ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

গ্রামে একবার চোর ধরা পড়লো। পাশের গ্রামে এক বাড়ির বাইরের আঙিনায় মাছ ধরার জালটা ছিলো। রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছিলো। বেশ বড়ো এবং দামি সেই জাল নিয়ে পালাচ্ছিলো সে। ও বাড়ির কেউ একজন তা দেখে ফেলে। হৈচৈ পড়ে যায়। বেশ কয়েকজন মিলে ওকে ধাওয়া করে। জালটাকে শরীরে পেঁচিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ভিন গ্রামের এক বাড়ির আড়ার* কোণে ছালা দেওয়া টাট্টিতে** আশ্রয় নিয়েছিলো চোরটি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গ্রামের জনতা তাকে ধরে উন্মুক্ত স্থানে নিয়ে আসে। যথারীতি চলতে থাকে কিল ঘুসি, লাথি, চড়-থাপ্পর; যে যেমন পারলো, ক্লান্ত হওয়া অবধি চোরটাকে মারলো। ততোক্ষণে বেচারা ভূমিস্যাৎ এবং অচেতন। মুখ দিয়ে টুথপেস্টের ফেনার মতো সাদা গড়িয়ে পড়ছে। দৃশ্যটি পঁচিশ বছর আগের।

.

তারও কয়েক বছর আগের এই ঘটনাটি গ্রামের প্রান্তে অবস্থিত ‘চক পাড়া’র। বাড়ি থেকে ধরে লোকটিকে লাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে থানায় নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। রোদের রাস্তায়, চিৎকার করতে করতে হাতকড়া পরা লোকটি এক পর্যায়ে বসে পড়লো। কিন্তু লাঠিপেটা থামলো না। আতঙ্কিত কিন্তু বেশ উৎসুক ছেলেবুড়ো অনেকেই সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখে ঘটনা দেখে যাচ্ছে। আসামি লোকটি দর্শকদের ভেতর থেকে দুজনকে কাছে ডাকলো। প্রতিবেশি এই দুজনকে তার বাড়িতে গিয়ে টেপ রেকর্ডারটা আনতে অনুরোধ করলো। মারের হাত থেকে বাঁচতে হলে টেপ রেকর্ডারটা এনে দিতে হবে। টেপ রেকর্ডারটা এলো এবং আসামিরও থানায় যাত্রা আরামদায়ক হলো।

.

একসময়ের রুমমেইট বড়ো ভাইয়ের কাছ থেকে শুনা এই ঘটনাটি এখন মনে হলে আর গা শিওরে ওঠে না। তাদের এলাকায় একবার ওরকম এক চোর ধরা পড়েছে। আর শাস্তি হিসেবে ওকে কায়দা করে বসিয়ে অণ্ডকোষটাকে একটা ইঁটের পরে রেখে আরেকটা ইঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করে থেঁতলে দেওয়া হয়েছিলো। চোর বেচারা একটা প্রচণ্ড চিৎকার দিতে পেরেছিলো শুধু। মুখ দিয়ে ফেনা ছাড়বার সুযোগ পায়নি।

.

প্রাইমারি স্কুলে সামাদ স্যার ছিলেন সাক্ষাত যমদূত। সমাজ পড়াতেন। পাতায় পাতায় মুখস্ত পড়া দিতেন আর পরদিন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ওটা বলতে হতো। মুখস্ত বলতে গিয়ে একবার আটকে যাওয়া মানেই সপাং সপাং বেশ কয়েকটা। দাগ বসে যেতো পিঠে, নিতম্বে। বেতগুলো ডোরাকাটা ছিলো—মনে পড়ে। হাই-স্কুলে একবার এক সহপাঠীকে বেদম মারলেন ইংরেজির স্যার। তখন গরমকাল। স্কুলে ইলেক্ট্রিসিটি ছিলো না। মারের চোটে ছেলেটি মূর্ছা গেলো। এরপর হসপিটাল পর্যন্ত যেতে হলো তাকে। পরে শুনেছি, হেড স্যার ওই স্যারকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

.

