ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

কাল রাতে বাড়ি ফেরার পথে শহরে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপক আয়োজন চোখে পড়লো। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বর্ণাঢ্য আয়োজনকে সামনে রেখে এমন তৎপরতা শুধু ময়মনসিংহে নয়, দেশের সবখানেই দেখা যায়। দেখতে ভালো লাগে। পরিচ্ছন্ন একটা শহর, রাস্তাগুলোর কোথাও কোনো ময়লার স্তুপ নেই, দেয়ালে দেয়ালে বর্ণমালা আর বায়ান্নোর’র রক্তঝরা দিনের স্মৃতি জাগানিয়া সব গ্র্যাফিটির ঝকমক– দেখলে ভালো লাগে। এরকম ঝকমকে শহরটিকে প্রতিদিন দেখতে ইচ্ছে করে।

21.031

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…’ –এই করুণ নিনাদ স্পর্শ করেনি বাংলাভাষী এমন কোনো বুক নেই। তবে শোক দিবস হিসেবে একুশের উদ্‌যাপনে যে গাম্ভীর্যটি ছিলো, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সেটি এখন আনন্দের সংযোগে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। তাই এখন একুশ শুধু ভাষা শহীদের রক্তে মাখা অহঙ্কারের নাম নয়, একুশ এখন উৎসবের দিন, আনন্দের দিনও বটে। একই সাথে একুশের চেতনার ধারক হিসেবে বাঙালির যাপনের জীবনে, উচ্চারণে বাংলা’র বেঁচে থাকা নিয়ে আফসোসও নিশ্চয়ই আছে।

পাঠকের আশঙ্কা দূর করতে আগেই বলে নিচ্ছি, আমি ভাই পাণ্ডিত্য ফলানোর লোক নই। বাংলা ভাষার সুন্দর এখনও অনেকটাই অদেখা, অজানাই আছে সেটা বেশ টের পাই। এমনকি এই লেখাতেও কিছু ভুল থেকেই যাবে যা আরও দু-চারবার পড়ে পরে ঠিক করতে হবে, জানি। তবে অনেকের মতো আমারও ফেব্রুয়ারিতে, বিশেষ করে একুশের দিনে, ভাষা বিষয়ক নানা কথা মনে পড়ে। বাংলার কথা, ইংরেজির কথা, আরবি-হিন্দির কথা ভাবতে ভালো লাগে। জাতীয় সঙ্গীত শুনে যেমন করে পিটির ক্লাস, প্রভাত ফেরি, ফুলটুল নিয়ে স্কুল লাইফের অনেকগুলো স্মৃতি জেগে উঠে, প্রায় ওরকম ব্যাপার আর কি। আজ সেসব নিয়ে গপ্পো করতে মন চাচ্ছে।

স্কুলেই শিখে নিয়েছিলাম ‘আরদুন’ মানে দুনিয়া, ‘মাউন’ মানে পানি, ‘সুক্কারুন’ মানে চিনি, ‘লাবন’ মানে দুধ—এরকম কমন কিছু আরবি শব্দ। হঠাৎ একদিন মাথার মধ্যে এক বিরাট চিন্তা ঢুকে গেলো। আরদুন মানে দুনিয়া, সুক্কারুন মানে চিনি। আবার আর্থ্‌ মানে দুনিয়া, শ্যুগার মানে চিনি। আমার মনে হলো, আরবির সাথে ইংরেজির একটা জম্পেশ যোগসূত্র আছে। কিন্তু প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট ভাষাজ্ঞান আমার ছিলো না। এখনও নেই। তবু এমন বেইজলেস সাইপোথিসিসে বিশ্বাস করতে ভালো লাগে।  সেদিন শুনি কোরিয়ান ভাষায় ‘টুপি’ মানে নাকি ‘মোজা’। শুনে মন খারাপ হয়ে গেলো। মাথার মুকুট শেষে ওরা পায়ে ঠেলে দিলো!

