ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

আমাদের চিন্তার জগৎ দখল করে রাখে নিত্যদিনের ঘটনাপ্রবাহ। জাতীয় আর আন্তর্জাতিক বিষয়াদির প্রভাব তো আছেই; সেই সাথে প্রকৃতির রূপ বদলও কিন্তু কম যায় না। এই  যেমন রাতভর ঝড়োহাওয়া আর বৃষ্টির দুরন্তপনা অনেক কিছুই পালটে দিলো কাল। চট করে ঘর অন্ধকার। বাইরে মেঘের নিনাদ। জানিই তো, অনাকাঙ্ক্ষিত অন্ধকার ভয় দেখানোর সুযোগ না পেলে নস্টালজিয়ার পর্দা তুলে দেয়। তার সাথে বৃষ্টির আঁতাত থাকলে তো কথা নেই। এরপর জানলা গলে ভেজা মাটির ঘ্রাণ এলে যা হয়, তা-ই হলো–একছুটে দূর শৈশব। ভয়ঙ্কর সব ঘনঘোর বর্ষার দিন, পুকুরের শিরশিরে জলে ডুব সাঁতারে রাজ্যের সুখ। জলের তলে গিয়ে উপরে ঝুম বৃষ্টির শব্দে কান পাতি। একটুও মনে নেই খোয়া যাওয়া টাকাপয়সা, ধর্ষকের শাস্তি, দেশের এবং ধর্মের কথা। অথচ এসবের অস্থির প্রবাহ যাপনের এই জীবনজুড়ে বেশ কদিন থেকেই এই যে এতো মাখোমাখো হয়ে আছে—তার যেনো কোনো ঠাঁই নেই। এ তল্লাটে আরও কতো আগুন দাউদাউ জ্বলছে ভীষণ প্রতিদিনই। জরুরী ছুঁতোমুতো তৈরিতে মেধাবীরাও দেশী-বিদেশী কুশলিব নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাই নতুন আগুন দেখে সচেতন চিন্তিত মন রৈরৈ করে ওঠবে,  র‍্যাগিং, হ্যাকিং, রেইপিং, রিট ইস্যুয়িং, কিংবা রিগিং করে রাষ্ট্রময় তথ্যের সুষ্ঠু প্রবাহ বজায় রাখার যার যার যতো ব্রত তা সব দিনের শেষে ক্ষতের চুলকানি হবে, সাথে আমাদের জাতীয় নির্মাতাগণ নতুন আয়োজন সার্থক ভেবে আরাম পাবেন, আর তাদের যমরূপ অপরূপ না লাগলে আমাদের এ্যডজাস্টম্যান্টের সমাস্যা বলে ধরে নিতে হবে— এসবের ভাবনায় ভালোবাসা কম নেই। কিন্তু সব তুচ্ছ করে দিয়ে দমকা বাতাসের তোড় ঠেলে একদম বিজলীর বেগে টেনে নিয়ে গেলো উচ্ছ্বল  শৈশব। এমনই হয়। বৃষ্টিতে হঠাৎ ছলকে উঠা স্মৃতির চিৎকারে কে থাকে ঘরে শুধু যা আছে তা নিয়ে?

.

তখন আমার বোধশক্তি খারাপ ছিলো না। যেসব দোকানদার ভাঙতি দেয়ার সময় যত্ন করে চকচকে নোটগুলো ক্যাশবাক্সে রেখে ত্যানত্যানাগুলো হাতে ধরিয়ে দিতো, তাদেরকে অভদ্র ভাবতে শিখে গেছি নিজে নিজেই। গাছে চড়তে পারি। পাতায় পাতায় না হলেও ডালে ডালে বিচরণ রপ্ত হয়েছে। রেডিওতে ‘তুমি’-ওয়ালা গান শুনে ভেতরে ছলাৎ ছলাৎ করে। দুপুর গড়ালে ভীষণ একলা লাগে কোনো কোনো দিন। রাতে ঘুমানোর আগে চোখ বন্ধ করে আসমানে ভাসতে পারি। এমনি করে করে সেবার শীত এসে গেলো। নিজের স্কুল দশটায়। কিন্তু সাত সকালে সাইকেলে করে একমাত্র সোহদরকে স্কুলে পৌঁছে দেবার গুরু দায়িত্ব আমাকেই নিতে হলো। শীতের রাতে তখনও এখনকার মতোই বিভিন্ন স্থানে বিরাট সভার আয়োজন হতো। দ্বীনি আলোচনার সভা। যাত্রাপালায় যাওয়ার অনুমতি না পাওয়া গেলেও এগুলোতে যোগ দিতে বাধা ছিলো না, এমনকি সভাস্থল মাইল দু-তিন দূরে হলেও। আমরা যেতাম খুব আগ্রহ নিয়েই। ধর্মসভায় এ্যটেনডেন্সের বাড়তি সুবিধা হিসেবে পেট ভরে গরম জিলাপি খাওয়া যেতো। চিনির নয়, মিঠাইয়ের জিলাপি। সভার প্যান্ডেলের বাইরে বসা ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে এসব খেতে খেতে মনে পড়তো, হুজুর বলেছেন, মিঠাই নবীজি’র প্রিয় ছিলো। মিঠাই খাওয়া সুন্নত। মান্না আর সালুয়া’র স্বাদ পেতে ইচ্ছে করতো। বণী ইসরাঈলিদের সৌভাগ্যে ঈর্ষা হতো। হুজুর কোরআন থেকে তেলাওয়াত করতেন আর আমাদের জন্য বাংলা করে শোনাতেনঃ “আর আমি তোমাদের উপর ছায়া দান করেছি মেঘমালার দ্বারা এবং তোমাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছি ’মান্না’ ও সালওয়া।’ কী সৌভাগ্য ওদের! বেহেস্‌তি খাবার দুনিয়াতেই খেয়ে নিয়েছে। তবে এক পর্যায়ে মান্না আর সালওয়ার চেয়ে বড়ো আকর্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়ালো হুর বিষয়ক আলোচনা। দু’চারটে নয়; সাত দশে সত্তরটা হুর!

