ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

maxresdefault

খালি গায়ে মায়ের কোলে শুয়েছিলো শিশুটা। চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো, ভীষণ অপুষ্টিতে ভূগছে। মাথাসহ পুরো মুখটাকে দেখে মনে হচ্ছিলো যেনো প্রায় চুপসে যাওয়া একটা বেলুনের গায়ে বেশ বড়ো আকারের দুটো চোখ বসিয়ে দিয়েছে কেউ। যার বাসায় গিয়েছি, এটা তার বোনের মেয়ে। দেখে খুব মায়া হলো।  জয়নুলের ছবির ভূখা বাচ্চাটার চেয়েও দুর্বল দেখাচ্ছিলো। এতো ক্ষীণকায় শিশু আমি জীবনে দেখিনি। বোনটাকে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। বললো, ‘কী আর হবে। খাওয়া দাওয়া একদমই করতে চায় না। আর খালি কান্দে।”

আমি আমার এবং প্রতিবেশি, আত্নীয়-স্বজনদের পরিবারে শিশুর খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপারগুলো কাছ থেকে দেখেছি, আর এভাবেই জেনেছি যে, অনেক শিশু খাবারে ভীষণ অনাগ্রহী হয়। এদের পেছনে লেগে থাকতে হয়, বারবার চেষ্টা করে যতোটা সম্ভব খাওয়াতে হয় যেনো শিশুর দৈনিক পুষ্টি চাহিদা অপূর্ণ না থাকে। ওই মাকে এসব জানালাম আর একজন ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ নিতে বললাম। তিনি অবাক হয়ে বললেন, “ওর বাবাই তো ডাক্তার। তার জন্যই তো আমি জোর করে কিছু খাওয়াতে যাই না। ওর বাবার কড়া নির্দেশ, ওকে জোর করে খাওয়ানো যাবে না, ওর যখন খেতে ইচ্ছে করবে তখনই খাওয়াতে হবে। আর এ তো কখনোই কিছু খেতে চায় না।” বুঝলাম, ডাক্তার বাবার এই পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মানতে গিয়ে শিশুটির এই অবস্থা। ডাক্তার সাহেব ভিন্ন এক শহরে কর্মরত। তিনি হয়তো এভাবে নিজের সন্তানের মঙ্গল নিশ্চিত করে নিশ্চিন্ত আছেন। অথচ শিশুটির খাবারে একটু ভেরিয়েশন এনে একটু চেষ্টা করলেই এই নিদারুণ অপুষ্টির কবল থেকে বাঁচানো যেতো। কিন্তু বাবা যখন ডাক্তার, তখন মা বেচারি কেনো অযথা অন্যের কথা শুনতে যাবেন সন্তানের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে? মনে মনে এই ডাক্তার বাবার বোধোদয়ের জন্যে আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা ছাড়া আমার কী আর করার ছিলো?

এরকম আরেকটি ব্যাপার ঘটতে দেখলাম কয়েকদিন আগে টিভিতে। স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠানে খ্যাতনামা এক বিশেষজ্ঞের কথা শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন হাড়ের ক্ষয়জনিত সমস্যা নিয়ে। তার কাছ থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা জানা গেলো। সেটা হলো, আঙুল, কব্‌জি কিংবা ঘাড় ফুটানোর অভ্যাস মারাত্নক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর এটার ভুক্তভোগি আমি নিজেই। দীর্ঘদিন ধরে আঙুল ফুটানোর কারণে আমার বাঁ হাতের দুটি আঙুলে এখন সামান্য চাপ পড়লেই বেশ ব্যথা লাগে। তবু অভ্যাস কি আর সহজে যায়! যা-ই হোক, তো সেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সাহেব হাঁটুতে সমস্যা আছে এমন রোগিদেরকে হাই কমোড ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছিলেন— যা খুবই যৌক্তিক। কিন্তু তিনি হঠাৎ বলে বসলেন, ‘সকল সুস্থ মানুষেরই হাই কমোড ব্যবহার করা উচিৎ কারণ স্কোয়াটিং পজিশনে (মানে সাধারণ কমোডে উবু হয়ে) বসে টয়লেট ব্যবহারের ফলে এক সময় হাঁটুর ক্ষয়রোগ (অস্টিওআর্থ্‌রাইটিস) হতে পারে।’ আমার একটু খট্‌কা লাগলো, কারণ নামাজের সময়, কিংবা যোগ ব্যায়ামের বিভিন্ন ভঙ্গিতে হাঁটুকে এরকম কিংবা আরও বেশি করে ভাঁজ করতে হয়—এতো ক্ষতি হলে তো নিয়মিত নামাজ পড়া মুসলিমদের মধ্যে কিংবা যোগ ব্যায়াম যারা করেন তাদের মধ্যে হাঁটুর এই ক্ষয়রোগ মহামারি আকার ধারণ করার কথা।