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে জন্মেছিলেন আমার দাদা। ম্যাট্রিকুলেশন দেয়া হয়নি তাঁর। ইংরেজি কিছু জানতেন, তবে সচরাচর ব্যবহার করতেন না। অনেকবারই তাঁকে ‘কেওয়স’ শব্দটি বলতে শুনেছি। এমনকি গ্রামীণ নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর অনেকেই এই শব্দটিকে ব্যবহার করে থাকেন ‘গণ্ডগোল’ বা ‘ঝামেলা’ অর্থে । একদম ঠিকঠাক অর্থ। zaki642_1392961029_1-ekush_121_55060কিন্তু ‘আইল(aisle)’ শব্দটির মতো সাধারণের বহুল ব্যবহৃত এই ‘কেওয়স’ (chaos)-ও যে ইংরেজি শব্দ তা কি আমি নিজেই জানতাম? এরপর বড়ো হয়ে আরও কতো ইংরেজিকে দৈনিক উচ্চারণে নিয়মিত করে নিয়েছি তার হিসেব নেই। তবে এতো বছরের উচ্চারণের ‘ইনভাইটেশন’ যে আসলে ‘ইনভিটেশন’ সেটা জানি। আগে আরও কতোসব ভুল উচ্চারণ করে যেতাম অনায়াসে ! একবার ক্লাসে ‘ঊন্‌ত্রিশ’ বলাতে স্যার ধমকে উঠলেন। আমি তো awe-তে থ। ওটাকে নাকি ‘ঊনোত্রিশ’ বলতে হবে। শৈশবে বাংলা ব্যাকরণে অমনযোগটাকে আগ্রহের সাথে বজায় রাখার ফলে ভুলের জের এখনও রয়ে গেছে, টের পাই। তবে এটাও বেশ বুঝি, নিজের ভুলের সম্ভাবনায় প্রবল বিশ্বাস না থাকলে বাংলা/ইংরেজির অনেক ভুল এখনও থেকেই যেতো। এই সংবেদনশীলতার কুফলে এখন অন্যের ভুলও (যেগুলো ভুল বলে বুঝতে পারি) চোখে টাস টাস করে লাগে।

বছর তিনেক আগের কথা। শ্রাবণের আকাশটা সেদিন সহসা কুচকুচে হয়ে ওঠলো। আর দুপুর না গড়াতেই চারপাশ আধাঁর করে বৃষ্টি নামলো। ঝুম বৃষ্টি। ঢাকায় তখন রাস্তার জলে ‘নৌকা চলে’ অবস্থা। আমি ময়মনসিংহে বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মোবাইলে এফ এম রেডিও শুনছি। গান চলছে। ফাঁকে ফাঁকে আরজে’র কথা শুনছি। ঢাকায় বৃষ্টির খবর international-mother-language-day-celebration-painting-graphicতার কাছ থেকেই শুনলাম। সপ্রতিভ, ভরাট গলায় বাংলা-ইংরেজির মিশেলে চমৎকার উচ্চারণ শুনতে ভালোই লাগছিলো। বাংলার সাথে ইংরেজি মিশিয়ে বলাতে আমার এ্যলার্জি নেই। আমার কথা হচ্ছে, যেটা বলবো সেটা ঠিক করে বলার চেষ্টা করবো। সে যাগ্‌গে। বিশেষ কারও মুখে বিশেষ কিছু শুনলে আমার বেশ মনে থাকে। যেমন আমাদের সাহারা খাতুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী থাকার সময় একবার  গার্মেন্ট্‌স শ্রমিকদের ‘লে-অফ’ হলো; তখন টিভি ক্যামেরার সামনে তিনি বারবার ‘লে-অফ’-কে ‘লে-আউট’ বলছিলেন, মনে আছে। তেমনি ওই আরজে’র একটা কথা এখনও মনে আছে, “বন্ধুরা এই বৃষ্টিতে নিশ্চয়ই রাস্তায় স্লিপ করার পসিবিলিটি একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না, কারণ এসময়ে রাস্তাঘাট বেশ স্লিপি হয়ে থাকে। সৌ, বি কেয়ারফুল ওয়েন ইউ আ ওয়াকিং ডাউন দৌজ স্লিপি রৌড্‌স।” আমার বুকটা ধক করে উঠলো। ব্যাপারটা অনেকটা ‘ওখানে যেওনা প্লিজ, ওখানে রাজ্যের প্যাঁক’-এর মতো লাগলো। আমি নিশ্চিত ওই ব্যাটা তখন ‘জনবহুল’-কে ইংরেজিতে  ক্রাউডেড না বলে ‘ক্রাউডি’ বলতো  কারণ ওই দুটো একই জাতের, একই পাতের ভুল। তো স্লিপারি রাস্তা যখন আরজের মুখে স্লিপি রাস্তা হয়ে যায়, তখন ঘুমের বড়ি না খেলেও যদি ঘুম ধরে তবে দেরী কেনো? সেদিন আমার সত্যিই ঘুম পেলো। বৃষ্টির সাথে আলস্যের সম্পর্কটা খুবই চমৎকার; শীতের সাথে কম্বলের মতো।

