ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

পনেরো বছর আগের কথা। তখন ময়মনসিংহে এলিজাবেদ নামে একজন মার্কিন তরুণী কাজ করতেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ইংরেজি ভাষা কোর্সের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি কিছুদিন। সদালাপী, বন্ধুবৎসল এলিজাবেদ অল্প সময়েই তাঁর শিক্ষার্থীদের অসম্ভব প্রিয় হয়ে উঠেন। ক্লাসে তিনি প্রায়ই নিজের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতেন। তাঁর প্রিয় এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এই অভিজ্ঞতার গল্পটি শুনেছিলাম। গল্পের ঘটনা এই শহরেরই। এলিজাবেদ এক বাজারের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটে কোথাও যাচ্ছিলেন। বিদেশি কাউকে দেখলে অতি উৎসাহী বাঙালির আচরণ কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। যেমনটি হয়ে থাকে, কিছু অল্প বয়সী ছেলেপুলে তাঁকে উত্যক্ত করছিলো। ‘আই লাভ ইউ’, ‘আই কিস ইউ’, ‘হাই সেক্সি’ –এরকম যাচ্ছেতাই ইংরেজি বাক্যবাণের পাশাপাশি কেউ কেউ এটা ওটা ছুঁড়ে মারছিলো তাঁকে। এলিজাবেদ চেয়ে দেখলেন, দোকানে এবং রাস্তায় বয়োজ্যেষ্ঠ যারা ছিলো তারাও এই ডিস্টার্বেন্স-এর দৃশ্যে মজা পাচ্ছে, হাসছে। সাহায্য পাওয়ার আশা নেই বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে চাইলে এক পর্যায়ে পিছু নেয়া ছেলেগুলো তাঁকে প্রায় ঘিরে ধরে। এমন সময় হঠাৎ একজন টুপি-দাড়িওয়ালা মুরুব্বি এসে তাঁকে সেখান থেকে উদ্ধার করে পাশের মসজিদে নিয়ে গেলেন এবং তাকে ওখানে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে তারপর যেতে বললেন। শুধু তা-ই নয়, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য ওসব ছেলেদের হয়ে তিনি ক্ষমাও চাইলেন। লোকটি ওই মসজিদের ইমাম। মুসলমান সম্পর্কে টিপিক্যাল আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড়ো হওয়া এলিজাবেদ জানিয়েছেন, এই ঘটনা মুসলিমদের সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছে।  এই গল্পটির কথা যতোবার মনে হয় ততোবারই অবাক হই, ভালো লাগে।

কিন্তু এই ভালো লাগা মুহূর্তে মিলিয়ে যায় যখন সারা বিশ্বে ইসলাম ধর্মকে ঘিরে তৈরি হওয়া ষড়যন্ত্র, আতঙ্ক, মুসলিম সমাজের অনৈক্য, বিশ্বাসের ইতর বিশেষ, উচ্চাভিলাষ, অসতর্কতা ক্রমাগত এই ধর্মাবলম্বী শান্তিকামী সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বাস করি, এদেশে এখনও অসংখ্য ইমাম আছেন যাঁরা ওই ইমামের ঔদার্যকে বুকে ধারণ করেন, অসংখ্য হাফেজ, মুহাদ্দিস, ইসলামি চিন্তাবিদ আছেন যাঁদের উচ্চারণে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে, যাঁদের সংস্পর্শ অনেকের জীবনে হতে পারে বিরল আশীর্বাদ, যাদের যৌক্তিক কথাবার্তা শুনে উগ্র নাস্তিকও মুগ্ধ হয়ে বসে থাকবেন ঠাঁয়, কিন্তু হায়, তেমন কাউকে কি খুব দেখা যায়? আমার আফসোস্‌ এই দেখা না যাওয়াকে নিয়ে আর এর পরিবর্তে যা যা দেখা যায় তাকে নিয়ে।

কী কী দেখা যায় এতো বেশি তবে? সেসব নিয়ে বলবো, তার আগে একটি কথা বলার আছে। এ লেখাটা আজ চুপটি করে বসে থাকা ওইসব প্রচার বিমুখ, শুদ্ধ মানুষগুলোকে নিবেদন করতে চাই, যারা শুদ্ধতার আলো বুকে নিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন নিয়ত। ভুল শোধরানোর নামে বারবার ভুল হয়ে যাচ্ছে জেনেও নির্লিপ্তিকে বাঁচিয়ে রাখায় আর পতনের পথ চেয়ে থাকায় ফারাক কোথায়?

