ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

“শোনেন, আপনার বাবা মুক্তিযুদ্ধে তাঁর মায়ের আঁচলতলে লুকিয়ে ছিলেন, যুদ্ধে যাননি। তিনি ভীরু ছিলেন। আর তিনি যে সরকারী চাকুরে হয়েও, সুযোগ থাকা স্বত্ত্বেও অসৎ রোজগার মানে চুরি করেননি এটা তার সততা নয়, এটা তার ভীরুতার প্রমাণ, কারণ চুরি করতে গেলে সাহস লাগে। আমার বাবার সেটা আছে। আর এই চুরি তো তিনি একা করছেন না, তার বস করছেন—সেখান থেকে তিনি তার ভাগ পাচ্ছেন। এটা জাস্টিফাইড। এই চুরি, থুড়ি, এই কাজের জন্য কাউকে চোর বলা মূর্খতা। কিন্তু দেখুন, আপনার ভীরু বাবার অন্যায়টা কতো ভয়াবহ—তিনি ফাকিস্তানি ক্রিকেট টিমের সমর্থক। ফাকিস্তান দল খারাপ খেললে তাঁর আঁতে লাগে। যেই পাকিস্তান আমাদের এতো বড়ো সর্বনাশ করেছে, ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত শুষে নিয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের এতো ক্ষতি হয়েছে, তাঁদের দেশের ক্রিকেট টিমকে সমর্থন দেয়া মানে সেই দেশ কর্তৃক একাত্তরে যতো অন্যায়, অত্যাচার হয়েছে সেসবকে সমর্থন দেয়া। অতএব তিনি রাজাকার। তিনি যতোই সৎ হন না কেনো আর আপনি যতোই তার সততা নিয়ে গর্ব করুননা কেনো, তিনি পাকিদের দোসর। এই অপরাধ তার সততাকে ম্লান করে দেয়, তাকে রাজাকার করে একাকার করে দেয়।”

ধরে নিই, উপরের কথাগুলো একজন সচেতন নাগরিকের উপলব্ধী। বিষয়টিকে আবোল-তাবোল ভেবে ইগনোর করার উপায় নেই। কারণ আমাদের দেশপ্রেম এখন নতুন রূপে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে ক্রমশ। এ দেশে এ কে খন্দকারের মতো, কাদের সিদ্দিকীর মতো ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধে বিশাল অবদান রেখেও রাজাকার খেতাব(!) পেয়ে যান। সুতরাং পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সমর্থক, তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে থাকলেও রাজাকার, না থাকলে তো আরও। এখানে একটি বিষয় খুবই ইন্টারেস্টিং, আপনি ইন্ডিয়ার সমর্থক হলে কিন্তু ব্যাপারটি এতোটা ভয়াবহ নয়, কারণ ইন্ডিয়া আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। ইন্ডিয়া কতো রকম ভাবে আমাদেরকে বাঁশ দিচ্ছে, সেটা বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা হলো মুক্তিযুদ্ধে মিত্র শক্তি হিসেবে ইন্ডিয়াকে যেভাবে কাছে পেয়েছি তার প্রতিদান হিসেবে সকলে মিলে কিছু বাঁশ না হয় খেয়ে গেলাম। কিন্তু তাই বলে ফাকিস্তান? হোক না সেটা ক্রিকেট টিমের ভালো লাগা। পাকিস্তানি যা যা যারই ভালো লাগবে তাতেই সে রাজাকার, কারণ ত্রিশ লক্ষ শহীদের শক্তে ভেজা এই বাংলার ইতিহাস যে প্রত্যক্ষ করেছে কিংবা পড়েছে, সে যদি বাংলায় জন্মে থাকে, তার যদি বিন্দুমাত্র দেশপ্রেম থাকে, তবে সে ফাকিস্তানের কোনো কিছুকেই সমর্থন করতে পারে না।

বিষয়টি আরও ইন্টারেস্টিং লাগলো গতকাল যখন একজন সম্মানিত বয়োজ্যেষ্ঠের সাথে কথা হচ্ছিলো। এই বয়োজ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোণায় সমুখ সমরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের একনিষ্ট ভক্ত, বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে যেদিন জিতলো সেদিন তিনি খুশি হয়েছেন এই ভাবে যে, তার প্রিয় দলকে বাংলাদেশ হারাতে পেরেছে। তিনি পাকিস্তানি আতর ব্যবহার করেন—তার ছেলের কাছ থেকে শুনেছি। তাঁর টেবিলে একটা কাঁচি দেখলাম (যেটা দিয়ে তিনি দাড়ি ছাঁটেন) তাতে মেইড ইন পাকিস্তান লেখা। আমার মনে পড়লো, আমার স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় ডাক্তারের ট্রেতে যেসব সার্জিক্যাল টুল্‌স দেখেছি সেগুলোতেও পাকিস্তান লেখা ছিলো। ওই ডাক্তার কি পাকিপ্রেমী? আর আমাদের সন্তান? এমনটি ভেবে আমি ওই মুক্তিযোদ্ধা আঙ্কেলকে বললাম, আপনি তো রাজাকার হয়ে গেলেন। তিনি স্মিত হাসলেন (আমি ভেবেছিলাম রেগে উঠবেন)। বললেন, ‘হ্যাঁ, এখন তো রাজাকার খেতাব আমাদের চেয়ে আরও বড়ো বড়ো অনেক মুক্তিযোদ্ধার কপালেও জুটছে, আমারে রাজাকার কইলে অবাক হওয়ার কিছু নাই।’ তিনি জানালেন তাঁরা ছয়জন বন্ধু একসাথে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যাঁদের সবাই পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের ভক্ত। কিছুদিন আগেও একসাথে প্রিয় দলের ম্যাচ দেখেছেন। আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম, এঁরা তো জবর রাজাকার; পুরো রাজাকার বাহিনী।

