে প্রতারণার সামিল।

আবার কোরবানির পশুর গোস্‌ত বণ্টনের নির্দেশিত পদ্ধতিও সঠিকভাবে মেনে চলা হয়না। এখানে একটি কথা বলে রাখি, সমান তিনভাগে ভাগ করতেই হবে, না করলে কোরবানি হবেনা—ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। কারও পরিবারের সদস্য বা নিকট আত্মীয়ের সংখ্যা এতো বেশি যে তিরিশ কেজি গোস্‌তের পঁচিশ কেজি তাঁরই লাগবে—এমন হলে তিনি পঁচিশ কেজিই নেবেন। বাকি পাঁচ কেজি গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেবেন। ব্যাপারটি এমন নয় যে, নিজেদের চাহিদাকে অপূর্ণ রেখে সমান তিনভাগে ভাগ করে দিতে হবে। তবে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেয়াটা নিঃসন্দেহে ত্যাগের মহিমাকেই প্রকাশ করে। কোরবানি সামর্থ্যবানরা করে থাকেন। সুতরাং ‘সমান তিন ভাগ করে দিলে নিজেদের ভাগে যেটুকু পড়বে তা তো এক সপ্তাহেই শেষ হয়ে যাবে, এতো বড়ো গরু কোরবানি দিয়ে একটা মাস শান্তিতে খেতে পারবোনা, ফ্রিজের সবটুকু খালি যায়গা ভরবেনা, তা কী করে হয়’—এরকম মানসিকতা সত্যিই কোরবানির মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এমনটি যিনি ভাবছেন, তিনি আসলে খরচ কতো, আর ঘরে কতো আসলো—এরকম হিসেব করছেন, যা ত্যাগের নয়, ভোগের।

আরেকটি বিষয় হলো, গরিব-মিসকিনদের জন্য নির্ধারিত এক তৃতীয়াংশ মাংসের কোয়ালিটি। আমি অনেক দেখেছি, মাংসের অধিক সুস্বাদু অংশগুলো নিজেরা বুঝে নিয়ে, অতি চর্বিযুক্ত, হাড়-সর্বস্ব, লো-কোয়ালিটির মাংসগুলোকে রাখা হয় ওই গরিবদের জন্য। অর্থাৎ এই বিভাজন প্রক্রিয়াতেও গরিবদের প্রতি একটা তাচ্ছিল্যের ভাব সুস্পষ্ট—ব্যাপারটা এমন যে, দিচ্ছি যে, এই তো বেশি। তথাকথিত আলেমরাও এসব নির্দ্বিধায় করে থাকেন। প্রশ্ন হলো, যদি খাই-খাই ভাবই দেখাবো, তবে কোরবানির নামে ভণ্ডামি করে কেনো? এমন সম্ভাবনা ঠেকাতে কোরবানির পশুর পাশাপাশি আরেকটি পশু কেনা যেতে পারতো শুধু গোস্‌ত খাওয়ার জন্য।

আত্মীয়-পরিজনকে, দরিদ্রদেরকে কোরবানির মাংস যথাসম্ভব কম দিয়ে, বাসার ফ্রিজগুলোকে গরুর গুদাম বানানোর প্রবণতা বরাবরই দেখে আসছি। কোরবানির নামে এই অসুস্থ প্রবণতা থেকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে দূরে রাখুন। আসুন, বিলিয়ে দেবার আনন্দে নিজেদেরকে নতুন করে সামিল করি। কোরবানির চেতনায় উদ্ভাসিত হোক সবার জীবন। ঈদ মুবারক!