ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

আমাদের প্রিয় এক মামী ছিলেন। প্রতিবেশি মামী। একই বিল্ডিং-এর ভাড়াটে ছিলাম। আমরা দু’তলায়, আর তারা থাকতেন তিন তলায়। আমাদের বাসায় রান্না করা বেশ কয়েক ধরণের খাবার মামীর খুবই প্রিয় ছিলো। ওরকম কোনো আইটেম রান্না হলে প্রায়ই তাকে দিয়ে আসা হতো। কখনও ঘ্রাণের টানে মামী নিজেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতেন। তবে তার হাতের বানানো কোনো খাবার আমাদের কোনোদিন খাওয়া হয়নি কেনো সেটা নিয়ে মনে কখনও প্রশ্ন উঠেনি কারণ আমরা জানতাম, তিনি বেশ মিতব্যায়ী ছিলেন। তাদের বড়ো মেয়ের জন্মদিনে মামা একবার আড়াই পাউন্ডের কেক এনেছিলেন বলে শুনেছিলাম। এতোগুলো টাকা খরচ করে অহেতুক কেক— মামীর পছন্দ হয়নি। তার যুক্তি ছিলো, ” নব্বই টাকা দিয়া একটা ফ্রুট কেক হইলেই যেইখানে চলে, সেইখানে অতো ভঙ্গীর কেক কেনো দরকার?” কঠিন যুক্তি।

দিবস উদযাপনের কেকগুলো সত্যিই সুন্দর হয়। আসলে ওই কেকের স্বাদে নয়; চেহারায় মন ভরে। অথবা কেকটাকে ঘিরে হৈ-হুল্লোড় কিংবা ক্যামেরার ক্লিকে মনোযোগ বেশি থাকে। স্বাদের এবং ক্ষুধার প্রয়োজনে যে কেক, সেটার দাম কম; তাই ফটোজেনিক হয় না। জন্মদিন বা বিয়ে বার্ষিকীর কেকটার সাইজ, কালার, ওজন, ডিজাইন মনের মতো হতে হয়। পরিবহণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। নয়তো কেকের গায়ে লেখা নরম অক্ষরগুলো লেপ্টে গিয়ে সেলিব্রেশন মাটি করে দিতে পারে। এই কেক আভিজাত্যের। বিশেষ  আনন্দের। বিশেষ আদরের। এটা অকেশনাল। অন্যদিকে ফ্রুট কেক বলতে গেলে প্রাত্যাহিক। হৈ-চৈ নাই। পেটে গেলে শান্তি পাই। এটাই শুধু নয়, অভিজ্ঞরা জানেন, কটকটে আলোতে কিংবা ক্যামেরার সামনে প্রণয়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মূহুর্তগুলো জমে না ঠিক। এর জন্য একটু আড়াল চাই, অন্ধকার চাই। তেমনি বাঁধাকপি, গাজর, মূলা কিংবা টোমেটোর চেয়ে লেটুসপাতা, ক্যাপসিকাম, ব্রকোলি কিংবা স্ট্রবেরির কদর বাঙালির কাছে অনেক বেশি। কারণ ওই একটাই। দামী, ব্যাতিক্রম, বিদেশি, আভিজাত্যের প্রতীক,সচরাচর পাওয়া যায়না ইত্যাদি প্যারামিটার এখানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

ছোট একটা ছেলেকে পিটিয়ে মেরেছে। এরকম পিটিয়ে মারার অনেক খবর  আসে। এটা কেনো এতো সেনসেশনাল ছিলো? কারণ এটা স্টিল পিকচার বা টেক্সট ফরম্যাটের নিউজ ছিলো না, এটার ভিডিও  দেখা গেছে। এরকম আরও পাঁচটা ভিডিও নিউজ আসলে দেখবেন ব্যাপারটা র‍্যাবের এনকাউন্টারের মতো পানসে হয়ে যাবে। গত তিন বছরে ব্লগার হত্যা ব্যাপারটি যেমন এখন আর বিশেষ কিছু নয়। বড্ড গতানুগতিক।