কোনো দেশের ক্রিকেট টিমপ্রীতি আর সেই দেশপ্রীতি বা সে দেশের দ্বারা সংঘটিত অন্যায়ের প্রতি সমর্থনকে কি আমরা অতি আবেগে এক করে দেখতে শুরু করছি? প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, ক্রিকেট আমার প্রিয় খেলা নয়। বাংলাদেশের ম্যাচ থাকলে দেখি মাঝে মাঝে, এবং আমাদের টাইগারদের পারফর্মেন্স ভালো হলে ভালো লাগে, খারাপ হলে খারাপ লাগে। তবে আমার একটা বিষয়ে অবাক লাগে, যখন দেখি পাকিস্তান টিমের সমর্থক কাউকে পাকিস্তানপ্রেমী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমি বিশ্বখ্যাত এমন বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট ব্যবহার করি, এদের কোনো কোনোটা ইসরাইলি। তার মানে আমার কি ‘গাজায় ইসরাইলি হামলা’ সমর্থন করা উচিত? মোদি সাহেব চমৎকার করে কথা বলেন, আমার ভালো লাগে। বিব্রতকর প্রশ্নের মুখেও নিজেকে তিনি যেভাবে স্থির রেখে কথা বলেন, এটা এক অনুকরণীয় গুণ জ্ঞান করি। গুজরাটকে তিনি যেভাবে উন্নত করে তুলেছেন সেটা জেনে আমার ভালো লেগেছে। তার মানে কি তাঁর প্রত্যক্ষ মদদে যে হত্যা হয়েছে গুজরাটে তাতেও আমার সমর্থন আছে? আমার কয়েকজন বন্ধু আছেন যাদের বাবারা রাজাকার ছিলেন, যদিও তাঁদের নামে নথিভূক্ত কোনো অভিযোগ নেই বলে শুনেছি। এরা আমার স্কুল লাইফের বন্ধু। এদেরকে এখন আমি শত্রু বানাবো? সংবিধানে এমন আইন কি শীঘ্রই হবে যেখানে রাজাকারের সন্তানদেরকে রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অধিকার থাকবে?

তবে যে যাই-ই বলুন দেশপ্রেমের চর্চায় একটু আবেগের বাড়াবাড়ি থাকতেই পারে, যুক্তিটুক্তি না মিলুক। ক্রিকেটকে ঘিরে এই যে বাঙালির এক হয়ে যাওয়া এটা এক বিরাট প্রশান্তির প্রাপ্তি। কিন্তু ভাই, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে কিংবা নিজের পরিবারে, প্রিয় প্রতিবেশে দেশের শত্রুর চেহারা রেখে এই দেশপ্রেম কতোটা জাস্টিফাইড হয়? একজন পাকিস্তান টিমকে সমর্থন করে বলে তাকে রাজাকার বলার মধ্যে দেশপ্রেমের আঁচ যথেষ্টই আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু তার পাশাপাশি হতে পারতো না কি এমন যে, অবৈধ রোজগারকারীর দেশপ্রেমিক সন্তান বাবার/মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, “বাবা/মা, আর নয় এসব। তোমার সন্তান হিসেবে নিজেকে ভাবতে ঘেন্না হয়; এসব ছেড়ে দাও। আমিও বলতে চাই গর্ব করে, ‘আমার বাবা/মা চোর নয়, দেশের শত্রু নয়”? এতে কাজ না হলে এরপর একদিন শাহবাগে ব্যানার-ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে গেলো কয়েকশ সন্তান, যাদের দাবী, “জনক/জননী, আমাদের লজ্জা ঘুচিয়ে দাও, নয়তো ভুলে যাও।” বিশ্বাস করতে ভালো লাগে, সিনথেটিক ট্রেন্ডি উন্মাদনার অসাস্থ্যকর বাতাসে নয়, বুকের শোনিতে, সততায় সত্যিকারের দেশপ্রেম বেঁচে থাকবে প্রাণে প্রাণে। দুর্নীতি সাফাই অভিযান শুরু হবে প্রজন্মের হাতে। আমাদের সন্তানেরা বুক ফুলিয়ে বলে ওঠবে “আওয়ার পেরেন্ট্‌স আর নট থিভ্‌স। উই আর প্রাউড অব হ্যাভিং অনেস্ট পেরেন্টস।”