ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

udashin11_1311744850_1-image_450_76157

“ওই মিয়া! রক্ত দেখলে ডর লাগে? কার রক্ত আবার, জবাই করা মানুষের রক্তের কথা কই। কয় ভাই-বোন আপনারা? বিয়া করছেন? ছেলেমেয়ে? মা আছে তো? আচ্ছা ধরেন, আপনার ওই বোনটা, বউটা, মেয়েটা কিংবা মা’টারে কেউ সন্ধ্যাবেলায় মুখ চাপা দিয়া, হাত দুইটারে পিছমোড়া করে বাঁইধা কোনো ঝোপের মধ্যে নিয়া ছিঁড়া খাইলো। মাথাটারে থেঁতলাইয়া দিলো ইঁট দিয়া। তারপর গলা কাটলো। তারপর নির্বিঘ্নে চইলা গেলো। আপনি খুঁজতে খুঁজতে, শেষমেশ রাত সাড়ে দশটায় রক্তের গন্ধে ঝোপের পাশে গিয়া টর্চের আলোতে তার নিথর ন্যাংটা শরীরটারে দেখতে পাইলেন। রক্তে ভাইসা গেছে। টর্চের সাদা আলোতে তার ন্যাংটা শরীরে লেপ্টে থাকা রক্তের রঙ কেমন সুন্দর লাগবে, ভাবতে পারেন? ডর লাগে? ওই মিয়া, ডর লাগে?”

 

ওই নয় মাসজুড়ে কতো রক্ত ঝরিয়েছে হায়েনারা? শহীদদের বুকের রক্তস্রোতে কতো ব্যারেল মিশেছিলো ধর্ষিতা মায়ের, বোনের ছেঁড়া জরায়ুর রক্ত? ‘জরায়ু’ শব্দটা কি অশ্লীল লাগে? এমন কি মনে হচ্ছে আমার লেখার শ্লীলতাহানি হচ্ছে? তেমনটি মনে হলে আপনি নিপাট ভদ্রলোক। আপনি বরং পৃষ্ঠা উলটে নিন, প্লিজ। আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না।

তনু’র রক্তাক্ত শরীর চোখ এড়ায়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ওই নয় মাস অভিজ্ঞতায় নেই। বীরঙ্গনার মুখে গল্প শুনেছি, একাত্তরের নৃশংসতার রক্ত হিম করা গল্প পড়েছি। এবার রক্তে ভেজা, খুবলে খাওয়া লাশটা দেখে মনে হলো, এরকম করেই তো উর্দিপরা পাকসেনারা তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো আমাদের মা-বোনদের উপর, দিন-দপুরে, গভীর রাতে যখন যেখানে পেরেছে। এরকম কতো সন্ধ্যায় পাকসেনাদের ক্যাম্পের ভেতর নৃশংসতায় ছিঁড়ে যাওয়া যোনি, জরায়ুর গলগলে রক্তের ধারা নিয়ে সজ্ঞাহীন কিংবা মৃত পড়েছিলো তনুর বয়সী কতো জন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়ে, কে জানে? ঘামে ভেজা, উন্মত্ত শরীরের নর পিশাচগুলো বন্দুক ফেলে দল বেঁধে নিজেদের শিশ্নের বুনো উল্লাসে রক্তাক্ত করেছে তনুর মতো কতো শত মেয়েকে, কে গুনে দেখেছে?

ওইসব রক্তঝরা দিনরাত পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ কতোদূর চলে এসেছে! খাদ্য নিরাপত্তায়, স্বাস্থ্যসেবায়, শিক্ষা ও তথ্য-প্রযুক্তিতে আমরা কতো এগিয়ে গেছি গত চার দশকে! আমরা সচেতন হয়েছি, আমরা আধুনিক হয়েছি। স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে, দেশকে কলঙ্কমুক্ত করতে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের কতো কতো স্বীকৃতি, স্তুতি আর সম্মাননা! আমাদের অনেক অর্জন। অনেক। আর সবকিছু ছাপিয়ে ওই স্বাধীনতাই আমাদের বড়ো অর্জন। কিন্তু আমরা কি পেরেছি লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সেই স্বাধীনতা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে?

তনু হত্যার বিচারের কথা যখনই আসছে, আরও কতোগুলো মানুষের লাশের চেহারা চোখে ভাসছে। ওইসব মানুষের লাশ, যাদের হত্যার বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিলো হাজারো মানুষ; হত্যার বিচার করবে বলে খাঁটি কথা দিয়েছিলো বর্তমান সরকার। কথা রাখেনি। আশ্বাসের উপর ভর করে থাকা সেই বিশ্বাস আজ বিষ হয়ে জমে আছে বুকের ভেতর। আরও আরও লাশের ভারে চাপা পড়ে গেছে বিচারের বাণী।

আজ ২৬ মার্চ। পাঁচ দিন আগে, ২০ মার্চে, স্বাধীন বাংলাদেশের একটি সেনানিবাসের সংরক্ষিত চৌহদ্দির ভেতর পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করে ফেলে রাখা হয়েছে আমার বোনকে। তনু কবিতা ভালোবাসতো। তনু সুন্দরের স্বপ্ন দেখতো। স্বপ্ন দেখতো একটা নিশ্চিন্ত আয়ের ক্যারিয়ার পাওয়ার। ও প্রাচুর্যের মাঝে বেড়ে ওঠেনি। চতুর্থ শ্রেণির চাকুরে বাবার সংসারে টানাটানি থাকেই। সেই সংসারে আয়ের ঘাটতি লাঘব করতে মেয়েটি নিজেই উদ্যোগি হয়েছিলো। দুটো টিউশনি। আর দশ দিন পড়ালেই এ মাসের পেমেন্টটা পেয়ে যেতো। আহারে বেচারি!

আজ এই স্বাধীনতা দিবসে আমরা তনুর হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার। আজও পথে পথে মিছিল নামবে তনুর খুনিদের বিচারের দাবিতে, যদিও এমনটি হবার কথা ছিলো না। আজও কি তেমনি  আশ্বাসের বাণী শুনবো আমরা? আর আগের মতোই আরও আরও লাশের ভারে চাপা পড়ে যাবে  এই বিচারের বাণী?

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনছি। আঠারো মিনিটের সেই মহাকাব্যিক ভাষণ। আজ বারবার ভাষণের ওই জায়গাটা রিওয়াইন্ড করে শুনছিঃ “কী পেলাম আমরা?” “কী পেলাম আমরা?”“কী পেলাম আমরা?” কী পেলাম আমরা?

আমরা বিশ্বাস করি, অপরাধীর বড়ো পরিচয় সে অপরাধী। ধর্ষকের বড়ো পরিচয় সে ধর্ষক। সে যেকোনো পেশার হতে পারে। একজন ধর্মগুরুও বিপদগামী হয়ে এরকম অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমন কি বিকারগ্রস্থ পিতাও তার সন্তানকে ধর্ষণ করতে পারে। পেশাগত পরিচয় অপরাধের সংশ্লিষ্টতায় কোনো ভাবেই কারও ইমিউনিটির ভিত্তি হতে পারে না। সুতরাং আজ এই স্বাধীনতা দিবসে সরকারের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া, ‘তনু হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত চাই, বিচার চাই। কোনো রকম টাল্টিবাল্টির কাছে সমর্পিত দেখতে চাইনা সংশ্লিষ্ট কাউকে।’