ল্যাংগুয়েজ ক্লাসে যেদিন বলা হলো, ‘টেইক এক্সাম মানে পরীক্ষা দেয়া’ আর ‘গিভ এক্সাম’ মানে পরীক্ষা নেয়া’, সেদিন সবাই দেখি অবিশ্বাসে কেমন থমকে গেলো। এ যেনো আজব কোনো কথা, কোনোদিন কেউ যেনো শোনেনি আগে। আমার ওই ঊন্‌ত্রিশের মতো অবস্থা। ভুলের অভ্যেস বহুদিনের হলে ছাড়তে মন সায় দেয় না। প্রেম বলে কথা। সমস্যা আমার নিজেরও কম নয়। ‘উঠে’ আর ‘ওঠে’ অথবা ‘কী’ আর ‘কি’-এর মাঝে কী ফারাক, কিংবা ‘পুরস্কার’ ঠিক আছে বাট ‘পরিস্কার’ কেনো ঠিক নেই –এসব তো সেদিনও জানা ছিলো না। যেগুলো এখনও জানার আছে, জানা হবে নিশ্চয়ই ক্রমে ক্রমে।

আগের অনেক কিছুই বদলে গেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘আমার ছেলেবেলা’র কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। কোনো এক ক্লাসে বাংলা পাঠ্যবইয়ে ছিলো। নেটে সার্চ দিয়ে পাওয়া গেলো সহজেই। দেখুন তো এটুকু, মনে পড়ে কিনাঃ “তখন আমাদের ঐ সময়টা কাটত চাকরদের মহলে । তখনও ইংরেজি শব্দের বানান আর মানে-মুখস্থর বুক-ধড়াস সন্ধেবেলার ঘাড়ে চেপে international_mother_language_day_image__4879985046বসে নি । সেজদাদা বলতেন আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি , তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন । তাই যখন আমাদের বয়সী ইস্কুলের সব পোড়োরা গড়গড় করে আউড়ে চলেছে I am up আমি হই উপরে ,He is down তিনি হন নীচে , তখনও বি-এ-ডি ব্যাড এম-এ-ডি ম্যাড পর্যন্ত আমার বিদ্যে পৌঁছয় নি ।” ইউরোপেও তখন এমনই ধারণায় বিশ্বাস ছিলো যে, শিশুর মাতৃভাষার জ্ঞানের ভিত্তি পাকা না হলে অন্য ভাষা শেখানো একদমই ভুল কাজ। রবীন্দ্রনাথ ওসব ধারণা দিয়ে প্রভাবিত হয়ে থাকবেন হয়ত, কারণ এখনকার  মতো তখনও ইউরোপিয় ধ্যান-জ্ঞানের প্রভাব শিক্ষিত সমাজে বেশ জোরালোই ছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিক অনেক গবেষণাতে এটা প্রমাণিত যে, মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষার গাঁথুনি সমান তালে এগিয়ে গেলে তাতে শিশুর ভাষা বিকাশে সমস্যা সৃষ্টি হবে বলে যে মিথ চালু ছিলো তার কোনো ভিত্তি নেই। একাধিক ভাষাকে যুগপৎভাবে শেখার সুযোগ শিশুর জন্য বরং এক আশীর্বাদ। একসাথে দুইটি কেনো, তিনটি শেখাতে পারলে আরও ভালো। এধরণের শিশুরা অন্য শিশুদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল হয়ে থাকে বলে জানাচ্ছেন গবেষকরা।