.

হুর বিষয়ক বয়ানের মুগ্ধতায় গরম জিলাপির রুচিও কমে গেলো। ধর্মসভার প্যান্ডেলের নিচে, গায়ের চাদরে কুয়াশার হিম মেখে বসে বসে হুরের আলোচনা মন দিয়ে শুনি। সম্মানিত বিখ্যাত বক্তা তাঁর সুরেলা গলায় বিভিন্ন সূরা থেকে পড়ে শুনাতেন, আর বিস্তারিত বুঝিয়ে দিতেনঃ “ জান্নাতের অন্যান্য নিয়ামতের ন্যায় হুরে ঈনও একটি নিয়ামত হবে। হুরে ঈনরা শুধু অতুলনীয় সুন্দরীই হবে না, তাদের আচার ব্যবহারও থাকবে ভীষণ আবেদনময়। হুরদেরকে ইতোপূর্বে অন্য কোনো মানুষ বা জ্বীন কখনো স্পর্শ করেনি। হুরেরা এতটা লজ্জাশীলা হবে যে, স্বামী ছাড়া আর কারো দিকে চোখ তুলে তাকাবে না। হুরেরা সুন্দর লাজুক চোখ বিশিষ্টা, মোতির ন্যায় দ্যুতিময় এবং তাদের শরীরের স্বচ্ছতা ও রং এত নিখুঁত হবে যেনো সংরক্ষিত স্বর্ণালংকার।

.

ধর্মীয় আলোচনার এই চুম্বক অংশে আমার মনযোগ যেনো ম্যানিয়ারূপে আবির্ভূত হতে লাগলো। এর মাঝে একদিন ঘটলো এক সর্বনাশ। সেদিনও সভায় যথারীতি অন্যান্য প্রসঙ্গের পাশাপাশি হুরে ঈন উঠে এলো। বক্তব্য মোটামুটি এরকম, “হুরেরা এতো সুন্দরী যে, যদি তাদের কেউ এই দুনিয়ায় একবার একটু থুতু ফেলে, তাহলে সমস্ত দুনিয়া অপূর্ব সৌরভে ভরে ওঠবে আর সব মানুষ ওই ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে থাকবে। তাদের ত্বক হবে ডিমের ভিতরের দিকের পাতলা চামড়ার চেয়েও অধিক নরম,আর তা এতোই স্বচ্ছ আর উজ্জ্বল হবে যে, হুরের দিকে তাকালে তার শরীরের ভেতর যতো শিরা-উপশিরা, নাড়িভূড়ি আছে সব দেখা যাবে।” হুরের এই বর্ণনা শুনে আমি আপ্লুত হবার পরিবর্তে আঁৎকে ওঠলাম। এই প্রথম হুরের রূপ বর্ণনা শুনে আমার গা গুলিয়ে ওঠলো। মাথাটা ঝিমঝিম করতে শুরু করলো। মাথার ভেতর হুরের যতোসব অবয়ব এতোদিনে সঞ্চয় করেছিলাম সব হঠাৎ যেনো বীভৎস আকার ধারণ করলো। তার পর কেটে গেছে প্রায় দুই যুগ। এখন এটা যদিও বুঝি যে, সুন্দরের অতিশয় রূপ ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে বক্তা সেদিন হুরের গায়ে সালফিউরিক এসিড ঢেলে দিয়েছিলেন। ত্বকের ওরকম বিশ্রী স্বচ্ছতার কথা আদৌ কোথাও লেখাজোকা নেই। তবুও এখনও হুরের কথা মনে আসতেই ওই বীভৎস চিত্রকল্পটা চলে আসে সবার আগেঃ ‘এতো স্বচ্ছ, এতো স্বচ্ছ যে ভেতরের নাড়ি-ভূড়ি পর্যন্ত দেখা যাবে।’ ওয়াক!!