সিরিয়ায় যারা মরছে ওরা ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা প্যালেস্টাইনের পাবলিকের মতোই। সুতরাং নতুনত্ব নেই। দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাই। শালা এক টাইপের মরা মানুষের এতো খবর ভালো লাগে? ন্যাশনাল পর্যায়ে গণমমতার জন্য, তোষামোদির জন্য যেমন ভেরিয়েশন লাগে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সিমপ্যাথিও এখন শুধু হামলার ধরণ আর মৃতের সংখ্যা বিবেচনায় হয়না। জাতি-ভিত্তিক ভেরিয়েশন লাগে। প্যারিসের হামলা কিন্তু বিশ্ববাসীকে সেই ভেরিয়েশন দিয়েছে। আমাদের মানবতাবাদ হঠাৎ নতুন স্বাদে হু-হু করে কেঁদে উঠেছে। এটা বৈচিত্র্যের অভিজ্ঞতাজনিত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এটা দেখে অনেকে বিরূপ মন্তব্য করছেন। কিন্তু বন্ধুগণ,বিশ্বমানের মমতার এই অভিজাত প্রকাশের সুযোগ বারবার আসে না—সেটি তো একবার ভাবতে হবে। আর তার চেয়ে বড়ো কথা হলো, একই শুটিং স্পটে বারবার শুটিং করতে শিল্পীদের ভাল্লাগেনা, যারা দর্শক তাদেরও না। সত্যি বলছি, আমার নিজের কাছেও এই হামলা বেশ নতুন এবং একটু বেশি কৌতূহলোদ্দীপক লেগেছে। আমি অনেক বেশি আগ্রহ নিয়ে প্যারিসের হামলার খবর পড়েছি। তো কারও যদি এসব দেখে মানবতা একটু বেশি আবেগ নিয়ে জেগে উঠে, তবে তার তুলনায় আমি নিজেকে কেনো ছোটো ভাববো? তাকে আমার বিপক্ষ হিসেবে দেখবারও কিছু নেই।

আমরা মানুষ। আমাদের মানবতা মরেনি। গণতন্ত্র যদি কার্টেইল্ড হয়েও দেশে দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তবে মানবতা কার্টেইল্ড হলে তাতে ক্ষতি কী? কেক কাটা যাবে, গলা কাটা যাবে, মাথা কাটা যাবে, চুল কাটা যাবে, অণ্ডকোষ কাটা যাবে—কিন্তু মানবতা অল্প-বিস্তর কাট-ছাঁট করা যাবে না, এটা তো হতে পারে না, তাইনা? আরেকটি কথা, স্ট্রবেরির গন্ধ আমি সাবানে, নাকি জন্মনিরোধে বেশি পছন্দ করবো সেটা যদি আমাকে কেউ বোঝাতে আসে তবে প্রথমেই আমি তাকে বিপণন কর্মী ভাববো—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

যাই হোক, মামীর গল্পের শেষ অংশটুকু এবার বলি। সেবার মামীর বাবা তার একমাত্র মেয়ের জন্য বাড়ি থেকে অনেকগুলো কাঁঠাল পাঠিয়েছিলেন। আর তার পরই ঘটে গেলো এক ঐতিহাসিক কাণ্ড। মামী একটা বড়ো থালায় করে কাঁঠালের এত্তগুলো কোষ পাঠিয়ে দিলেন আমাদের বাসায়। পাঁচ-সাতটা কোষ নয়। কম করে হলেও বিশটা তো হবেই। বাসার সবার মাঝে চরম উত্তেজনা। গত দুই বছরে এই প্রথম এমন ঘটলে কার না অবাক লাগবে? অপছন্দের ফল হলেও ওই দিন কাঁঠাল খেতে খুব ইচ্ছে হয়েছিলো। একটা কোষ হাতে নিলাম। কিন্তু এ কী! বিচি কোথায়? অন্যগুলোরও দেখি একই অবস্থা। বুঝলাম, মামী বিচি রেখে দিয়েছেন, আমাদের কষ্ট তার পছন্দ না। আপা বললেন, “তাও তো দিসে। দিয়া দিয়া অভ্যাস হোক। আজ কাঁঠালের কোষ দিসে, আরেকদিন বিচি দিবো। এরপর আরেকদিন একটা কাঁঠালই দিবো। আর তুমি কি কাঁঠাল খাইতে বইছো, না বিচি খাইতে?”  আপা ঠিকই বলেছেন। আমার বিচির দরকার নেই।

শেষ কথা হলো, মানবতা কোনো সোশ্যাল সাইট নির্ভর হয়না। তাই কে প্রোফাইল রাঙালো আর রাঙালো না, কিংবা কে চুপ করে থাকলো এটা নিয়ে যখন পক্ষ-বিপক্ষ বিষেদ্‌গারে লিপ্ত হচ্ছে, কিংবা এটা যখন আমাদের মানবতাবোধের মাত্রা নির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে তখন বুঝতে হবে আমরাও মূলত বিভাজনের সেরকম ষড়যন্ত্র দিয়েই নিজেদেরকে ক্রমাগত দর্শনায়িত করে চলছি, যেরকম ষড়যন্ত্র আইএসকে তৈরি করেছে। এখন তো সব তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে। কে কীভাবে কী দিয়ে কতটুকু কী করছে সেটা সহজেই জানতে পারছি আমরা। হুজুগ কেটে যায়। এরপর সত্য জ্বলজ্বল করে। আমরা যেনো সত্যকে জানবার পথগুলো নিজেদের কলহ দিয়ে ঢেকে না রাখি।

https://web.facebook.com/kazishahidshawkat