ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

দৈনিক দৌড়-ঝাঁপ আর নানাবিধ চাপ জীবনকে যেভাবে জাপটে ধরে আছে, তাতে ভালোবাসার ওজন এবং উষ্ণতা—দুটোতেই খুব প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এর মাঝেই আবার ধপাস করে গরম পড়ে গেলো। কাজে-কামে, জ্যামে-ঘামে উষ্ণতা যেনো লাভা হয়ে গড়াচ্ছে। এটা LOVE-এর LAVA । ক’দিন পরে কী হবে কে জানে? ভোগের আর ভাগের তল্লাটে বর্তমানের সিরিয়াস সব ঝামেলা সামলে তারপর আবার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববার টাইম কই? বহুমাত্রিক চাহিদার ডামাডোলে জীবন যদিও বাঙময়, অস্থিরতা শুধু যাপনের চৌকাঠেই থেমে নেই— সবখানেই কম-বেশি দৃশ্যমাণ। এই যেমন ধরুণ এবারের ইট্টুসখানি শীত। জাস্ট এলো আর গেলো। অথচ কয়েক বছর আগেও একুশের ভোর ছিলো কুয়াশায় সাদা সাদা। কেমন বদলে গেছে দিন, দেখলেন তো? প্রকৃতিতেও নাকি Hegemony-র আছর এখন। গ্রীষ্মের দাপটে বাকি পাঁচ ঋতুর অস্তিত্ব এখন বারোটায়, মানে বিলুপ্তপ্রায়। ফাল্গুনের কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই বিকেলের বাতাসগুলো কেমন পালিয়ে গেলো! বসন্তের ফুল এতোদিনে আমগাছে। কোকিলের গলায় প্রবলেম। আমাদের আবার গলা ঠিক আছে। তবে বলাতে কিঞ্চিৎ সমস্যা থাকলে থাকতে পারে।

আউটডোরে তৃষ্ণায় জান যায় প্রায়। জীবনের স্বাদ ক্যানে-বোতলে; হাতে-হাতে, ব্যাগে-ব্যাগে। আইসক্রিম পার্লারে শান্তির 51038-08icecreamনাম ‘কালো অরণ্য’ (ব্ল্যাক-ফরেস্ট), ‘দেবতামৃত’ (এম্ব্রোসিয়া) ইত্যাদি ইত্যাদি। আহ্‌! হ্যাপিনেস ইজ চাতালের তলে, অরণ্যে-পাহাড়ে। টেবিলের এপাশে ভ্যানিলা, ওপাশে কি চকোলেট নাকি স্ট্রবেরি? ওদিকে ডিওডোরেন্টে, পারফিউমে, ক্রিমে লোশনেও বৈচিত্র্য চাই। তবে ভুলে গেলে চলবে না, পারসোনালিটির পরিচয় কিন্তু এখন এসবের ফ্লেবারে, ব্র্যান্ডে মেলে। এসবই কনজিউমারিজমের দান। এই দানের বানে আইসক্রিমে, সেন্টেচুলের ছাঁটেখাবারের প্লেটে, জুতায়, জামায় যেভাবে ফিনকি দিয়ে ব্যক্তিত্ব বেরুচ্ছে, তাতে করে উচ্চারণ আর আচরণের ভাগে বুঝি আর কিছু রইলো না। এখানেও ঋতুরূপ দাপটের খেলা রে ভাই, কই যাই, কই যাই?

