ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বনশ্রীর ঘটনায় এখন অবধি যা যা তথ্য র্যাবের মাধ্যমে মিডিয়াকে জানানো হয়েছে তাকে আজগুবি না মনে করার কারণ নেই কারণ মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তো বটেই, সাধারণ ভাবনাতেও যৌক্তিক ভিত খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তবে যেহেতু তদন্ত চলছে, এ নিয়ে হাইপোথিসিস অনুচিত। সময়ে সব জানা যাবে নিশ্চয়ই। তবে মা/বাবা কর্তৃক শিশুর উপর এ ধরণের ভয়ঙ্করতম নৃশংসতার ব্যাপারে বিজ্ঞজনের মতামত পড়ছিলাম একটি দৈনিকে। সবাই খুব ভালো বলেছেন। বিস্তারিত জানতে রিপোর্টটি পড়ে দেখতে পারেন। এখানে আমি ওই রিপোর্ট থেকে কয়েকজনের মতামত তুলে ধরছিঃ

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারপারসন মোঃ এমরানুল হক বলেছেন, “বাবা-মা এবং সন্তানদের আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা নিজেদেরকে নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি।”

ভোগতান্ত্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে তাল মেলাতে মানুষ হিমসিম খাচ্ছে যেখানে আরও বেশি অর্থোপার্জন করাটাই মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধ এবং দায়িত্ববোধ।” তিনি আরও বলেন, “এটি আমাদের মাঝে অস্থিরতা তৈরি করছে এবং সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করছে। প্রায়শ শিশুরা সমাজের এরকম ভারসাম্যহীনতার শিকার হচ্ছে।”

মোহিত কামাল মনে করেন, চারপাশের সামাজিক অবস্থা এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানও এ ধরণের নেতিবাচক পরিবর্তনের জন্য দায়ী। টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দেখানো সম্পদের সমারোহ, কিংবা প্রতিবেশীর অর্থনৈতিক উন্নত অবস্থার সাথে নিজের দুরাবস্থার তুলনা করে মানুষ হতাশায় আক্রান্ত হয়।” তার মতে, আক্রান্তজন নেতিবাচক চিন্তা করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তার চিন্তা ও সিদ্ধান্তগুলো বিষণ্নতা দিয়ে প্রভাবিত হয় যা পরবর্তিতে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়।

মেহতাব খানম মনে করেন, অসুখী দাম্পত্য জীবন প্রায়শ বিষণ্নতার জন্ম দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই সন্তান তার বাবা বা মায়ের  মানসিক চাপের শিকার হয়। সমাজ বা রাষ্ট্রের কোথাও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে গূরুত্ব দেয়া হয় না উল্লেখ করে তিনি এসব বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার উপর জোর দিয়েছেন।

সেইভ দ্য চিল্ড্রেনের ‘চাইল্ড প্রোটেকশন’-এর পরিচালক  লায়লা খন্দকার বলেন, মূল সমস্যাটা হলো আমরা অনেক সময় শিশুদেরকে আমাদের নিজেদের সম্পত্তি জ্ঞান করি, মানুষ নয়।”

একটু আগেই প্রাজ্ঞ ব্লগার জাহেদ-উর রহমান ভাইয়েরলেখাটি পড়লাম, যেখানে তিনি অগ্নিদগ্ধ সুমাইয়ার প্রতি প্রতিবেশীদের অমানবিক আচরণকে আত্মকেন্দ্রীকতা জনিত নৃশংসতা হিসেবে দেখিয়েছেন, যা সত্যিই সামাজিক কাঠামোর ভঙ্গুরতার ইঙ্গিতবাহী। তিনি লিখেছেন, “মাঝে মাঝেই দেখি, মিডিয়ায় এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় অনেক ‘সচেতন’ মানুষ সমাজের এই মর্মান্তিক পরিবর্তনে অবাক হন; আমি অবাক হই না। আমি জানি যে সমাজ উন্নতি বলতে বোঝে যেভাবেই হোক অঢেল টাকা বানানো, আলিশান গাড়ি বাড়ি করা, ইউরোপ আমেরিকায় ছুটি কাটানো; যে রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা আমাদের জানান দেশ উন্নত হচ্ছে, তার প্রমাণ আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে, দেশে সেতু, ফ্লাইওভার হচ্ছে, কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই সমাজে ক্রমাগত বেড়ে চলা বৈষম্য নিয়ে, সেই রাষ্ট্রে, সেই সমাজে নিরন্তর বেড়ে চলে মানুষের অবদমন, আর তাই এরকম ঘটনা একেবারেই ভবিতব্য। সাথে ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়ার’ মতো ‘সামাজিক’ মাধ্যমগুলো তো আছেই, যার মাধ্যমে আত্মকেন্দ্রীকতার (নার্সিসিজম) চর্চা হয় প্রতি মুহূর্তে। বিদ্যমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় আর সব প্রবৃদ্ধির মতো মানুষের আত্মকেন্দ্রীকতা, নির্মমতা, নৃশংসতার প্রবৃদ্ধি হবে আরও অনেক বেশী হারে।” 

সবার কথাতেই বেশ সাযুজ্য দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ ক্ষত কোথায় কোথায় তা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো এসব ক্ষত সারবে কী উপায়ে? জানতে ইচ্ছে করে। ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজিস্টের সংখ্যা লাখো কোটি গুণে বাড়িয়ে বাড়ি বাড়ি, ঘরে ঘরে সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করলে সেরে যাবে?