ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

কোনো কোনো বৃহঃস্পতিবার রাতে, যখন পাড়ার প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, এই লোকটার গলা শোনা যায়। আমি তাকে দেখিনি। ওপাশের পথ দিয়ে তার চলে যাওয়া টের পাই। তার একটানা গালাগালির মাতাল শব্দ রাতের নৈঃশব্দকে স্যাঁতস্যাঁতে করে দেয়। আমি নিঃশব্দ ঘর থেকে কান পেতে রই, লোকটার ওসব অমার্জিত উচ্চারণের হেতু বুঝতে চেষ্টা করি। কার প্রতি তার এতো ক্ষোভ? নাকি এসব নেশার আবেশটা যথাসম্ভব এনজয় করার চেষ্টা মাত্র? লোকটার খিস্তিগুলো শুনতে বেশ লাগে। এতো বিচিত্র গালি সম্ভার ছড়িয়ে দিয়ে লোকটা কতো দিন এদিক দিয়ে হেঁটে গেছে, অথচ আমি তার নাম জানি না।

DSCN8591

সাত সকালে জানলা খুলতেই অদ্ভুত এই ফুলের ঘ্রাণ ধেয়ে আসে। পাশের বাড়ির উঠোনে একহারা গড়নের গাছটা। দেখি সাদা সাদা ফুলের থোকায় মৌমাছি বেশ মৌজে আছে, বেশ কয়েকটা; ওদের উড়বার কথা, কিন্তু গড়াচ্ছে। কাজ ফাঁকি দিয়ে ঘ্রাণ গেলার তাল আর কি। মাঝে মাঝে, লম্বা লেজওয়ালা একটি পাখিকে দেখা যায়–গাছের লালচে ফলগুলো খায়। এই ফুল কয়েক বছর থেকে দেখছি। কিন্তু কি আশ্চর্য! এই ফুলটির নাম জানি না। ফুলগুলো খুব দ্রুত ঝরে যায়। ওদের জন্য মায়া হয়।

.

এমনি অনেকের/অনেক কিছুর নাম-পরিচয় তেমনভাবে জানা নেই/মনে নেই। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়। যেমন আরসিবিসি মানে যে Rizal Commercial Banking Corporation–সেটা ঠিকই জানা আছে। বিশিষ্ট ফিলিপিনো ব্যবসায়ি কিম ওয়ং চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে আছেন। তার অসুখ কবে সারে কে জানে? সিনেটর সেরগে ওসমেনা আবার ওয়ংকে সিরিয়াস সন্দেহ করে বসে আছেন। দুজনের জন্যই মায়া হয়। ব্যাংক ম্যানেজার মায়া সান্তোস-দেগুইতো’র জন্য মায়া হয়। বেচারি শেষমেষ বোধ হয় ফেঁসেই গেলেন। আমাদের টাকা, আর কতো দেশের লোকের কতো টেনশন! জোহা’র জন্য মায়া হয়। চিনতে না চিনতেই লোকটা যেনো হারিয়েই গেলো। কোথায় গেলো তা জানতে ইচ্ছে করে। আতিয়ার সাহেবের জন্য খারাপ লাগে, চলে গেলেন বলে। যদিও অর্থমন্ত্রী দয়া করে থেকে গেলেন, তাঁর জন্যও দুঃশ্চিন্তা হয়। বড্ড মায়া হয়। এ বয়সে এরকম আউলা-ঝাউলা অবস্থার মধ্যে তাঁর ঘুমটুম ভালো হওয়ার কথা নয়। টাকা নিলো সিঁধেল চোরে, টেনশন এখন বিশ্বজুড়ে। দেশ-বিদেশে এত্তোগুলো মানুষের অযথা হয়রানি শুধু শুধু।

.

