ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

অন্তর্জালের সুপার হাইওয়ে মানব জীবনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন করেছে—  এটি কোনও নতুন কথা নয়। নতুন কথা হলো, আমি এখানে নতুন কোনো কথা বলতে আসিনি। বলতে চাচ্ছি যে, দেশে যখন চাঞ্চল্যকর কোনো হত্যাকাণ্ড, অপহরণ বা গুমের ঘটনা ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবে বেঁচেবর্তে থাকা মানুষগুলো সেসবের আপডেইট নাস্তায়, লাঞ্চে বা ডিনারে লবণ কিংবা চাটনি হিসেবে পছন্দ না করলেও, অন্তত উৎকণ্ঠার মুক্তির জন্য হলেও জানতে চায়, জানাতে চায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অথবা সরকারের দায়িত্বশীল কারও কাছ থেকে যখন ওসবের ‘কে, কেনো’র’ কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না, তখনই মানুষের স্পেকুলেশন বেড়ে যায়। এরকম ঘটনায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের নৈশঃব্দ বা রাখঢাক সাধারণ মানুষের তথ্যক্ষুধাকে উস্কে দেয়। মরণশীলের মরণের ভয়-ভীতি আর ক্ষিধের চিড়বিড়ে অনুভূতি– দুটোই জীবনের প্রয়োজনে। মানুষের জৈবিক ও মানবিক ক্ষিধের প্রকরণে তথ্যক্ষুধা বেহুদা নয়। এখানে উপবাসে ফায়দা নেই। অপ্রশমিত থাকলে এই ক্ষিধে ভয়ঙ্কররূপ ধারণ করে। অস্ফূট গোঙানির মতো মাথার ভেতর শব্দ তুলে। যাদের মাথায় এই শব্দ নেই তারা মহান। যাদের আছে তারাও মহান হতে পারেন সহজেই।

.

কবি নজরুল লিখেছেন, “হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছো মহান।” কবি নিশ্চয়ই তাঁর নিজের দারিদ্র্যকে পারসোনিফাই করেই এমনটি লিখেছেন। কিন্তু অনেক বিত্তশালীর কাছেও এটির প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। তিনিও এই পঙক্তির রসাস্বাদন করতে পারেনঃ “হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছো মহান।” কারণ মানুষের দারিদ্র্য আছে বলেই তো বিত্তবানের পক্ষে দান-খয়রাত করে মহান হওয়া সম্ভব হয়েছে। এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, কবি তার কবিতা দিয়ে যা বোঝাতে চান, তার বাইরেও বুঝার কিছু থাকতে পারে।

.

জোহা’র হারিয়ে যাওয়া এবং আবার ফিরে আসা নিয়ে প্রচুর জল্পনা-কল্পনা চলছে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছে না। সবাই মনে মনে অপেক্ষা করছে সরকার এই তথ্যের ক্ষিধে মিটিয়ে দেবে। কিন্তু সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেরা কেউ উদ্যোগী হয়ে ক্ষিধে মেটানোর চেষ্টা করছে না। ঘটনার যেটুকু জানা আছে, সেটুকু অবশ্যই অসম্পূর্ণ। এটির একটি সম্পূর্ণতা প্রয়োজন। এর জন্য দরকার একটু স্ব-উদ্যোগী আয়োজন।

.

বেশ কয়েকদিন নিখোঁজ থাকার পর হঠাৎ সেদিন জোহাকে পাওয়া গেলো। এয়ারপোর্ট এলাকায় উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করছিলো, তাকে পুলিশ শনাক্ত করতে সক্ষম হয় এবং নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসে। এর আগে জোহা’র গায়েব হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলতে পারেননি। তবে তিনি সবাইকে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছিলেন।

.

অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মানুষের তুলনায় আমাদের বিস্ময়কর দুই সুন্দরের নাম হলো বিশ্বাস আর ধৈর্য। এবার ধৈর্যের ফল পাওয়া গেলো।  অবশেষে জোহা ডিম্যাটারিয়ালাইজ্‌ড অবস্থা থেকে দৃশ্যমান মানবিক আকারে ইন্ডিয়া/পাকিস্তানে নয়, এই বাংলাতেই নাজেল হয়েছেন। কেউ জানেনা কোথায় তিনি এতোদিন ছিলেন। ভাগ্যিস, পুলিশ তাঁকে রাস্তায় দেখে চিনতে পেরেছিলো। জোহা’র অন্তর্ধান এবং প্রত্যাবর্তনের রহস্য খুব জটিল মনে হতে পারে অনেকের কাছে। অথচ এটিকে সরল হাইপোথিসিস-এ ফেলে জনমনে আরাম নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

.

