ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

নাগরিক জীবনে দূষণ ক্রমাগত বেড়ে চলছে যদিও, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সাবান বা ছাই থেকে শুরু করে সেনিটারি ল্যাট্রিন বা ন্যাপকিনের ব্যবহার কিংবা ক্যালোরি/ভিটামিন বিষয়ক কমন কৌতুহল– যেভাবেই বিচার করুন, আশি-নব্বইয়ের দশকের তুলনায় ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো সহজেই চোখে পড়ে। তারপরও আমাদের শহরগুলোর অপরিচ্ছন্নতার সামগ্রিক চিত্র সমস্যার উপস্থিতিকে বরং তীব্রই করে তুলে। ওদিকে পশ্চিমা মিডিয়াতে আমাদের রাজধানীকে যখন ‘সেকেন্ড ডার্টিয়েস্ট সিটি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে দেখানো হয় তখন আমাদের মন খারাপ হয়। মেজাজটাও।

ভাষায়, আচরণে এবং জীবন যাপনের অন্যান্য অনুষঙ্গে পাশ্চাত্যের প্রভাব নতুন কিছু নয়। evening-thames-1শিশুর পাঠে যখন অ-আ ফোটে, তখন এ বি সি-ও ফোটে। শৈশবেই আমাদের চিন্তার জগতে ইংরেজদের কালচার তার মর্যদার আসন তৈরি করে নেয়। আমাদের আচারে, উচ্চারণে তার নমুনা মেলে। কেউ কেউ এ ধরণের প্রভাবকে ‘নব্য ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ’ বলে থাকেন। কেউ বলেন, “বিষয়টাকে গ্লোবালাইজ্‌ড পার্স্পেক্টিভে-এ আমলে নিতে হবে, উপনিবেশবাদ টেনে আনা অতিরঞ্জন।” যে যা-ই বলুক, এটা তো অস্বীকার করবার জো নেই যে, যে কোনো জাতির ভাষা শেখা মানে তার সংস্কৃতি দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করা। এই যেমন চাকরি, ব্যবসা বা শিক্ষার প্রয়োজনে আমাদেরকে ইংরেজি শিখতে হয়। আর স্বাভাবিকভাবেই ইংলিশ সোসাইটির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আমাদের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠে। ভিন্ন সংস্কৃতির এই সংস্পর্শ অনেক সময় আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষকে নিজ জাতিসত্তার প্রতি উদাসিন ও অশ্রদ্ধাশীল করে তুলে। আমরা তখন ওই জাতির দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আমাদেরকে বিচার করতে শিখি। আর এভাবেই বুকের ভেতর জমতে থাকে হীনমন্যতা, । এই হীনমন্যতা মোহ থেকে আসে। আর মোহমুক্তির জন্য প্রথমে চোখ দুটোকে একটু কচলে নিতে হয়।

টেম্‌স নদের ঝলমলে সুন্দরে চোখ রেখে আপনি যদি বুড়িগঙ্গার দূষণের কথা ভেবে কষ্ট পান, সেটাকে দেশপ্রেমের উপজাত বলা নিশ্চয়ই burigonga_24796যায়, কিন্তু আপনি যদি ভেবে থাকেন পশ্চিমের লোকেরা সব সময়ই এরকম নিট-এ্যন্ড ক্লিন ছিলো, তাহলে ভুল হবে কারণ সত্যিটা এরকম নয়। কীরকম, তা বলার আগে যেটা বলে নেয়া জরুরি তা হলো, এই লেখার প্রকাশে ইংরেজ জাতি বা ইংরেজি ভাষাকে কোনোরূপ কটাক্ষ করার অভিপ্রায় একেবারেই নেই। 