শোবার ঘরের জানালার পাল্লা থেকে কাচের চৌকোণা টুকরো একটি খসে গেছে মাঘের আগেই। ফলে রাতে শিরশিরে বাতাসের হুড়মুড় ছাঁটে ঘরের উষ্ণতা যথেষ্ট কমে গেলেও অক্সিজেনের সরবরাহ বেশ ভালোই ছিলো। কাছেই যে কাঁচা বাজারটা আছে, যার সামনের পাকা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একদিন এলিজাবেদের ওই অদ্ভূত অভিজ্ঞতা হয়েছিলো, ওখানকার ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে বিরাট ধর্মসভার আয়োজন করা হয়েছে। বাদ আছর থেকে পরদিন ফজর পর্যন্ত।  রাতভর ধর্মীয় আলোচনায় বক্তারা মাইক ফাটিয়ে দিয়েছেন।  আমার ভাগ্য ভালো, জানালাতে এই একটাই এয়ার পকেট রেডি ছিলো, আর কাকতালীয়ভাবে, ঠিক এদিকেই একটা মাইক সেট করা ছিলো। রাত যতো বাড়ছিলো, বক্তার কণ্ঠ ততো চড়ে যাচ্ছিলো। এক পর্যায়ে কথাবার্তা এমন দুর্বোধ্য কুঁদনে রূপ নিলো যে, আসলে কী বলা হচ্ছে তার অনুধাবন অসম্ভব। আমার মনে হলো, ওটা মনুষ্য কণ্ঠের সর্বোচ্চ মাত্রা পেরিয়ে ভিন্ন কোনো মাখলুকাতের সুতীব্র হুঙ্কার টাইপের কিছু একটা। পাশের ফ্ল্যাটে মাসখানেকের এক নবজাতক; ওর চিৎকার শুনা যাচ্ছিলো। আর হৃদপিণ্ডের অসুখে যারা ভূগেন তারা এমন উচ্চ মাত্রার শব্দে কতোটা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারেন তা আমার জানা নেই। মুসলিম হিসেবে আমি না হয় রাতভর ওয়াজের নামে এসব চিৎকার সয়ে গেলাম কিন্তু এই সভাস্থলের আশপাশে বসবাসরত কয়েকশ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী যাঁরা এই উচ্চ ডেসিবেলের আওয়াজে ঘুমুতে পারেননি, তাঁদের কাছে কেমন লেগেছে এই আয়োজন?

শঙ্করের বাড়ির পাশে একটি বড়ো মাদ্রাসা। ওখানে এবারও বিরাট ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিলো শীতের এক রাতে। এই শঙ্করকে আমি ভালো করে চিনি। গুজরাটের সেই বর্বরোচিত হামলা আর গত কুরবানি পরবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে গরু জাবাই ও গোমাংস ভক্ষণকে কেন্দ্র করে যা যা হয়েছে সেসবের বিরুদ্ধে তার অবস্থান আমাকে অবাক করেছে। এমন অনেকবার হয়েছে, একসাথে ডিনারে বসে আমি গরুর কালো ভূনা খেয়েছি, এই বাহ্মণ তখন শুধু সবজি আর ডাল দিয়ে খাওয়া শেষ করেছে, তাতে তার জাত যায়নি। সেদিন ওই মাহফিল থেকে বিখ্যাত বক্তা ওয়াজের নামে হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে যে কুৎসিত স্ল্যামিং করেছেন তার বর্ণনা শঙ্করের মুখে শুনেছি– অবাক হয়েছি; তার চেয়ে অনেক বেশি লজ্জা পেয়েছি। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য শুনার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, এরকমটি হয়, আগেও হয়েছে। অভিজ্ঞ, অপরিপক্ক, অসহনশীল ইসলামী বক্তার মুখে অমার্জিত ভাষায় ভিন্ন ধর্মের প্রতি এরূপ বিষেদগার নিশ্চয়ই পাঠকের স্মৃতিতেও নজিরবিহীন নয়।

ভিন্ন ধর্মের প্রতি তো বটেই,এরূপ অসহিষ্ণুতা, হিংসা-বিদ্বেষের কাদা ছুঁড়াছুঁড়ি এসব বরেণ্য (!) বক্তাদের নিজেদের ভেতরও কম নেই। অন্তর্জালে  এসবের শতশত উদাহরণ আছে। যেখানে জমায়াতের উদ্দেশ্য থাকে মানুষের আকীদাকে শক্ত করা, মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, সরল পথে জীবন যাপনের প্রেরণা দেয়া, সেখানে চলে নিজের বা নিজের মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অপচেষ্টা, অন্যকে হেয় করার হীন আয়োজন। এসব কতোটা মানায় আসলে? এখানেও পলিটিক্স, এখানেও দলবাজি? কোন্‌ মাওলানা কী কইলো, কী করলো, কী ভুল করলো— মূল আলোচনা ছেড়ে এসব অনর্থক অহম উচ্চারণ শুনার জন্য মানুষ ধর্ম সভায় যায়? একদিকে বানানো গল্পের (যেমন মনসুর হেল্লাজের ‘আনাল হক’ কাহিনী) খই, উগ্র সাম্প্রদায়িক, উস্কানিমূলক বক্তব্য, অন্যকে খাটো করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে এসবের প্রতিবাদস্বরূপ অন্য আরেক সভায় অন্য বক্তা কর্তৃক পাল্টা ঘৃণার বিচ্ছুরণে ভরপুর আলোচনা –এসব পরিহার করে এ ধরণের আয়োজনগুলোকে সাধারণের হিতার্থ সাধনের উপযোগী করা নিশ্চয়ই যায়, যায় না কি? এ কাজটি যাঁরা করতে পারেন, তারা কি এগিয়ে আসবেন?

সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক সব মিলিয়ে দেশে কতো ডজন ধর্ম বিষয়ক পত্রিকা নিয়মিত বের হয় তা আমার জানা নেই, তবে আট-দশটি পড়ে দেখেছি। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের দৈনন্দ্যিন জীবনে এসব পত্রিকা অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ–সন্দেহ নেই। সম্প্রতি এ ধরণের কয়েকটি পত্রিকায় ডাক্তার জাকির নায়েককে নিয়ে গুরুতর অভিযোগ দেখলাম। তাঁর এখানে ভুল, ওখানে ভুল, তিনি মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন এই বলে-সেই বলে, কী কী কারণে তাঁর ওয়াজ শ্রবণ করা গোনাহের সামিল ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব পড়ে নতুন করে কনফিউসন তৈরি হয়েছে আমার। নিজে আলেম না হলে কী যে মুশকিল তা অনালেম ছাড়া কেউ বুঝবে না। আচ্ছা, জাকির নায়েক নিশ্চয়ই অতিমানুষ কেউ নন, তিনি  যা বলছেন তার সব সহিহ্‌ না-ও হতে পারে। তিনি যদি ভুল বলে থাকেন, মানুষকে বিপদগামী করে থাকেন তাহলে সেটা তাঁকেই জানানো হোক। তাঁকে তলব করা হোক বা ইমেইলের মাধ্যমে তাঁর সাথে যোগাযোগ করে এসব অভিযোগের ব্যাপারে তাঁর এবং অন্যদের বক্তব্য রেকর্ড করা হোক। তারপর সেটিকে জনগণের চোখের বা কানের উপযোগি করে উপস্থাপন করা হোক। পাবলিক সত্যকে জানুক। কিন্তু এভাবে বাতাসে ঠুসঠাস করে কী উপকার হচ্ছে রে ভাই?

‘আযানের সুর আমার ভালো লাগে। তবে কিছু আযান আছে বেসুরো। মাইকে কর্কশ শোনায়’– এরকম কোনো মন্তব্যের জবাবে মন্তব্যকারীকে গালি না দিয়ে বেসুরো আযানের মুয়াজ্জিনের পরিবর্তে সুন্দর কণ্ঠে আযান দিতে পারে এমন কাউকে নিয়োগের কথা ভাবা যায় কি? আযানকে একজন ‘শব্দ দূষণ সৃষ্টিকারী’ আখায়্যিত করলো। তাকে আযানের একটা সিডির সাথে ‘শুনে দেখুন তো সত্যিই কতোটা দূষণ ঘটায় এটা’—লিখে পাঠিয়ে দিলে প্রতিবাদের ভাষা কি মরে যেতো? মুরতাদ, কাফের বলে গালি দিয়ে কতোটা সমাধান সম্ভব? আমরা স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে সমালোচায় নিয়ত মুখর থাকি, আর একজন দ্বীন প্রদর্শক, সম্মানিত ইসলামি চিন্তাবিদ যখন স্বগোত্রীয় আরেকজনের বা আরেক ধর্মের নামে প্রকাশ্যে নিন্দায় লিপ্ত হন তখন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুললে কি সাধারণ মানুষের বেয়াদবি হবে?

 ।

সাধারণ মুসলিম হিসেবে আমাদের পরস্পরের মধ্যে বিভেদ থাকতে পারে। আমাদের জ্ঞানের সংকীর্ণতা থাকতে পারে। আমরা আমাদের নিজেদের ফ্যাসাদ দূর করতে বিজ্ঞ আলেমদের দ্বারস্থ হই। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের কাছে পরামর্শ কামনা করি। আমরা শিখতে চাই উদারতা, সহনশীলতা। বিদ্বেষের বিষবাস্প থেকে দূরে থেকে, নিজের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আরও পরিশুদ্ধ হতে চাই যাঁদের প্রত্যক্ষ প্রেরণায়, তাঁদের পরস্পরের মাঝে দ্বন্দ্ব, দূরত্ব আর আক্রমণ প্রবণতা দেখে আমরা শেষ পর্যন্ত কী শিখি?

“অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!
“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!

গিরি-সংকট, ভীরু যাত্রীরা, গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ
কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
‘করে হানাহানি, তবু চল টানি’, নিয়াছ যে মহাভার!”

(নজরুলের কবিতাঃ কান্ডারী হুঁশিয়ার)