ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

“তখন গ্রীষ্মকাল। গ্রামের মানুষগুলো গরমে অতিষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ভীষণ নির্মম রোদ। দিনের পর দিন। বৃষ্টি নেই। ফসল সব পুড়ে খাক। আকাশজুড়ে মেঘ করে; ফের সেই আগুন দিন। বৃষ্টির নাম নেই। একদিন বিকেলে আকাশে ওরকম বর্ষণ মেঘ এসে জড়ো হলো। ছাতি ফাটা বুকের গ্রামবাসীদের শুষ্ক চোখগুলো চকচক করে ওঠলো। আনাচ-কানাচ ছেড়ে সবাই মাঠে নেমে এলো। অধীর অপেক্ষায় আকাশপানে সবগুলো চোখ। চাতকের নয়, শকুনের নয়—তৃষ্ণার্ত মানুষের চোখ। এমনি সময় শুরু হলো দমকা বাতাস। মাঠের কাছেই যে বিশাল বাঁশঝাড়টা ছিলো, সেখান থেকে অজস্র শুকনো পাতা উড়ে গিয়ে গ্রামবাসীদের গায়ের পরে আছড়ে পড়লো। সবাই তখন বাঁশপাতার ঝাপটানিকে বৃষ্টি ভেবে আনন্দে লুটোপুটি খেতে লাগলো। গনগনে সূর্যের তাপের কথা বেমালুম ভুলে গেলো সহজেই। কিছুক্ষণের সুখ অনেক্ষণ থাকে, থাকে না?”

Mustafizur+Rahman++Bangladesh+Practise_140116_0038

সে দিন আর নেই এখন। গ্রাম বদলে গেছে। শহরগুলোও। সর্বোপরি, এখন দিন পালটেছে। কিন্তু তেষ্টাটা আছে। কতো রকম তেষ্টা! প্রতিনিয়ত খারাপ সংবাদ শুনতে শুনতে ভালো সংবাদের তেষ্টা বাড়ে কেবলই; কমে না। মুস্তাফিজকে নিয়ে এই খবরটি যেনো তেষ্টায়  ঠাণ্ডা জলের স্বাদ এনে দিয়েছে– “ক্রিকেটে এ ধরনের ঘটনা প্রায় বিরল। …তাই বলে কোনো ক্রিকেটারের মাতৃভাষা বোঝার জন্য একজন দোভাষীই নিয়োগ করে দেয়া? এতোদিন এটা হয়তো কেবল কল্পনাই করা যেতো। সানরাইজ হায়দরাবাদে কোনো বাঙালি ক্রিকেটার নেই। ফলে আকারে-ইঙ্গিতে ও টুকটাক ‘হাই-হ্যালো’ দিয়ে কাজ চালাতে কষ্টই পেতে হচ্ছিলো তাকে। কষ্ট হচ্ছিলো অন্যদেরও। কিন্তু মুস্তাফিজের প্রয়োজনীয়তা এতোটাই বেশি মনে হয়েছে সানরাইজার্সের যে, তারা নিয়োগ দিয়ে দিয়েছে দোভাষী। ……এর ফলে নিশ্চয়ই মুস্তাফিজ এবং দলের অন্য সবার মধ্যে যে ভাষাগত সমস্যাটা দেখা দিয়েছে, তা আর থাকবে না। মজার ব্যাপার হলো পাঁচ বছর ধরে আইপিএল খেলা সাকিবও এ রকম ‘ভিআইপি’ স্টাটাস পাননি।”

.