যা-ই হোক, এবার নিট এ্যন্ড ক্লিনের বিপরীত সত্যিটা কী সেটা বলছি। ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ডে, বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগে, টেম্‌স -এর দূর্গন্ধ এতোই প্রকট আকার ধারণ করেছিলো যে, এ নদের আশপাশে যাওয়ার কথা ভাবতেই গা গুলিয়ে আসতো সবার। ইংল্যান্ডে তখনও বাসা-বাড়িতে পানির লাইন কিংবা ফ্ল্যাশযুক্ত টয়লেটের প্রচলন তেমনভাবে শুরু হয়নি। স্নান কিংবা শৌচকর্মেও পানির ব্যবহার সীমিত ছিলো। মাটির গর্তে জমানো মল-মূত্র রাতের বেলায় ভ্যানগাড়িতে করে নিয়ে ফেলা হতো টেম্‌সের পাড়ে, আর পরিবহণের সময় গাড়ি থেকে এসব সেমি লিকুইড বর্জ্য লিক করে রাস্তার এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকতো। এরপর বৃষ্টির পানিতে ভর করে এসব মল-মূত্রের বিরাট একটা অংশ এসে পড়তো টেম্‌সের বুকে। আর জলে ভাসমান এতোসব গু ফুঁ দিয়ে ডুবিয়ে কিংবা উড়িয়ে দেয়ার উপায় ছিলো না। বাতাস থকথকে করা ভয়ঙ্কর এই গন্ধদূষণের প্রতিকার না পেয়ে জনমনে যথেষ্ঠ খুব ক্ষোভ জন্মেছিলো। সোচ্চার হয়েছিলো মিডিয়াও। কিন্তু সহসাই কোনো সমাধান মেলেনি। ‘পাঞ্চ’ নামক রম্য ম্যাগাজিনে তখন একটা স্যাটায়ার বেরিয়েছিলো এরকমঃ324389

Dirty Father Thames

Filthy river, filthy river,
Foul from London to the Nore,
What art thou but one vast gutter,
One tremendous common shore?

অবশ্য পরবর্তিতে ১৮৫৯ সালে ইংল্যান্ডকে দূর্গন্ধমুক্ত করার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিলো এবং অনুন্নত, বিপর্যস্ত এই পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে লেগেছিলো প্রায় পনেরো বছর। এই সাফল্যের ইতিহাস আমাদেরকে আশাবাদী করে।ওরা পারলে আমাদের না পারার কোনো কারণ নেই। শুধু দরকার সদিচ্ছা আর উদ্যোগ। আর সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে আমাদের ঢাকাকেও নিশ্চয়ই একদিন দূষণমুক্ত, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর রাজধানি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আহা! এতোদিনে তেমনটি তো হয়েই যেতো যদি দেড়শো বছর আগে বুড়িগঙ্গাটা টেম্‌সের মতো উৎকট গন্ধ ছড়াতো।

বাই দ্য ওয়ে, টেম্‌স নদের এই দূর্গন্ধ ইতিহাসে ‘The Great Stink’ নামে পরিচিত। গা গুলানো তীব্র কোনো গন্ধকে স্টিংক্‌ বলা হয়। দূর্গন্ধ নির্দেশক আরও কিছু ইংরেজি শব্দ হলোঃ pong, stench, reek, ও niff। কিন্তু বাংলায় দূর্গন্ধের সমার্থক হিসেবে বদ গন্ধ, বোঁটকা গন্ধ, বিশ্রী গন্ধ, বাজে গন্ধ ইত্যাদি যুগল শব্দের বাইরে একক কোনো শব্দ মাথায় আসে না।

আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন কি? ইংরেজরা কথাবার্তায় বিরক্তি, হতাশা, ক্ষোভ কিংবা রাগ প্রকাশ করতে গিয়ে প্রচুর এফ-ওয়ার্ড বলে; এফ ওয়ার্ড মানে ওই এফ ইউ সি কে। হ্যাঁ, এই স্ল্যাংটার কথাই বলছি। জীবনের নানা ক্ষেত্রে বেশ ব্যাপক হারেই এই শব্দের উচ্চারণ হতে দেখা যায় ওদের মধ্যে। এমন নয় যে, অশিক্ষিত কিংবা স্বল্প-শিক্ষিত উদ্ধত কারও মুখেই এমনটি শোনা যায়, অত্যন্ত শিক্ষিত জনেরাও প্রচুর ব্যবহার করেন এই এফ-ওয়ার্ড। যেমন উত্তেজিত হয়ে কাউকে চুপ করতে বলতে গিয়ে  ‘শাট আপ!’ এর পরিবর্তে বলছে ‘শাট, দ্য ফা… আপ!’ তেমনি ‘ওয়াট ইজ দিস?’-কে  বলে ‘ওয়াট দ্য ফা… ইজ দিস?’।  ইন্টারভিউ কেমন হয়েছে- বন্ধুর এমন প্রশ্নের  জবাবে বলছে ‘আই ফা…ড আপ’, যার  অর্থ বুঝতে হবে ‘খুবই বাজে  হয়েছে’।

ব্রিটিশ পাবলিকের  আচার-ব্যবহার নিয়ে ২০০০ সালে প্রকাশিত Andrea Millwood Hargrave-এর  গবেষণায় এফ-ওয়ার্ডকে বহুল ব্যবহৃত অমার্জিত শব্দ সমূহের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে দেখানো হয়েছে (সূত্রঃhttp://www.ofcom.org.uk/static/archive/itc/uploads/Delete_Expletives.pdf)