নব্বইয়ের গোড়ার দিকে উত্তীর্ণ কৈশোরের লোমহর্ষক এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীর অভিজ্ঞতায় এখন আরও ভয়ঙ্কর, আরও নির্মম ঘটনার দৃশ্য একেবারেই কম নেই। সাংবাদিক, ছাত্র, শিক্ষক, ধর্মগুরু, লেখক, শ্রমিক, শিশু, গৃহবধু—একজন নয়; বহুজনের বহু নির্যাতনের ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদনগুলো করোটির ভেতর জমা হচ্ছে একটার পর একটা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কারখানার মেশিন অপারেটর, ট্রাক ড্রাইভার কিংবা বিমানের পাইলটকে উচ্চ শব্দময় পরিবেশে মনযোগ দিয়ে কাজ করতে হয়। শুরুতে কঠিন মনে হলেও এ কাজে তারা শীঘ্রই অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। আমাদের সংবেদনশীলতাও সমকালীন সুখের-দুঃখের-ভয়ের ঘটনার সাথে ধাতস্থ হয়ে ওঠে।

.

তারপরও মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙা জলজ প্রাণির সহসা ছুটের মতো এক আধটু নড়েচড়ে ওঠা হয়। প্রতিবাদী হই। আমরা পুলিশের পরিবর্তন চাই। আমরা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষকের আচার-ব্যবহারে পরিবর্তন চাই। আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা চাই। আমরা ধর্ষকমুক্ত, দূর্নীতিমুক্ত, ধর্মান্ধ ও ধর্মবিদ্বেষীমুক্ত সমাজ চাই। আমরা হলুদ সাংবাদিক, ঠকবাজ দোকানদার, ধুরন্ধর মজুতদার, ছিঁচকে চোর, পকেটমার এবং শয়তান নেতার কাছ থেকেও মুক্তি চাই। মাঝে মাঝে আয়নায় একটু ভালো করে নিজের দিকেও তাকাই নিশ্চয়ই।

.

ওই যে টেপ রেকর্ডারের জন্য পেটালো পুলিশ, কিংবা এই সেদিন রাতের বেলা ব্যাংকের লোকটাকে ধরে নিয়ে চাঁদা চাইলো যে, তার জন্য ওই উর্দিটা, ওই পেশাটাই পচে গেলো কি? যারা স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মকে নিজের মতো করে ব্যবহার করে তাদের কারণে ধর্মটাই কি পচে গেলো? কোনো শিক্ষকের লাম্পট্য কি সমগ্র শিক্ষক সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে? কিংবা শিক্ষকতা পেশাটির উপর? তেমনি শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনাটিকেও আমরা কি ‘সংখ্যালঘু’, কিংবা ‘সাম্প্রদায়িক’ বিশেষণের ট্যাগিং লাগিয়েই দেখতে পছন্দ করবো, যেমনটি প্রত্যাশা করেছিলো ঘটনার হোতারা? এই যে আমরা আমরা করছি, এই আমরাটা কারা? বিবিধ নামের ওসব পেশাদার লোকগুলোর ভাই-বোন, প্রতিবেশি, আত্মীয়-পরিজন কিংবা তাদের শ্রম-সেবাভোগী মানুষগুলোই তো? পুলিশ যাঁদের আজ্ঞাবহ, তাঁদের সদিচ্ছা না থাকলে এসব আমরা-টামরার হৈচৈ-এ মুখের আরামে হয়তো অবসাদ দূর হয়; এই ডিপার্টম্যান্টের ভেতর জমে থাকা কলুষ নয়। ঠিক তেমনিভাবে, দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়ন যখন প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে ওঠে, তখন একজন শিক্ষকের এরূপ লাঞ্ছনার ঘটনায় বড়োজোর কষ্ট পাওয়া যায়; এটাকে আনলাইকলি ভাবা যায় না, যায় কি?

.

