ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

আমরা নিশ্চয়ই জানি, বাংলাদেশে কৃষি ও মৎস উৎপাদনে কী অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে গত কয়েক দশকে। ধানের আর মাছের শুধু নয়, ফলের ও অন্যান্য ফসলের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন, উন্নয়ন, এবাং অত্যাধুনিক চাষাবাদ প্রক্রিয়া সত্যিই বিশাল এই জনগোষ্ঠীর ব-দ্বীপে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। সত্তরের দশকের তুলনায় মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব আর নানারূপ অবকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি কারণে চাষের জমি কেবল কমেই যাচ্ছে দিনদিন। না খেতে পেরে মরে যাওয়ার সময়টি কিন্তু এখন আর নেই এদেশে।

ভাবতে হালকা অবাক লাগে, কৃষিপ্রধান এমন একটি দেশে কৃষকদেরকে কীভাবে বাঁশ দিয়ে যাচ্ছে নিয়তি! নিয়তি কারও কারও জন্য এমন কঠোর হয় –তাই বলে এত্তো? সে যা-ই হোক, নিয়তি তথা ভাগ্যের উন্নয়নের কথা বলেই যেহেতু রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ জনসেবায় আত্ননিয়োগ করে থাকেন, বাঁশের চাষে তাদের যত্নের অভাব না থাকলে স্বভাব বদলানোর সুযোগ কোথায়? স্বভাব মানে খাসলত। কিন্তু আপনি ফটকা বাজারিকে দোষ দেবার আগে তার উপরের বাজারিদের দিকে তাকাবেন নিশ্চয়ই। গোড়াটা কোথায় মেলে তা চোখ এড়ানোর কথা নয়। ক্ষেতের ফসল উঠোনে আনা অবধি কৃষকের খরচ কতো হলে কপালে বাঁশের বাড়ি পড়ে তা জানতে হলে আমাদের সবাইকে চাষা হতে হবে না, জানি। তবে আমরা অনেকেই জানি না বা বুঝি না, এই কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী, যারা পুরো দেশের মানুষের পুষ্টির উৎস সমৃদ্ধ করতে গিয়ে জান কোরবান করে দিচ্ছে আর বৈভবওয়ালা অনেককে আরও দামি কমোডের দামে মনোযোগি করে তুলছে, তারা কী এমন অন্যায় করে যাচ্ছে যে, ফাটা বাঁশের চিপা থেকে বের হতে মানা? ভালোভাবে বাঁচা তো আরও পরে। দেশের উন্নয়নে আমাদের মনোযোগ কি একচোখা হয়েই থাকবে? তবে এতো কিছুর পরও দেশটি কিন্তু এগিয়েই যাচ্ছে। আমরা ক্রমাগত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আঁকড়ে ধরে রাখি বলেই কিনা–আমাদের কাছে দোষগুলো বড়ো হতে থাকে। একচোখামি তাহলে এখানেও আছে!

একচোখা হলে অবশ্য ব্যক্তিগত আরাম আছে অনেক। সকলের দরদি ব্রাদারেরও নিজের ভাই-বেরাদর, নয়তো মুরিদ, আশেকান থাকে। এদের সংখ্যা বেড়ে গেলে, নিজের এবং সকলের নিরাপদ আগামি নিশ্চিত করার হিসেবটি শাস্ত্রীয় মতে অর্পিত কমিটমেন্টের চেয়ে বড়ো হলে দেশ তো আর বেদখল হয়ে যাবে না, তাইনা? বলিষ্ঠতা আধুনিক রাষ্ট্রের অভিভাবকদের কাছে আরাধ্য ভীষণ। প্রভাবকে যত্ন করে ধরে রাখতে হয়। যত্নে খরচ আছে। এখানে অযত্নশীল হলে ভূমিস্যাৎ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আপনি তনু হত্যার বিচারের দাবিতে কতোদিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন? আপনার চেয়ে ঢের বেশি দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি আছে অনিশ্চয়তার। অনিশ্চয়তার জয় হয়। তো শুভবুদ্ধির বালতিভরা বলক নিয়ে মাঠে দাঁড়ালেও দেখা যাচ্ছে শেষমেষ আমাদের আবাল দেশজ চেতনা (?) ভূমিস্যাৎ হয়। তাই বলে নিরাপত্তার জন্য আপনার যদি পুলিশের কাছে যেতে ইচ্ছে নাও করে, আপনি চুপচাপ নিজের ঘরে আরেকটু ঘুমিয়ে নিলে দেশদ্রোহী হবেন–একথা কে বলেছে? আসলে আমরা সকলেই এই দেশটাকে ভালোবাসি। বড়ো দায়িত্বে গেলে বোঝা যায়–কতো কিছু মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পাবলিক সেন্টিমেন্ট দিয়ে ‘বিচার চাই, বিচার চাই’ করা যায়–কিন্তু কোন্‌ বিচার চাইতে হবে আর কোনটা হবে না, সেটা সবাই বুঝলে তো দেশে আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কোনো সুযোগই থাকতো না। শিশু জানে না কোন্‌ খাবারে পুষ্টি বেশি–ও তো শুধু সুস্বাদ বোঝে। বাবা-মাকে তথা গার্ডিয়ানকে সব বুঝতে হয়। আবার প্রত্যেক গার্ডিয়ানই একদা যেহেতু শিশু ছিলেন, অজানা তো অবশ্যই নয় যে, ভীষণ ভালোবেসেই চুষে চুষে দুধ খেয়ে বড়ো হয় শিশু। স্বাভাবিক নিয়মেই, দেশকেও ভালোবেসে চুষে খাওয়া যায়–চুমুক কিংবা ডুব দিয়েও খাওয়া যায়—বিশুদ্ধ জল, ঝিরঝিরে বাতাস, ঠাণ্ডা পানীয়। দেশটা তো মা-ই, নয় কি? দেশের উৎপাদন দেশের মানুষ খাবে। যার যার মতো গুছিয়ে খাবে। কারও অরুচি কিংবা অসামর্থ্য থাকলে তিনি অন্য কিছু খাবেন।

খাদ্য তালিকায় এখন শুধু ভাত-মাছ-মাংস-ফল-শব্জিই নয়, যুক্ত হয়েছে আরও বিমূর্ত অমৃত– আমরা ভয় খাই, কনফিউজ্‌ন খাই, বিশ্বাস খাই। কয়েক ধরণের সংবাদ তো মনে হচ্ছে এডিক্টের মতো খাচ্ছি ইদানিং সবাই। মুখ ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন ছিদ্রপথে এগুলো খাওয়া যায়। তাই বলে এতো খাওয়া-দাওয়ায় বুঁদ থাকলে তো চলবে না– কিছু কাজ করতে হবে। তো সে কারণেই বলছিলাম, একটু উৎপাদনের দিকে চোখ ফেরানো দরকার। কৃষিজ, কিংবা অকৃষিজ। দেশের সাথে সাথে আমাদেরও তো এগিয়ে যেতে  হবে।