ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

গ্রামের পাকা রাস্তা। রিক্সায় আমরা দু’জন। দু’পাশে বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেত। রোদে চকচক করছে। বাতাসে দুলছে শীষ। ডান দিকে বেশ কয়েকটি ক্ষেতের পরে একলা মতো একটা বাড়ি। ওটা দেখে মেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ওখানে কে থাকে, বাবা?” আমি বললাম, “ওটা আমার এক বন্ধুর বাড়ি। আমরা একসাথে স্কুলে পড়তাম। যাবি?” ও তো মহানন্দে রাজি।

.

zzDSCN8728

ভরা ধান ক্ষেতের আইল ধরে আগে কখনও হাঁটা হয়নি ওর। আর আমারও এ বাড়িতে বহু বছর আর যাওয়া হয়নি। জানি, পবিত্র আর এখানে থাকে না। মাতৃপ্রধান পরিবারে ছেলেরা বিয়ে করে মেয়ের বাড়িতে চলে যায়—এটাই নিয়ম। তবু ভাবলাম, এই সুযোগে পবিত্র’র খোঁজ-খবর নেয়া যাবে। বহু বছর দেখা নেই।

.

রিক্সা ছেড়ে আমরা ধান ক্ষেতের আইল ধরে এগুতে লাগলাম। কাঁচা ধানের ঘ্রাণ বদলায়নি একটুও। বাতাস বইছে বেশ। বাতাসে মাঠের সবুজে সাগরের ঢেউ। এ আমার পরিচিত দৃশ্য। যার আজ প্রথম দেখা হচ্ছে, তার ভালোলাগা এই মূহুর্তে আমার চেয়ে ঢের বেশি, বোঝা যাচ্ছে। যে বাড়িতে যাচ্ছি সেটা গারো বাড়ি নামে পরিচিত। পবিত্র আমার সহপাঠী হওয়ার কারণে ছোটবেলায় অন্যদের চেয়ে আমার যাতায়াত বেশিই হতো এ বাড়িতে। যাওয়ার একটা বড়ো উদ্দেশ্য ছিলো ফুলের বীজ/চারা আনা। বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন ফুলগাছে ভর্তি ছিলো তখন। আর পবিত্র’র মা তো বটেই, মামারাও খুব উদার ছিলেন। না করতেন না কখনও। আমরাও অনুদার ছিলাম না। দুয়েকবার যখনই কচ্ছপ ধরা পড়েছিলো, সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে দিয়ে এসেছি।

.

যা হোক, পবিত্র’র গল্প করতে করতে সরু আইল দিয়ে সাবধানে পা ফেলে বাড়িটায় ঢুকলাম দুজনে। ঢুকে দেখি পুরো বাড়ি খাঁ খাঁ। ঘরগুলো আগের জায়গায় নেই। ওগুলোর চেহারা বদলেছে। সংখ্যাও। কিন্তু বাড়ির বাসিন্দারা দিনদিন কমেই গেছে, বাড়েনি মনে হয়। কারণ পবিত্র’র বা ওর খালাতো ভাইদের কোনো বোন ছিলো না বলেই জানতাম। ফুলের গাছগুলো নেই। সবগুলো ঘরের দরজা খোলা, যদিও প্রথমে কাউকেই পাওয়া গেলো না। বাবা-মেয়ে ইতিউতি তাকাচ্ছি। এমন সময় সত্তরোর্ধ্ব একজন এগিয়ে এলেন। চেনা মুশকিল। আমাকেও চিনলেন না, যতক্ষণ না পরিচয় দিলাম। তিনি পবিত্র’র বাবা। মা’টা অসুস্থ। পবিত্র এখন নালিতাবাড়িতে থাকে; শ্বশুরবাড়িতে। কালেভদ্রে আসে। মাস খানেক আগেই একবার এসেছিলো। আবার কবে আসে ঠিক নেই। পবিত্র’র খালার সাথে কথা হলো। ফুলগাছের কথা তুলতেই বললেন, “এখন আর নাই ওইসব। মানুষই নাই বাড়িত।”

.