প্রধান শিক্ষক জনাব শ্যামল কান্তি ভক্ত’র উপর মানুষের এমন চড়াও হওয়া এবং কান ধরে ওঠবস করানোর মতো নির্মম অপমানের ঘটনা পরবর্তি দুটো বিষয় চোখে খুব লাগলো। একটি গোষ্ঠী এটি প্রমাণের চেষ্টায় আছেন যে, তিনি আসলেই ধর্মের বিরুদ্ধে কটু মন্তব্য (তোগো আর শিক্ষা হবে না। তোরা অনেক কথা বলছ। শিক্ষকদের কথা শুনছ না। শুনবি কিভাবে? তোগো আল্লাহও নাপাক তোরাও নাপাক) করেছেন। ঈঙ্গিতটা হলো, তার এ শাস্তি প্রাপ্য ছিলো। আরেকটি গোষ্ঠী এ ব্যাপারটির সাথে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সূত্র টেনে ড্রামাটাইজ করে মোল্লাদের গোষ্ঠী উদ্ধারে নেমেছেন। ঈঙ্গিতটা হলো, “এই সব শালা উগ্রবাদি মোল্লাদের কাম”।

.

খুব নগ্নভাবে এই দুটো দলই নিজেদের নির্বুদ্ধিতা তথা সংকীর্ণতার হীন পরিচয়কে সচেতন নাগরিক সমাজের ছদ্মাবরণে জাহির করেছেন একদম ঝকঝকে ছবির মতো। বোঝা যাচ্ছে, এটা একটা খেলা। এ যেনো সমজাতীয় বৈশিষ্ট্যের দুই বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর লড়াই। বিষয়টি অবাক করার মতো, বিশেষত যখন সব কিছু সবার সামনে স্পষ্ট হয়েই আছে। মিস্টার শ্যামল হতে পারেন কটু মন্তব্যকারী, হতে পারেন অন্যায়কারী। আমাদের এক মন্ত্রীও তো ধর্মের বিরুদ্ধে কটু কথা বলেছিলেন; অনেকেই তো তাঁর সামনে তখন ছিলেন। কই, তাঁকে তো শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়নি! তিনি আইনের স্বাভাবিক নিয়মেই শাস্তি পেয়েছেন। শ্যামল বাবুকে কেনো তবে জনতার রোষের শিকার হতে হবে? মন্ত্রী নন বলে? স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, এই ঘটনায় দুরভিসন্ধিমূলক উস্কানি ছিলো। উস্কানি কারা দিলো? কার নির্দেশে কে গিয়ে মাইকে জানান দিলো সবাইকে আসার জন্য? কার কী স্বার্থ ছিলো পুরো ঘটনায়? এসবের বিস্তারিত অনুসন্ধান না করে একজন শিক্ষককে এভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে–এই খবরের বাজারমূল্যের দিকে নজর বড়ো ছিলো বলেই শ্যামল বাবুর কানে ধরা ছবিটাও পোস্ট করতে ছাড়েনি সংবাদ মাধ্যমেগুলো। আমরা এতোটা দেউলিয়া হয়ে গেছি! কী দরকার ছিলো লাঞ্ছনার এই ছবিটি ছাপানোর? একজন লাঞ্ছিত শিক্ষকের যন্ত্রণা এতে করে কমলো কি কিছু? ছবি না দেখতে পেলে কি প্রতিবাদ জমতো না (হ্যাঁ, প্রতিবাদ আজকাল জমে ওঠে; বিচার হোক না হোক–ব্যবসা তো হয়)?

.

বিভাজনের সমীকরণে নিজেদেরকে স্বতন্ত্র মনে করার খায়েশ আছে, আয়েশ আছে। ধুরন্ধরের ধান্ধার পূর্ণতায়ও আয়েশ আছে। এসব অভিজাত আয়েশে পায়েসের সু-স্বাদ আছে। এদিকে বেলা বয়ে যাচ্ছে। খেলনা ছেড়ে পরস্পরের হাতগুলো শক্ত করে ধরা যায় কি না সে সিদ্ধান্তটি জরুরি। আরামে বন্ধ চোখগুলোও খুলুক এবার। নির্ভেজাল মনুষ্যত্ত্ব জেগে ওঠুক। অন্ধকার কেটে যাক।

—————————

*আড়া–  ঝাড়/জঙ্গল

** টাট্টি– কাঁচা টয়লেট