ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

আমি বিশ্বাস করি, আমার কিংবা অন্য কোনো মুসলিমের চারিত্রিক স্খলনে ইসলাম ধর্ম খারাপ হয়ে যায়না। ইসলামের নামে অনাচার বা জঙ্গিবাদকে নিজের ধ্যানে-জ্ঞানে-আচরণে লালন করলে ইসলাম ধর্ম খারাপ হয়ে যায়না। ধর্মের নামে অধর্ম যারা করে তারা ধর্মের অপব্যবহার করে। ধর্মকে পোশাক হিসেবে ব্যবহার করে স্বার্থ-সিদ্ধির অশুভ পাঁয়তারা তো হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর জীবদ্দশায়ও হয়েছিলো, যখন প্রকাশ্যে মুসলিম সেজে নবীজি’র সাহচর্যে থেকে পরে গোপনে গিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে তথ্য সরবরাহ করতো অনেক ধুরন্ধর। সুতরাং আজ এতো বছর পরে ধর্মবিদ্ধেষী এবং বকধার্মিক –উভয়ের কৌশলে যুক্ত হওয়া বিবিধ প্রকরণে অবাক হলেও অতীতের ধারাবাহিকতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে –এমন মনে করবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু দুনিয়ার তাবৎ মুসলিম উম্মাহ’র ধর্মীয় অনুভূতিতে বিশাল এক প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করে যে পূণ্যস্থান, মক্কা-মদিনা তথা সৌদি আরব, সে স্থানের শাসক পরিবারের মিথ্যাচার, আর তার সদস্যদের আদর্শিক বিচ্যুতির লোমহর্ষক সব খবরে বুকের মধ্যে যন্ত্রণা হয়। আমি নিশ্চিত, যারা ধর্মকে প্রাত্যহিক চর্চায় লালন করেন তাদের কষ্ট আরও বেশি হয়। এই লেখা সেই কষ্টের উৎপাদন, আর শিরোনামের ওই প্রশ্নবোধক-এ নিজের অসহায়বোধ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে।

সৌদি রাজপরিবারের রাজপুত্তুরদের কর্মকাণ্ডের বিবরণ পড়ে আমার কেবলই কালিগ্যুলা’র কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। জুলিও-ক্লওডিয়ান রাজবংশের সদস্য কালিগ্যুলা রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন ৩৭ থেকে ৪১ খ্রিস্টাব্দ অবধি। তিনি নিজেকেই ঈশ্বর মনে করতেন এবং তার শাসনামল ছিলো ভয়ানক অরাজকতায় পূর্ণ। তার মাত্রাতিরিক্ত ভোগ-বিলাস, নিষ্ঠুরতা, যৌনবিকার এমন পর্যায়ে গিয়েছিলো যা ইতিহাসে ভয়ঙ্করতম বর্বরতার চিত্রকে পরিস্ফূট করেছে। ‘কালিগ্যুলা’ নামে একটি ইংরেজি ম্যুভি আছে, যেখানে এই পাগল অরাজক সেক্স পার্ভার্ট শাসকের জীবনকালকে দেখানো হয়েছে। তবে কালিগ্যুলা’র এসব কাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ, যদিও বর্তমান সৌদি রাজপরিবারের নৈতিক স্খলনের কাহিনীকে মিথ বলার কোনো সুযোগ নেই।

 এবার হজ মৌসুমে সৌদি প্রিন্সের কথিত ভ্রমণ বিলাসের শিকার হতভাগ্য হাজিদের একাংশ সৌদি রাজপরিবারের বখাটে রাজপুত্তুরদের স্বেচ্ছাচার, নৈতিক স্খলন আর বিকৃত বিলাসের কাহিনী সবারই জানার কথা। প্রচুর সম্পদ যে অধঃপতনের কারণ হয়—তা সৌদি রাজপরিবারের বর্তমানPart-NIC-Nic6489414-1-1-0 অবস্থা দেখে কারও বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। সারা বিশ্বের মুসলিমদের প্রিয় পয়গম্বর হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর হাজারও স্মৃতি বিজড়িত স্থান মক্কা-মদিনার পাহারাদার এই সৌদি রাজপরিবার তার হাল আমলের সন্তানদেরকে দ্বীনি শিক্ষায় মানুষ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবারেও একই  অবস্থা বিদ্যমান। ক্ষমতা আর অঢেল অর্থের সহজলভ্যতা দিয়ে এরা ব্যক্তিগত ভোগ বিলাসে এমনভাবে নিজেদেরকে জড়িয়েছে, যা পশ্চিমা বিশ্বের তারুণ্যের তথাকথিত চরম নৈতিক বিপর্যয়, স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা ‘বেলেল্লাপনা’কে (যেসবের উদাহরণ টেনে আমাদের দেশের আলেম সমাজ আমাদের তরুণদেরকে নসিহত করে থাকেন) ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে—যার আরেকটি নজির কয়েকদিন আগে হাজিদের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়েছে। একই সাথে এই ঘটনার প্রকৃত কারণ ধামাচাপা দিতে গিয়ে  সৌদি সরকার যে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে তা-ও বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। সত্যের ধারক, পবিত্রভূমির রক্ষক সরকারের মুখে এ কী শুনলাম আমরা! আমরা অবাক হয়েই ভাবি, আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মনে হচ্ছে, সৌদি সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শয়তান ঢুকে গেছে। নয়তো এরকম একটা ব্যস্ত সময়ে, যখন লাখ লাখ হাজি ছুটে চলছে হজের আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য, হুট করে রাস্তা ব্লক করে দিয়ে সৈন্য-সামন্ত সমেত গাড়িবহর নিয়ে বেরুবার, সেটা যে উদ্দেশ্যেই হোক, এই উদ্ভট আইডিয়া কেনো আসবে রাজপরিবারের এই তরুণের মাথায়?