0e222595_f-wordএ ধরনের ২৮টি শব্দের মধ্যে প্রথম আর দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে ‘কান্ট’ আর ‘মাদারফা…র’। সে যা-ই হোক, এই এফ-ওয়ার্ডের বাংলা অনুবাদ হিসেবে ‘চ’ দিয়ে শুরু দুই অক্ষরের যে শব্দটি পাওয়া যায় সেটি কিন্তু আবার বাংলাভাষি শিক্ষিতজনের ব্যবহারে তেমন লক্ষণীয় নয়। বরং একই ধরণের পরিস্থিতিতে ইংরেজ ভদ্রলোক যেখানে এফ-ওয়ার্ড বলে, সেখানে আমরা বড়জোর ‘বল’-এর ‘ব’-তে আকার যুক্ত করে বলে থাকি।  ইংরেজি কথোপকথনে বহুল ব্যবহৃত আরেক শব্দ ‘গড্‌ড্যাম’। গৃহকর্তা ঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছেন না ঘরের কোথাও, এমন সময় বিরিক্তি প্রকাশ করতে বললেন, ‘ওয়্যার ইজ মাই গড্‌ড্যাম ওয়াচ?’। এভাবে রাগ কিংবা বিরক্তি প্রকাশে স্রষ্ঠার নামকে কেনো জড়ানো হলো কে জানে। অন্যদিকে, আমরা বাংলাভাষিরা কিন্তু ওই পিউবিক এরিয়ার ওপারে যাইনা, যাই কি? এখন পশ্চিমের যৌনতার রুচিবোধে কিংবা ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক অনুমোদিত এফ-ওয়ার্কের বাণিজ্য থেকে আসা রাজস্বপ্রবাহের গোড়ায় এফ-ওয়ার্ড কী ভূমিকা রেখেছে না রেখেছে সেটা হিসেব করে নিশ্চয়ই বলা যাবে। তবে যৌনতা সংশ্লিষ্ট অমার্জিত শব্দের এহেন উচ্চারণের বাস্তবতা বিবেচনায় আমারা বোধ হয় একটু বেশিই ভদ্র। আমাদের গালি সম্ভার মোটেই সমৃদ্ধ নয়।

এখন ভাবনার বিষয় হলো, এরকম দুয়েকটা শব্দের কিংবা ঘটনার তুলনামূলক বিচারে স্বস্তির যে আয়োজন সেটাও কি আসলে এক ধরণের আত্মপ্রতারণা? DSCN7601এটি তো আর মিথ্যে নয় যে, আমাদের ছয় ঋতু, ফুল-ফল, আমাদের ভাষা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের মাটি, আমাদের কৃষি, পারিবারিক বন্ধন, গণমানুষের সংগ্রামী জীবনযাত্রা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো যেমন আমাদের জাতিসত্তাকে বর্ণাঢ্য করেছে, ঠিক তেমনি  আমাদের  রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজমান অসুস্থতা, অনিশ্চয়তা, জনগণের সেবকদের অর্থ-লালসা, আমাদের শাসন, বিচার, অর্থনীতি আর শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতা–সবই ক্রমশ ব্যাপকতর হয়ে উঠছে। এসব ভেবে ভেবে আমরা অস্থির হই। তখন আমরা কেউ কেউ স্বস্তির জন্য হাঁসফাঁস করি। এদিক ওদিক তুলনায় আরাম পাই। আবার কষ্ট পেলে, রেগে গেলে আমরা যদিও এফ-ওয়ার্ড ব্যবহার করি না, আমাদের কেউ কেউ ‘বল’-এর ব-তে আকার দিয়ে খিস্তি করি। তারপর আমরা সংকট নিরসনের উপায় খঁজি। দেশটাকে আমরা ভালোবাসি বলেই আরও সুন্দরের স্বপ্নগুলো মরে যায় না। আমাদের হতাশা, বিরক্তি আর অভিমানকে ছাপিয়ে আমরা আরও সুন্দর দিনের অপেক্ষায় দিন গুনি। রাত গুনি। ভাষণ শুনি। বেঁচে থাকি।

আমাদের ভালো যা কিছু আছে তা আরও ভালো থাক। আরও কিছু ভালো এসে যুক্ত হোক। সব ধরনের আবর্জনার প্রাদুর্ভাবমুক্ত হয়ে এগিয়ে যাক দেশটা। আরও উন্নত হোক আমাদের জীবন-যাপন।  আমাদের বিক্ষত নদ-নদীগুলো বেঁচে উঠুক। আমাদের সংস্কৃতি গৌরবে বেঁচে থাক।