মুস্তাফিজ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে স্থান করে নিয়েছে—এটা আমাদের জন্য আনন্দের বটে। কিন্তু ওর্নারের গুগল ট্রেন্সলেট ব্যবহার করার কথায় আহ্লাদিত হওয়ার মতো কিছু আছে কি? মুস্তাফিজ নাকি বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আগ্রহের বস্তুতে পরিণত করেছেন, বিদেশিদেরকে বাংলা শিখতে বাধ্য করেছেন। এতে বাংলা ভাষার সম্মান বেড়ে গেলো অনেক—এমনটিও ভাবছেন কেউ কেউ। সদ্য বিশোত্তীর্ণ এই দুর্দান্ত ক্রিকেটারের বৌলিং নৈপুন্য আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং গৌরবের।  কিন্তু তাঁর ইংরেজি না জানাও যে গৌরবের হতে পারে, এটা ও আইপিএল খেলতে না গেলে নিশ্চয়ই আমাদের জানা হতো না। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ-এ মুস্তাফিজের অন্যান্য সতীর্থ যাঁদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়, তাঁদেরকে দোভাষী দেওয়া হয়নি—শুধু তাঁকেই দেওয়া হয়েছে—এটা নাকি ভিআইপি স্ট্যাটাস!

.

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আসরে মুস্তাফিজের অভিষেকের পর বছর গড়িয়েছে। বিসিবি’রই তো দায়িত্ব ছিলো তাকে ভাষা শেখানোর, নাকি? ব্যাঙ্গালুরু এয়ারপোর্টে ধারণ করা  ভিডিওতে ট্রেন্ট বোল্ট-এর সাথে মুস্তাফিজকে কথা বলতে দেখে আমাদের ব্যাপক আনন্দ হয়। তাচ্ছিল্যটা টের পাওয়া যায় না। আবার ওয়ার্নার যখন বলে, “He’s a little bit nervous (about the post-match presentation) because he can’t speak much English,” He always says to me, “bowling no problem, but speaking and batting problem’.” তখনও আমাদের বুকে আনন্দ হয়। ইংরেজি না জানা বাঙালি প্লেয়ারের কারণে অন্যদেরকে বাংলা ব্যবহার করতে হচ্ছে, বাংলার জন্য এতো সম্মান দেখে খুশিতে ডগমগ হয়ে বলা যায় “ব্যাটা বাঘের বাচ্চা! নিউজিল্যান্ডারকে বাংলা শেখায়, অস্ট্রেলিয়ানকে বাংলা শেখায়!” আহা আনন্দ! বাংলা কতো ছড়িয়ে গেলো এ দেশে, সে দেশে!”

.

আহারে তৃষ্ণা! কী যে তৃষ্ণা! আনন্দের তৃষ্ণা। গৌরব প্রকাশের তৃষ্ণা। এখন গ্রীষ্মকাল। কী গরম যে পড়ছে দেশে! তবে আমরা জানি, “ইংরেজি না জানাটা কোনো স্পোর্টসম্যানের জন্য খুব বেশি সমস্যা নয়। মেসি, নেইমার, রোনালদোদের মতো ফুটবল তারকাও তো ইংরেজি জানেন না। তারা তাদের মাতৃভাষাতেই মিডিয়ার সামনে কথা বলেন। টেনিসের রাফায়েল নাদালও তার স্প্যানিশ ভাষাতেই স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলেন। এমনকি শুরুর দিকে লাসিথ মালিঙ্গা, অজন্তা মেন্ডিস, ইনজামাম-উল হকদের মতো তারকারাও ইংরেজি বলতে পারতেন না; কিন্তু ভাষা তাদের পারফরম্যান্সের ওপর প্রভাব ফেলেনি।”

.

আমরা কিন্তু পারি। অনেক কিছুই পারি। বাংলাভাষাকে ছড়িয়ে দিতে জানি! এমন নজির মেসি, নেইমার, রোনালদোর দেশে মেলেনি নিশ্চয়ই। মিলুক বা না মিলুক, ভালোবাসা বেঁচে থাক; বেঁচে থাক বাঁশপাতা, রোদ্দুর, মেঘ। বেঁচে থাক দৃষ্টির সব ভ্রম। তৃষ্ণা, আহারে তৃষ্ণা!