সৌদি রাজতন্ত্র বর্তমান পৃথিবীর সবচে’ ক্ষমতাধর রাজতন্ত্র। বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ দেশটিকে দিয়েছে ভয়ানক শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত। বিংশ শতাব্দির মধ্যভাগ থেকে দেশটি সমগ্র পৃথিবীর জ্বলানী তেলের মোট চাহিদার প্রায় পঁচিশ শতাংশের যোগান দিয়ে যাচ্ছে। সেই সময় থেকেই সৌদি রাজপরিবার বছরে প্রায় সাতশো মিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করে চলছে শুধু এই তেল বাবদ। এছাড়াও প্রতিবছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেXXXXXXকে আসা লাখ লাখ হাজিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থের উপার্জনতো আছেই। সৌদি রাজপরিবারের অর্থ বিলিয়নে নয়, ট্রিলিয়নে হিসেব হয়। আর এই অর্থেই আমেরিকা থেকে আসে বিশাল অস্ত্রের চালান, এই অর্থেই গড়ে উঠেছে প্রিন্সদের ৩০-৪০ মিলিয়ন ডলারের একেক প্রাসাদ, এই অর্থেই কেনা হয় স্বর্ণ দিয়ে মোড়া কমোড, ফেরারি আর জেট বিমান। সৌদি এখন এক ব্যাপক ঐশ্বর্যের শিল্পোন্নত এবং প্রযুক্তিনির্ভর দেশ। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, আইফোন, শতশত স্কাইস্ক্র্যাপার, বিশাল সব আধুনিক শপিং মল, বিশ্বের সব নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের সমারোহ, তিন-চার লেনের সুপ্রশস্ত রাজপথ আর নিত্য-নতুন মডেলের সব দামি গাড়ির গিজগিজ দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথাই জানান দেয়। রাস্তা-ঘাটে, অফিস আদালতে, বাজারে-মাজারে পরিপাটি সবকিছু। নিয়মের কোনো ব্যত্যয় চোখে পড়বেনা। সৌদি পুলিস সদা তৎপর আছে সবখানে। উপর দিয়ে এই ফিটফাট দেখে ভেতরের সদরঘাটের কথা পর্যটকের মাথায় আসার কথা নয়।

সৌদিতে কোনো দোকানে আপনি বিয়ার কিংবা মদ পাবেননা। কোনো বার নেই কোথাও। ইন্টারনেটে পর্নো সাইটগুলো সেন্সর করা। ধর্মীয় দৃষ্টিতে হারাম এমন অনেক কিছুই ইন্টারনেট-এ আপনি দেখতে পারবেননা সৌদিতে। অথচ রাজপরিবারের প্রিন্সদের জন্য এসব কোনো ব্যাপারই না। ইন্টারনেটের এসব সেন্সরের দেয়াল টপকানো তেমন কঠিন কাজ নয়। আর প্রিন্সরা তাদের প্রাইভেট জেট-এ করে নিজেদের পছন্দের মদ এবং অন্যান্য নেশার সামগ্রি সহজেই আনতে পারেন যেখান থেকে খুশি। রাজার ছেলের আবার নিয়ম কিসের?

সৌদিতে কোনো ডিস্কো নেই, কোনো প্রসটিটিউশন নেই। কিন্তু রাজপুত্তুরদের যৌনবিকার থেমে নেই। ইচ্ছে হলেই যে যার মতো চলে যাচ্ছেন ইউরোপ-আমেরিকার কোনো পাঁচতারা হোটেলে, দামি কোনো পানশালায়।  আকণ্ঠ পান করে নিচ্ছেন প্রিয় ব্র্যান্ডের মদ।  ডলারে ভাড়া করে নিচ্ছেন শয্যাসঙ্গীকে। কে এস এ বলুন আর ইউ এ ই বলুন— ঘটনার প্রবাহে ফারাক নেই তেমন। উদাহরণস্বরূপ ২০১০ এর সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটির কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। লন্ডনের এক পাঁচতারা হোটেলে সৌদি রাজপুত্র সওদ বিন আব্দুলাজিজ বিন নাসের তার পরিচারক বান্দর আব্দুলাজিজকে হত্যা করে ফেঁসে গেলেন ।

