ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

পূর্ণিমার রাতটা চলে গেলো। বৈশাখী পূর্ণিমা।

fsfs

গ্রামের তুলনায় শহরে অনেক রাত অবধি জেগে থাকে মানুষ। গ্রামে রাত সাড়ে দশটা মানে তো গভীর রাত; শহরে তখন সন্ধ্যা মাত্র। তারপরও নাগরিক রাতের পূর্ণিমার বঞ্চনা বেশি। পথে চলতে মানুষ আকাশ দেখে না। সাঁইসাঁই গাড়ির গতি আর অজস্র বাতির মিছিলে চোখ সতর্ক থাকে। তখন চাঁদ দেখতে গেলে গাড়িচাপার ভয় থাকে। মূহুর্তের জন্য চট করে মাথা তুলে বড়োজোর একবার দু’বার তাকিয়ে নেয়া যায়; দেখা যায় না। তাকানোর মানে তো আর দেখা নয়।

.

বড়ো শহরে বড়ো বড়ো বাড়ি থাকে, গায়ে গা লাগিয়ে। জানলা দিয়ে তাকালে সামনের বাড়ির দেয়াল পড়ে। আবার ছাদে যেতেও মানা থাকে। তাই নগরে পূর্ণিমার আসা-যাওয়ার খবর থাকে না। চাঁদ দেখতে গেলে চোখে ট্রাইপড লাগে; মানে স্থৈর্যগুণ লাগে। বৈষয়িক বিচ্যুতি লাগে। নৈঃশব্দ্য লাগে। আর জীবনে যেহেতু এমনিতেই অনেক প্যারা থাকে, নতুন প্যারার টাইম থাকে না।

.

যান্ত্রিক চোখ দিয়ে কাছে টেনে দেখলে বেশ বোঝা যায়, দৃশ্যমাণ বস্তু হিসেবে চাঁদ তেমন সুন্দর নয়। তবু চাঁদ আর জ্যোৎস্না নিয়ে এতো বন্দনা! চাঁদের জ্যোৎস্নারা নাকি গলে গলে পড়ে। আর ওই জ্যোৎস্নায় নাকি স্নান করা যায়। বয়স্ক বিচক্ষণ বলেন, “ধুর মিয়া! এইগুলান হইলো ভাবের ফাইজলামি…গাগলামি। চাঁদ কি সাইবেরিয়ার বরফ নাকি যে গইল্যা পড়বো?” তবু কেউ কেউ পূর্ণিমার চাঁদে বুঁদ হয়ে থাকে। গলা জ্যোৎস্নার ধারায় স্নান করে। পাগলামি বটে।

.

“এই ফাগুনি পূর্ণিমা রাতে, চল্‌ পলায়ে যাই।”-এই গানে পূর্ণিমার রাতে পলায়ে যাওয়ার আইডিয়াটা খুবই রোমান্টিক লাগে। জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে পালিয়ে যাওয়া। আচ্ছা, ফাগুনে পূর্ণিমা বেশি সুন্দর হয়, নাকি শরতে? তবে যা-ই হোক, মাঘের পূর্ণিমার ভাগ্য কিন্তু বেশ ভালো। ‘এই চাঁদ তোমার আমার” গানটায় চাঁদের অধিকারের সুষম বণ্টন হয়েছে, জেন্ডার ইকুইটি ম্যান্টেইন করা হয়েছে। তবে চাঁদের নিজের জেন্ডার পরিচয় নিয়ে ঝামেলা এখনও মেটেনি। দাদীর কাছে চাঁদের বুড়ির গল্প শুনে পরে পাঠ্যপুস্তকে চাঁদ যখন মামা হলো, খট্‌কাটা তখনই শুরু হয়েছে।

.

“তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায়” এবং “আকাশের ওই মিটিমিটি তারার সাথে কইবো কথা”-এই দুই গানে চাঁদকে তুচ্ছ করা হয়েছে উল্লেখ না করে। শুধু তা-ই নয়, চাঁদের আলোর উৎস সম্পর্কে ভুল ধারণা দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও আছে, যেমনঃ “মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায়, ভেবে নেবো তুমি আজ চাঁদ দেখোনি।” ওদিকে আবার “চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি”-এখানে চাঁদতে শুধু অবজ্ঞাই করা হয়নি, মানুষের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। তবে এই গানটাতে অবলা চাঁদের সম্মান বজায় আছে, গুরুত্বটাও অন্যভাবে ফুটে ওঠেছেঃ

“ও চাঁদ, সামলে রেখো জোছনাকে

কারও নজর লাগতে পারে

মেঘেদের ওড়ো চিঠি উড়েও তো আসতে পারে।”

.

পূর্ণিমার কতো কতো রাতে কতো মানুষ মরে গেছে! কবিতায় যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ/মরিবার হল তার সাধ–তো আট বছর আগের একদিন। কিন্তু গান শুনে বুঝি, মানুষ জ্যোৎস্না রাতে মরতেও চায়।  স্রষ্ঠার কাছে তাই বিনীত নিবেদনঃ চান্নি পসর রাইতে যেনো আমার মরণ হয়।

.

চাঁদকে খাদ্যবস্তু বানানোর দায় সুকান্ত’র। পূর্ণিমার চাঁদকে রুটি বানিয়ে নান্দনিকতার গায়ে মাংসের ঝোল ঢেলে দিয়েছেন। ওই কবিতা পড়ার পর বহুদিন চাঁদকে রুটি মনে হয়েছে, খেতে ইচ্ছে করেছে। এখনও করে নিশ্চয়ই অনেকেরই।

.

তবে যাই বলুন, বামন হয়ে বা না হয়ে–যেভাবেই হোক না কেনো, চাঁদের দিকে হাত বাড়ালে লাভ নেই। উহাকে ধরিবার নিমিত্তে ঐখানে ফিট করা হয় নাই। আবার প্রেমিকের আর পদার্থবিদের দৃষ্টিতে গোলাপ যেমন একই রকম নয়, তেমনি জ্যোতির্বিদ আর কবির দৃষ্টিতে চাঁদও একরকম হবে না কোনোদিন। ওই একই আকাশ, একই চাঁদ—কতো রকম করে দেখি আমরা!

ইংরেজি গানেও চাঁদ নানাভাবে রূপায়িত হয়েছে। চাঁদের লৈঙ্গিক পরিচিতি নিয়ে ঝামেলাটা ওই ভাষাতেও আছে। কখনো মিস্টার, আবার কখনও মিস। তবে সত্তর দশকের ব্যান্ড King Harvest-এর এই ভীষণ জনপ্রিয় গানটি এখনও কিন্তু দারুণ লাগে। আনন্দ এখানে অতিপ্রাকৃত হয়ে ঝরে।

We get it almost every night
When that moon is big and bright
It’s a supernatural delight
Everybody’s dancing in the moonlight

Everybody here is out of sight
They don’t bark and they don’t bite
They keep things loose they keep things alive
Everybody’s dancing in the moonlight….

10885327_10203138039202898_7894183070379945717_n