দেশের একজন একজন বিশিষ্ট চিকিৎসকের কথায় সন্দেহ পোষণ করায় আমার লজ্জা হলো, তবে বিষয়টা একটু যাচাই না করে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না, কারণ অনেকের মতো আমিও  সেই সনাতন স্কোয়াটিং স্টাইলেই অভ্যস্থ, এতো বেশি যে, হাই কমোডে বসতে ঘেন্না হয় (এইরূপে বসিয়া বসিয়া যদি স্মার্টনেস খসিয়া যায়, কোনো আপত্তি নেই 🙁  😛 )। তো আমি ওই বিষয় নিয়ে তথ্য খুঁজছিলাম আর কামনা করছিলাম যেনো আমার সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হয়। কিন্তু হলো উল্টোটা। নেটে একটু সার্চ দিতেই সত্য বেরিয়ে এলো। মাইক্রোবায়োলজিতে ডক্টরেট করছেন এমন একজনের বরাত দিয়ে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছেঃ we have been pooing all wrong. … various studies …show that we do it more efficiently if we squat. This is because the closure mechanism of the gut is not designed to “open the hatch completely” when we’re sitting down or standing up: it’s like a kinked hose. Squatting is far more natural and puts less pressure on our bottoms. (আমরা যে পদ্ধতিতে (মানে হাই-কমোডে বসে) পাকস্থলির বর্জ্য বিয়োগ করছি সেটা সম্পূর্ণ ভুল। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে, স্কোয়াটিং-এর কল্যাণে আমাদের বর্জ্যবিয়োগের কাজটা আরাও ভালো করে করা সম্ভব হয়। কারণটা হলো বর্জ্য নিস্ক্রান্তির মেকানিজ্‌মটা এমন ভাবে তৈরি হয়নি যে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নির্গমন পথ পুরোপুরি খুলে যাবে। এটি সঙ্কুচিত হয়ে থাকা নরম পাইপের মতো। স্কোয়াটিং অনেক বেশি প্রাকৃতিক পদ্ধতি এবং এতে আমাদের পশ্চাদ্দেশে তুলনামূলক কম প্রেশার পড়ে।)

বিস্তারিত এই লিঙ্কেঃ http://www.theguardian.com/lifeandstyle/2015/may/18/truth-about-poo-doing-it-wrong-giulia-enders-squatting । আরও জানতে দেখুন এই লিঙ্কটিঃ http://www.naturesplatform.com/health_benefits.html। এক কথায়,হাই কমোডের সিটিং পজিশনের চেয়ে স্কোয়াটিং পজিশন অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। এছাড়াও গবেষণায় এটি এখন প্রমাণিত যে, বিশ্বের সর্বাধিক মানুষের ব্যবহৃত এই সনাতনী বসার ভঙ্গি কোলন ক্যান্সার, এপেন্ডিসাইটিস ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে বেশ সহায়ক। সঠিক তথ্য পেয়ে ভালো লাগার চেয়ে খারাপ লাগলো বেশি কারণ মনগড়া কথা রাজনীতিকদের পাশাপাশি যদি ডাক্তাররাও বলতে থাকেন এভাবে, আমরা তাহলে যাবো কোথায়? আমি মোটেই এটাকে জেনারালাইজ করছিনা কারণ আমি জানি, এরকম সবাই না; আর তাই  ঠিক করেছি, এই ডাক্তার সাহেব এবং তার মতো ড্যাঞ্জেরাজ বৈদ্য, কবিরাজ যারা আছেন তাদের কুপ্রভাব থেকে আমার নিজের এবং দেশবাসির মুক্তির জন্য নিয়মিত প্রার্থনা করবো। কিন্তু অভ্যাস কি আর সহজে যায়!