Untitled

প্রিন্স সওদ ও তার কথিত যৌনদাস বান্দর আব্দুলাজিজ

এরপর আদালতে বেরিয়ে আসলো তার বিলাসি যৌন জীবনের আরেক চিত্র। সওদ ছিলেন সমকামি এবং ওই পরিচারক আসলে ছিলো তার সেক্স স্লেইভ। তিনি প্রায়শ ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন গে-এস্‌কর্ট এজেন্সিতে বুকিং দিয়ে পছন্দের গে এস্‌কর্ট-এর যৌন সেবা নিতেন এবং বিভিন্ন অনলাইন গে সাইটগুলোতে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। বান্দর আব্দুলাজিজকে হত্যা করার আগে দুজনে  ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’এর এক পার্টি থেকে শ্যাম্পেইন এবং ‘সেক্স-অন-দ্য-বীচ’ নামক ককটেইল পান করেছিলেন। সেক্স পার্ভার্ট এই প্রিন্সের স্যাডিস্টিক আচরণের বলি হতে হয়েছে বান্দর আব্দুলাজিজকে, যে এতোই অনুগত ছিলো যে, নিজের মৃত্যু আসন্ন জেনেও একটিবারের জন্য পালটা আঘাত করেনি সওদকে। লন্ডনের বিচারালয়ের রায়ে এই প্রিন্সের যাবৎ জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। তিন বছর কারাভোগের পরে অবশ্য দুই দেশের কূটনৈতিক সমঝোতায় তাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এই শর্তে যে, কারামেয়াদের বাকি বছরগুলো তিনি সৌদি কারাগারে কাটাবেন। কিন্তু হোমোসেক্সুয়ালিটির যে শাস্তি সৌদি আরবে বিদ্যমান তার বেলায় তা প্রয়োগ হয়নি। বরং সৌদি অফিশিয়ালরা শুরু থেকেই এই ব্যাপারটিকে আড়াল করার হীন চেষ্টা করে গেছেন। এই সেই দেশ যেখানে চুরি, মাদক চোরাচালান বা হত্যার দায়ে গর্দান গেছে কতো সাধারণ নাগরিকের, এমনকি অনেক বিদেশির। (তথ্যসূত্রঃ ০১)   (তথ্যসূত্রঃ ০২)

বলছিলাম সংযুক্ত আরব আমিরাতেও একই অবস্থা। কয়েকদিন আগেই মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কথিত হার্ট এ্যটাকে মারা গেলেন দুবাইয়ের প্রিন্স শেখ রশিদ। এই মৃত্যুর ব্যাপারে রাজ পরিবারের রাখঢাক অনলাইনের গুঞ্জনকে বরং উস্কেই দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে অতিমাত্রায় কোকেইন, হাশিস এবং স্টেরওয়েড-এর প্রভাবেই তার এই অকাল মৃত্যু হয়েছে। এই অভিযোগের ব্যাপারে কিন্তু রাজপরিবার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।  (বিস্তারিত এই লিংক-এঃ (তথ্যসূত্রঃ ০৩))

ক্ষমতার অপব্যবহার আর ব্যক্তিগত বিনোদনে অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহার একটা ইসলামিক রাষ্ট্রের শাসক পরিবারেও কী পরিমাণ অধঃপতন ডেকে আনে তার জ্বলন্ত উদাহরণ সৌদি রাজপরিবার। অথচ দেখুন, দেশে দেশে মুসলিম শরণার্থীরা যখন আশ্রয়ের খোঁজে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছে, এখানে ওখানে পড়ে মরছে, তখন এতো এতো সম্পদের স্তুপের উপর আয়েশে গা এলিয়ে দিয়ে কেমন চোখ বুঁজে আছে রাজপরিবারের এসব রাজা আর রাজপুত্তুরের দল!  সারা বিশ্বের মানুষের বুক ফেটে যায় বঞ্চিত এসব অসহায় মানুষের দুর্ভাগ্যে, অথচ এদের অন্তর গলেনা। যতোসব বর্বর কোথাকার!

এইসব ভাবনার উৎপাতে আমার নিজের মুসলিম পরিচয় বায়বীয় হয়ে যায়। আমি আমার পিতামহের কথা ভাবি, যিনি হজে যাবার আগে ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন যেনো মক্কা বা মদিনায় তাঁর মৃত্যু হয়। আর ভাবি এবারের হজে সৌদি প্রিন্সের বিলাস ভ্রমণের ভিকটিম হয়ে প্রাণ হারানো হাজারো হজযাত্রীর কথা, যাদের পরিবারগুলো হয়তো স্বজন হারানো বেদনাকে ভুলে যেতে চাইছে এই ভেবে যে, এই মৃত্যু তাদের মৃত স্বজনদের পরপারের শুভযাত্রা নিশ্চিত করেছে। মানুষ কতো সহজে কষ্টের উপশম খুঁজে পায়!

https://www.facebook.com/kazishahidshawkat