একবার ঘটলো এক টস্কি লাগা ঘটনা। ভরা ক্লাসে এক শিক্ষার্থি ডেকে উঠলো, “ওই মিয়া, স্যার!” আমি বোর্ডে কিছু লিখছিলাম, নিশ্চয়ই আমার ডিস্ট্র্যাকশন আন্দাজ করে ওরকম করে ডেকেছে। “ওই শালা” তো আর ডাকেনি। ভেবে দেখলাম, অনুচিৎ কিছু নেই। সম্বোধনে ফিউশন চলছে। গানে তো সেই কবেই শুরু হয়েছে। তাছাড়া, হ্যালো’কে একটু leg-with-stitchesইনফরমাল করে বাংলায় বললে তো “ওই মিয়া’ই” হয়, তাই না? ব্যাপার নাহ্‌। টেনশনটা আসলে অন্যত্র। আমাদের দে-দে-খাই-খাই নিয়ে হৈচৈ, মারামারিতে ওদের পোয়াবারো হয়। ওদের বলতে ওদেরকেই বুঝায়। ওরা আমাদের রুচির বিধাতা। আমাদের কী-কেনো-কীভাবে-কখন-কোথায় সংক্রান্ত সব চিন্তা ওদের। আমাদের শুধু কতো’র চিন্তা। মাল ফেলো, মাল নাও। ওদের নিজেদের মধ্যেও মারামারি হয়। যেমন টিভির বিজ্ঞাপনে একটাতে “মাস্টার সাব, কী ঢেউটিন কিনুম?”, আরেকটাতে “অতো বোকা হইয়ো না, ঘরের টিন পরের কতায় কিন্নো না।” আবার এদিকে “ঠাণ্ডার নাম …টুট…টুট”, ওদিকে “ঠাণ্ডার আবার নাম কী, তৃষ্ণায় চাই … টুট…টুট”– এই রকম আর কী। এতে কর্পোরেট কার্টেসির খেলাপ হয় না। হোক বা না হোক, ওদের কামড়া-কামড়িতে আমাদের কী? আমরা পণ্য কিনি, ধন্য হই।  ওসব দেখে আমাদের লাভ নেই। তবে স্বভাবে নিন্দুক না হলে আপনাকে বলতেই হবে, বিজ্ঞাপনগুলো ভীষণ ইনফরমেটিভ। পাশাপাশি বিনোদনও হয়। দেখতে ভালোই লাগে। ওদিকে ক্যাব্‌ল সার্ভিস প্রোভাইডারের চ্যানেলে তো নওজোয়ানি সালসার এ্যডও দেদারসে চলে। আর সে কী রসালো বর্ণনা! ডিজিটাল। মানে আগে মফস্বলের বাজারে সর্বরোগের মহৌষধের যেসব লাইভ লেকচার হতো গোল গোল জটলায়—ওগুলোর ডিজিটালাইজেশন হয়েছে। স্কুলের পরীক্ষায় রচনার বিষয় হিসেবে ‘ইয়োর ফেইবারিট টিভি এ্যড’, মন্দ নয়।

এরকম অনেক বিষয়ই আমাদের প্রিয় তালিকায় উঠে আসে, ঝোপ-ঝাড় বাঁধে; আমরা জঙ্গলে মঙ্গল খুঁজি। হত্যার বিবরণে আঁৎকে উঠার ভাণ করি, মনে মনে ঠিক জানি, নিষ্ঠুরতা কতোটা ফেইবারিট। আসক্তির কিছু বিরাম হলে, আমাদের কারো কারো সম্বিত ফেরে। আমরা তখন দূর কৈশোরের প্রিয়তম কোনো সময়ের কথা ভাবি। ওইসবের snapshot20160301214745লস্টাল্‌জিয়া গভীর কোনো ক্ষতের উপর আরাম বুলায়। গভীর এবং অস্থির কোনো রাতের বাতাস খিড়কির ফাঁক গলে যদি ছাতিমের, কদমের ঘ্রাণ নিয়ে আসে, তবে তাকে প্রিয় ভেবে বুকে জড়ানো যায় নিঃশ্বাসে। কতোগুলো গল্পের খই শুধু ফুটে উঠতে পারলো না বলে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। কিংবা চোখগুলো জেগে জেগে রক্তিম আর ঘোলাটে। আমাদের হাতগুলো খসখসে হয়ে যায়। কেউ কেউ কতোদিন আকাশ দেখি না! বারান্দায় কোনো কোনো সন্ধ্যায় এক কাপ চা ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে থাকে। আমদের মুখে রা নেই। অথচ প্রতিদিনই গলা টিপে হত্যা করি কয়েকশো নবজাতক শব্দ। আমরা হন্তারক। আমরা চোখ মেলে বসে থাকি, কিন্তু দেখিনা। আমরা বিশ্বাস কিনে খাই। ভালোবাসা কিনে খাই। স্বপ্নও কিনে খাই। আর চোখ বন্ধ করে করোটির ভেতর সুন্দরের চাষ করি। হ্যাডফোনে কান পেতে শুনিঃ “দম নিতে নিতে ভাবুন, এপার ওপারের অফুরন্ত প্রাণশক্তি আপনার ভেতর প্রবেশ করছে। আর দম ছাড়তে ছাড়তে ভাবুন, শরীর ও মনের যতো দূষিত পদার্থ আছে সব বের হয়ে যাচ্ছে, আর আপনি পরিপূর্ণ সুস্থ ও সুখী হয়ে ওঠছেন। ধীরে ধীরে দম নিন, ধীরে ধীরে দম ছাড়ুন। আর মনে মনে বলুন, ডে বাই ডে, ইন এভরি ওয়ে, আই এ্যম গেটিং বেটার এ্যন্ড বেটার। ডে বাই ডে, ইন এভরি ওয়ে, আই এ্যম গেটিং বেটার এ্যন্ড বেটার।”

ছবিঃ অন্তর্জাল থেকে।