এদিকে বেশ কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টালে বিনোদন আর খবরের নামে যা চলছে সেটিও কম উদ্বেগের নয়। খবরের ছদ্মাবরণে যৌনতা কিংবা যৌন সহিংসতাকে ড্রামাটাইজ করে হাইলাইট করা হচ্ছে। এসব যত্নশীল সম্পাদনার সচিত্র খবরের জনপ্রিয়তা কতোটা ভয়াবহ সেটা একজন ফেইসবুক ইউজারের চেয়ে আর কে ভালো জানেন?  ছোটো ঘটনাকে সুড়সুড়ির ইঞ্জেকশন দিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তার সাথে চকমকে, আবেদনময়ী কোনো স্বল্পবসনা নারীর ছবি জুড়ে দিয়ে তৈরী নাটকীয় এসব সংবাদ কিংবা স্বাস্থ্য পরামর্শ (!) গলগল করে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে জনে জনে। খবরের শিরোনাম বেশ আগ্রহ উদ্দীপক বটে। কিছু উদাহরণ দিচ্ছিঃ *মেয়েদের দশটি গোপন কথা যা তারা কখনই বলে না। *আপনার সঙ্গী অন্য কারও সাথে সেক্স করেছে কি না তা জানবেন যেভাবে। *সানি লিওনের দশটি অজানা সত্য। *মধ্য রাতে বাবা এ কী করলো?  * শালীর প্রতি দুলাভাইয়ের ভালবাসার এ কেমন চিত্র ( ভিডিওসহ) , *রতিক্রিয়ায় গতিঃ সহজ কিন্তু কার্যকরী টিপ্‌স …আরও কতো কী! এসবের অনেক খবরের সাথে বাস্তবের কোনো সংস্পর্শ নেই, মানে হলো ওগুলো হয় কোনো সমগোত্রীয় সাইট থেকে ধার করে যাচাই-বাছাইয়ের তোয়াক্কা না করে পেস্ট মারা, নয়তো নিউজরুমে রান্না করা সংবাদ। আর এসব সাইটের হিট হু-হু করে বেড়ে চলে সেকেন্ডে সেকেন্ডে। ব্যবসা যে ভালো হচ্ছে এটা তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অন্যমনষ্কতায়, অবহেলায় চোখে পড়ছেনা যে বিষয়টি সেটি হলো এই প্রবণতার আফ্‌টারম্যাথ। কেবলই মুনাফার উদ্দেশ্যে তৈরি এসব সস্তা চৌম্বকীয় সংবাদের বেশিরভাগই আনজাস্টিফাইড, অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিমূলক। আর এসব সংবাদের এখানে ওখানে পর্ণো আসক্তির যে ভাইরাস ছড়িয়ে থাকে তা দেখতে মাইক্রোস্কোপ লাগার কথা নয়। সেটা তো ঠিক আছে, কিন্তু এই ভাইরাস কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়ছে  তা দেখার সময়টাও কি আছে আমাদের? এতো ব্যস্ত আমরা! আর এভাবেই কৈশোর ও তারুণ্যের তথা সমাজের ব্যাপক সম্ভাবনাময় একটা জনগোষ্ঠীর শারীরিক, মানসিক সুস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে এসব পার্ভার্টেড সাইট  । এরকম আরও অনেক কষ্টদায়ক বাস্তবতার ভেতর দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মোটেও অবাক লাগে না।

তবে মাঝে মাঝে কিছু ব্যাপারে সরকারের মনোমুগ্ধকর তৎপরতা দেখে সত্যিই অবাক লাগে। আমাদের সরকার যে ইনইফিশিয়েন্ট নয় তার যথেষ্ঠ প্রমাণ আমরা পেয়েছি। তাহলে তথ্য-প্রযুক্তি সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক কিংবা ওয়াচডগের বিজ্ঞবর্গের এসব সিরিয়াস ব্যাপারে কেনো নেই মাথাব্যথা? কবে হবে তারও দিনক্ষণ ঠিক নেই। এরকম পরিস্থিতিতে এই না থাকা মাথার ব্যথা নিয়ে এতোসব কথাটথা অবশেষে প্যাঁচাল হয়েই পড়ে থাকবে–এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়া যায়। তাই যদি হয়, তবে ভালো যা কিছু আছে তাকে পুঁজি করে মন্দকে এড়িয়ে চলার পার্সোনাল ডিস্ক্রেশন মেইন্টেইন করে আরাম পাওয়ার ক্লাসিক অভ্যাস তো আমাদের আছেই, সনাতন ওই বসার অভ্যাসের মতোই, তাই না?

ক্ষতিকর যা  হচ্ছে তা থেমে যাবে সেরকমটি কখনই ভাবি না। তবে ভাবছি, এই সাইটগুলোতে যদি এসবের পাশাপাশি কিশোর-তরুণদের জন্য আলাদা স্পেইস বরাদ্দ থাকতো, যদি মননশীল বিষয়ে প্রতিযোগিতা বা  কুইজ, কিংবা স্কুল-কলেজের পড়শুনার বিভিন্ন বিষয়-ভিত্তিক আলোচনা, এক্সাম টিপ্‌স-এর আয়োজন থাকতো, তাহলে কি খারাপ হতো?

আমাদের এতো কিছু হয়েছে, আহা, আরও কতো কিছু হতে পারতো! আরও কতো কিছু হতে বাকি!

 

https://web.facebook.com/kazishahidshawkat