এদিকে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৫ শিক্ষকের পদত্যাগ। রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম শোয়েব কর্তৃক প্রক্টর আবদুল বাসেতকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার প্রতিবাদে ও সুষ্ঠু বিচার না পাওয়ায় তারা ভিসির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন (লিঙ্ক দেখুন)। পত্রিকাগুলো যথেষ্ট শালীনভাবে সংবাদ পরিবেশন করেছে। ‘চড়-থাপ্পর’-এর পরিবর্তে ‘শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা’ লিখে প্রক্টরের সম্মান বাঁচিয়েছে। শোয়েব সাহেবের জন্য খারাপ লাগছে। বাসেত সাহেবের জন্যও খারাপ লাগছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সেদিন ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে কুরুক্ষেত্র দেখে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন যারা তাদের জন্য খারাপ লাগছে। হঠাৎ খবর পেলাম, অভিনেত্রী পারভীন সুলতানা দিতি আর নেই। তাঁর জন্য মায়া হয়। তাঁর কতো ছবি দেখেছি! ওদিকে গুণী কবি গুণ অবশেষে পুরস্কার বাগিয়েই ছাড়লেন। ভীষণ খুশির খবর। তবু তাঁর জন্যও মায়া হয়।

11021057_10203659101149121_3043800770366463351_n

ব্রীজের ধারেই বাড়ি থাকায় বর্ণমালা শেখার বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুটির কথা মনে পড়ে। এতো মনযোগ দিয়ে লিখছিলো, আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম কিন্তু সে টেরই পেলো না। ওর জন্য মায়া হয়। ওর নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি।

DSCN4470

রেল লাইনের ধারে আকাশ রঙা পলিথিনের ঘরে ভরদুপুরে ঘুমিয়েছিলো যে শিশুটা, ওর কথা মনে পড়ে। এই এক বছরে কতোটা বড়ো হয়েছে সে, দেখতে ইচ্ছে করে।

DSCN1418

পরগাছাতে ছেয়ে থাকা বড়ই গাছটার কথা খুব মনে পড়ে। নিরীহ গাছটাকে একা পেয়ে লতাগুলো কেমন জাপটে ধরে কব্জা করে নিয়েছিলো! মাঠের পাশেই ছিলো গাছটা। কিন্তু শেষমেষ আর প্রাণে বাঁচেনি। ওখানে এখন কাণ্ডের কঙ্কাল; খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে আছে। মৃত গাছটার জন্য মায়া হয়।

.

প্রয়াত পিতামহের কথা মনে পড়ছে। তাঁর জন্য ভীষণ মায়া হচ্ছে। তাঁর বলা এই গল্পটি এখনও মনে আছেঃ

বহুকাল আগে এক গ্রামে তিনজন বিখ্যাত কুঁড়ে ছিলো। তাদের মধ্যে খুব ভাব। কুঁড়েমিতেও কেউ কারও চেয়ে কম যায় না। এক রাতে ওরা তিনজন এক সাথে ঘুমুতে গেলো। মাঝ রাতে ঘরে আগুন লাগলো। আগুনের তাপে ওদের ঘুম ভাঙলেও কেউই আর আলসেমি ভেঙে কষ্ট করে চোখ খুললো না। তারা তিন জনই সূর্য উঠেছে বলে ধরে নিলো। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই একজন জানতে চাইলো, “কতো রবি জ্বলে রে?” পাশের জন জবাব দিলো, “কেবা আঁখি মেলে রে?” তৃতীয়জনের এতে মেজাজ চড়ে গেলো। অন্য দুজনকে ধমক দিয়ে বললো, “চুপ থাক্‌! একদম কথা বলবি না। কথা বললে নাভির বোঁটা নড়ে যাবে তো। চুপচাপ শুয়ে থাক্‌।” তখনই আগুনের দাউদাউ শিখা এসে ওদের তিনজনকেই জাপটে ধরলো। বাঁচবার সুযোগটি তাদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিলো।

.

ওই কুঁড়ে তিনটের জন্যও মায়া লাগে। ইন ফ্যাক্ট, আমি নিজেও যে ওদের আভিজাত্য বহন করে চলছি।  😛 মায়া হয়। খুব মায়া। কাঁড়ি কাঁড়ি অলস মায়া। অথচ সিগন্যাল বেশ স্পষ্টঃ ‘মায়া দিয়া বান হবে, বান বান বান। আদর্শ দুচির ভাই হতে না পারলে এই মায়ার কী দাম আছে?’

.

এ শুধু অলস মায়া, এ শুধু মেঘের খেলা

এ শুধু মনের সাধ বাতাসেতে বিসর্জন।

এ শুধু আপন মনে মালা গেঁথে ছিঁড়ে ফেলা,

নিমেষের হাসিকান্না গান গেয়ে সমাপন।

.ছবি চতুষ্টয় অন্য কারও নয়।

গানটি কবিগুরুর। ১৯৪৭-এ লেখা।