আমাদের তাড়া ছিলো। রাস্তার মাঝামাঝি রিক্সা ছেড়ে দিয়ে এখানে এসেছি। সুতরাং এখন বাকি পথটুকু দুজনকে হাঁটতে হবে। তাছাড়া সূর্যটাও লাল হয়ে আসছে পশ্চিমে। তাই আর ঘরে গেলাম না আমরা। পবিত্র’র কোনো ফোন নম্বর বাড়ির কারও কাছে নেই। তাই আমার নম্বরটা একটা কাগজে লিখে ওর বাবার হাতে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে নিজ বাড়ির পথ ধরলাম। ২০/২৫ মিনিটের হাঁটা পথ।

.

DSCN8735

হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল হলো, পবিত্রদের বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। মূল রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা দূরে, আর আশপাশে আর কোনো বাড়ি না থাকায় সম্ভবত এই সুবিধা থেকে বাড়িটি বঞ্চিত হয়েছে। তার পরও কেমন বদলে গেছে দিনে দিনে। আর এদিকটাতেও, যেখানে মেইনস্ট্রিম পপুলেশনের বাস, অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। শহুরে জীবনের নানাবিধ সুবিধের সংযোগে চিরায়ত সবুজের সুন্দর অনেকটাই নির্বাসিত। হঠাৎ এ গ্রামে আসা কারও কাছে সেটা ধরা পড়ার কথা নয় অবশ্য। কারণ পৌরসভার অন্তর্ভূক্ত গ্রামগুলো এরকমই হওয়ার কথা। কিন্তু ঘন বৃক্ষরাজির শোভিত সুন্দর আর হারিকেনের টিমটিমে আলোর জ্বলজ্বল যে চোখে প্রাচীন দৃশ্যের ঢেউ তুলেছে ষোলটি বছর, সেই চোখে সুন্দরের বিবর্তন এড়াবে কী করে? কোথায় কোন্‌ গাছটা ঝড়ে ভেঙেছিলো, কোন বাঁশ ঝাড়ে আসাদুলকে জ্বীনে ধরেছিলো, স্কুল থেকে ফেরার পথে  বিশাল সেই কড়ই, বড়ই আর আম গাছগুলো কোথায় কোথায় ছিলো একদিন–সব মনে পড়ে।

DSCN8733

.

শৈশবে বিদ্যুৎ মেলেনি। হারিকেনের আলোয় হতো পড়াশুনা। বিদ্যুৎ আসার পর থেকেই গ্রামে যেনো সবকিছু খুব দ্রুত পালটে যেতে শুরু করলো। এরপর পৌরসভার অন্তর্ভূক্ত হওয়াতে পরিবর্তনের ধারায় যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। এখন এই গ্রামে এমন কোনো শিশু নেই যে স্কুলে যায় না। মাটির ঘরগুলো নেই। বহু-বিবাহ নেই। ঘরে আট-নয়টি করে সন্তান (যেমনটি আগে খুবই স্বাভাবিক ছিলো) আর নেই এখানে। এতো এতো আধুনিক সব সুবিধের মাঝে আমার তবু ওই শ্লথগতির গ্রামীণ জীবনটাকে ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে, পবিত্রকে নিয়ে আবার স্কুল মাঠে দিনভর ভলিবল খেলি। কিংবা এটা ওটা নিয়ে গল্পটল্প করে কাটিয়ে দিই পুরো একটা বিকেল। ট্যানটালাইজেশন। এরকম হয় কখনও কখনও। পিঁপড়ের দঙ্গলের মতো পুরনো জঙ্গল থেকে স্মৃতিরা হুড়মুড় করে বেরুতে থাকে। তখন স্বার্থপর হতে ভালো লাগে।

.

ক্ষেতের আইল ছেড়ে রাস্তায় উঠতে গিয়ে “বাবা” ডাক শুনে চমকে যাই। পেছনে মেয়েটি একা একা উঠতে পারছে না ঢাল বেয়ে। ও যে আমার পেছন পেছন আসছিলো, আমি আসলে কিছুক্ষণের জন্য সেটা ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি কী করে তাকে বলি, “আই এ্যম জেলাস অব ইউ। আই উডন্ট এভার বি, ইফ আই কুড বি অব য়্যুর এইজ; জাস্ট ওয়ান মোর টাইম।”