প্রযুক্তির ডামাডোলে অতিপ্রাকৃত কিছু সত্যের ব্যাপারে আমরা এতো উদাসিন হয়ে গেছি যে, এখন এসবের অনেক বর্ণনাই আজগুবি মনে হবে অনেকের কাছে। আর আপনি যদি ভূত এফ-এম নিয়মিত না শুনে থাকেন কিংবা সুপারন্যাচারাল স্পিরিটের আজগুবি কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস না রাখেন তবে আপনাকে  এসব শুনিয়ে একেবারেই লাভ নেই। যা হোক, এটা তো সবার নিশ্চয়ই জানা আছে যে, বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার সাথে সাথে পশু-পাখিদের জীবন খুব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ওদিকে জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাবেও বেকায়দায় পড়েছে বিশ্বের নানা মাখলুকাত। তেমনি জ্বীনদের জীবনেও ডিফরেস্টেশন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব গত দুই দশকে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। ভালো পরিবেশে বাঁচার তাগিদে এরা অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জামাচ্ছে। গত বিশ বছরে এদেশেও প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার জ্বিন উদ্বাস্তু হয়ে এসেছে। এখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিবেশ যেমনই হোক, প্রাকৃতিক পরিবেশটা খুবই জ্বীনোপযোগী।

.

বাংলাদেশে আগত এসব জ্বীনের বেশিরভাগই পশ্চিমা; অল্প কিছু আছে যারা পূর্ব এশিয়ার। এদের জীবনযাত্রা পুরোটাই প্রযুক্তি নির্ভর। গত রাতের স্বপ্নের তথ্যানুযায়ী, এদের কয়েকজনের সাহায্য নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমে হ্যাকারেরা ম্যালওয়ারটা ঢুকিয়েছিলো। পরে তদন্ত কাজ শুরু হবে হবে অবস্থায় জোহা যখন এ ব্যাপারে টু-টা করতে শুরু করলেন, এই দুষ্কৃতকারী জ্বীনদের আঁতে লাগলো। লাগারই কথা। কারণ এদের আঙুলের ছাপ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমের বিভিন্ন ভৌত অংশে লেগে আছে। যদি জোহার বাড়াবাড়িতে সেগুলোর কোনোটি চেকটেক করা হয়, তবে তো মহাবিপদ হয়ে যাবে। সেই আশঙ্কায় তাকে ওঠিয়ে নেয়া হয়েছিলো জ্বীনাস্তানায়। এটি যদি না করা হতো, তবে আঙুলের ছাপ পরিক্ষা করার মাধ্যমে এদের জ্বীন-পরিচয় ফাঁস হয়ে যেতে পারতো, কারণ ব্যাংক-এর কম্পিউটার সিস্টেমে যে ছয় জন ড্যাঞ্জেরাস জ্বীন সম্পৃক্ত ছিলো বলে জানা গেছে তাদের মধ্যে দুজনের সিমের রি-রেজিস্ট্রেশন করা, যেখানে তাদের নিজেদের হাতের আঙুলের ছাপ আছে (হ্যাঁ, জ্বীনেরা মানুষের রূপ ধরলেও তাদের হাতের ছাপ অপরিবর্তিত থাকে)। পরে যদি কেঁচু খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসে মানে আঙুলের ছাপ দিয়ে সিমের হদিস বের করে পরে যথারীতি ফোন কলের রেকর্ড চেক করার মাধ্যমে যদি এই সাড়ে পাঁচ হাজার জ্বীনের অবৈধ বসবাসের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়! সেরকমটি হলে তো কবিরাজ ডেকে এই সরকার সবগুলোকে ঘাড় ধরে দেশ ছাড়া করে দেবে। সুতরাং হুট করে জোহা’কে উঠিয়ে নেয়া ছাড়া উপায় ছিলো না। এর পর এই কয়েকদিন জোহার সাথে কয়েক দফা বৈঠক ও ভয় প্রদর্শনপূর্বক তাকে রাজি করানো গেছে যে, তিনি আর কিচ্ছুটি করবেন না, বলবেন না। প্রশ্ন জাগতে পারে, ভোটার আই ডি ছাড়া জ্বীনগুলো কি করে সিম রি-রেজিস্ট্রেশন করলো? এটা কোনো ব্যাপারই না। প্রযুক্তির ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত এসব জ্বীনের পক্ষে ভূয়া ভোটার আই ডি কার্ড বানিয়ে নেয়া কোনো কঠিন কাজ নয়।

.

যেখানে সরকারের কোনো দায়িত্বশীল মহল এই অন্তর্ধানের ব্যাপারে কিছুই জানে না বলে জানাচ্ছে, সেখানে নাগরিক হিসেবে আমাদের এটা ভাবা অনুচিত যে তারা কেউ কিছু জানে। জ্বীনের কাজকারবার সরকারের জানার কথা নয়। আমারও জানার কথা নয়, তবে স্বপ্নে পাওয়া এসব তথ্যকে অন্তত একটি যুতসই হাইপোথিসিস হিসেবে বিশ্বাসে নিয়ে আরামে থাকা যায়। বিষয়টিকে নিয়ে আর হাউকাউ না করে আসুন নতুন ঘটনার অপেক্ষা করি। জোহা সাবজেক্ট এখন বেশ পুরনো। বেচারা বেঁচে আছে, এইটুকুই তো বড়ো ব্যাপার।