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আর শুধু বাংলাভাষীর পালনীয় দিবস নয়। আবার বাংলা ভাষা বাঙালির হলেও ইংরেজি এখন শুধু ইংরেজের ভাষা নয়। বিশ্বায়নের পৈতা লাগিয়ে ইংরেজি এখন সকলের ভাষা। তাই শুধু বাংলা নিয়ে অহঙ্কারে বুক ফুলিয়ে অন্য ভাষাকে দূর-দূর করে খেদিয়ে দেয়ার উচ্চাভিলাষ কিংবা বাংলায় (হোক সে বানানে বা উচ্চারণে) নিজের সম্পূর্ণতার সঙ্কটকে পাত্তা না দিয়ে শুধু ইংরেজি পকপকানি –কোনোটাকেই স্মার্ট মনে করবার সুযোগটি নেই। বাংলাভাষীর স্মার্টনেস প্রথমত বাংলায় ফলানো চাই। আমি বাঙালি, অথচ মোটামুটি বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলার সামর্থ্য আমার নেই, কিন্তু ইংরেজি আমি দারুণ পারি–এটা অসম্ভব নিশ্চয়ই নয়, তবে এটা নির্ঘাৎ চরম নষ্টামি, চরম ভণ্ডামি।

তবে আমার মনে হয় না নিজেদের এই ভাষাটিকে শুদ্ধভাবে বলতে-লিখতে পারার অক্ষমতা আমাদের অনেকদিন বয়ে বেড়াতে হবে। এটাতো মানতেই হবে, ইউনিকোডে বাংলা লেখার সুবিধা আর ফেইসবুকের মতো সোস্যাল সাইটগুলোর ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে বাংলা এবং ইংরেজি লেখার চর্চা এখন অনেক হচ্ছে দেশে। কাগজ-কলমের পাশাপাশি ফোনের বাটন বা পিসির কি-বোর্ড চেপে চেপে স্ট্যাটাস আপডেইটের নামে হলেও বাংলা, ইংরেজির যেটুকু অনুশীলন নিয়মিত হচ্ছে তাকে ইতিবাচক না ভাবা অন্যায়। আর এখন তো ইচ্ছে করলেই বাংলা/ইংরেজির বানান, ব্যাকরণ যখন যা যা দরকার তা গুগলে ঢুঁ মেরেই দেখে নেয়া যায়। এখন আমাদের পকেটে পকেটে ডিকশনারি। ভুলের হিসেব আমরা চাইলেই বদলে দিতে পারি।

21st_feb_commemoration

বাংলা হোক, ইংরেজি হোক কিংবা বংলা ইংরেজি মিশিয়ে হোক— শব্দচয়নে, বানানে শুদ্ধতার বিষয়ে সবার সচেতনতা বেড়ে উঠুক। রাজনীতিক, শিক্ষক, ছাত্র, ব্যবসায়ী, শিশুর অভিভাবক, রেডিও জকি, টিভির উপস্থাপক, সংবাদ প্রতিবেদক, রিসিপসনিস্ট, ডাক্তার, নার্সসহ সকল শিক্ষিত বাংলাভাষীর ব্যবহৃত ভাষাসমূহ (সে বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, কোরিয়ান, চায়নিজ, ফ্র্যাঞ্চ যা-ই হোক)  ক্রুটিমুক্ত হোক, শেখার মানসিকতা অটুঁট থাকুক, আর উচ্চারণের শুদ্ধতার সাথে মনের শুদ্ধতা ভালবাসায় মাখোমাখো হয়ে থাক— আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এইটুকু চাওয়া নিশ্চয়ই অতিশয় নয়।

.

.

.

তথ্যসূত্রঃ

সংযুক্ত ছবিগুলো গুগল থেকে নেয়া।