.

এ প্রসঙ্গে এক বাংলা ক্লাসের মর্মান্তিক ঘটনার কথা মনে পড়লো। সত্যি ঘটনা। স্নাতক শ্রেণির শিক্ষার্থিদেরকে কবিতা পড়াচ্ছেন জনৈক শিক্ষক। জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’। ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।’—এখানে আসতেই এক শিক্ষার্থি জানতে চাইলো, বিদিশা’র কী মানে। শিক্ষক কিছুক্ষণ ভাবলেন; তারপর বললেন, ‘আরে বিদিশা বোঝো না! বিদিশা মানে দিশা হারায়া ফেল্‌ছে। চুল দেইখা অন্ধকারে দিশা হারায়া ফেল্‌ছে কবি।’ আহা! আহা! কী বিচিত্র বিশ্লেষণ! এই সেদিনের আরেক কাহিনী। গ্রামে এক মিটিং বসেছে সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে। নুরানি অবয়বের শ্মশ্রুমণ্ডিত এক প্রাজ্ঞজন কথা বলছেন। ওই এলাকার ধর্মীয় গুরু। তিনি মূলত সকলের আন্তরিক চেষ্টায় যে অনেক আপাত অসাধ্য সাধন করা সম্ভব সেটি বুঝাচ্ছিলেন উপস্থিত সবাইকে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, “এই যে এইখানে আমরা তিরিশ-চল্লিশ জন মানুষ আছি…একটা বালতিতে যদি প্রত্যেকেই একবার কইরা ছেপ (থুথু) ফালাই, তাইলে একজনের গোসলের পানি হইয়া যাইবো।” কী চমৎকার উদারহণ! ওয়াও! ওয়াক!!

.

যা হোক। কথা বলছিলাম হুর নিয়ে। এ সংক্রান্ত একটি ব্যাখ্যা ডা. জাকির নায়েকের লেকচার থেকে জানা গেলো। তিনি বলেছেন, মহাগ্রন্থের অন্তত চারটি জায়গায় হুরের বর্ণনা পাওয়া যায়।

*In Surah Dukhan chapter 44, verse 54
“Moreover, We shall join them to companions With beautiful, big and lustrous eyes.”

*In Surah Al-Tur chapter 52 verse 20
“…And We shall join them to companions, with beautiful, big and lustrous eyes.”

*In Surah Rahman chapter 55 verse 72
“Companions restrained (as to their glances), in goodly pavilions.”

 *In Surah Al-Waqiah chapter 56 verse 22
“And (there will be) companions with beautiful, big and lustrous eyes.”

তাঁর মতে হুরের কোনো নির্দিষ্ট লৈঙ্গিক পরিচিতি এগুলোতে নেই; বরং এটি নর ও নারী উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। হুর বলতে ‘স্পাউস’কে বুঝনো হয়েছে বলে তাঁর মত। নারীর জন্যও হুর, নরের জন্যও হুর। এটি কিন্তু আবার অনেক চিন্তাবিদ একেবারেই মানতে নারাজ।

.

শেষমেষ ওই শৈশবের মতোই বেহেস্‌তি সব হুর বহুদূরই থেকে গেলো। “কোনো চোখ কোনোদিন দেখেনি, কোনো কান কোনোদিন শুনেনি, কোনো মন কোনোদিন ভাবেনি”। আমার এতো ভাবার কী দরকার? আর নামাজ-কালামে মনযোগ না দিয়ে অতো হুরের কল্পনায় ফায়দা কী? আপাতত বড়ো বড়ো উজ্জ্বল চোখের সুন্দরেই (beautiful, big and lustrous eyes) তুষ্ট থাকি। হুর নিয়ে আর কোনো ঝামেলায় জড়ানো ঠিক হবে না। কাল রাতে বৃষ্টি ছিলো। ভীষণ বাতাস ছিলো। ঝড়-ঝাপটায় ধুয়ে গেছে কতিপয় ক্লান্তির দাগ। কেমন ভেজা ভেজা বাতাস এখনও বইছে বেশ। কী এক অদ্ভুত ঘ্রাণ! কান পেতে শুনি কবির নতুন উচ্চারণ, “মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক, মানুষেতে হুরাহুর।”