ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

প্রশ্নটা এসেই যায়, মাছরাঙা’র ওই রিপোর্টের একটা ড্রামাটাইজ্‌ড খসড়া ছিলো কি আগে থেকেই? অল্প পরিশ্রমে রান্না করা চাঞ্চল্যকর খবরের খাদক কম নেই এদেশে। তবে একটু কেমন যেনো একটু কেঁচে গেলো বিষয়টা–কারণ জিপিএ ফাইভ প্রাপ্তির পুরো ব্যাপারটাকেই এক্সট্রিম জেনারালাইজেশনের শিকার করে খেলো করবার চেষ্টা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। প্রশ্ন ওঠছে–এরা আদৌ জিপিএ ফাইভওয়ালা কিনা। এই তেরোজন কি র‍্যান্‌ডম স্যাম্প্‌লিং-এর তেরো, নাকি ডেলিবারেট সিলেকশনের তেরো? আমরা জিপিএ ফাইভওয়ালা দেখেছি। আমরা তাঁদের মেধা সম্পর্কে ধারণা কিছুটা হলেও রাখি এবং সেটা এরকম নিচু মানের নয়। মানে আমাদের দেখা জিপিএ ফাইভ অর্জনকারিদের সামর্থ্যের এতোটা দৈন্য–বাস্তবে খাপে খাপ যায় না। এই রিপোর্টের স্বচ্ছতা তাই সন্দেহাতীত নয়। অন্তত ঢাকা ইউনিভার্সিটির সেবারের ভর্তি পরিক্ষায় ইংরেজিতে গণহারে ফেইল করার বাস্তবতার বা বিশ্বাসযোগ্যতার মাত্রায় এটাকে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। আবার নির্দিষ্ট এলাকার তেরো জনের উপর পরিচালিত কোনো সঠিক স্টাডির ফলাফলকে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখবার সুযোগটিও কম।

আমরা অতোটা ভালো এখনও নই–তা বিশ্বাস করলেও, এতোটা খারাপ কোনোভাবেই ভাবতে পারছি না। কেউ কেউ জিপিএ সিস্টেমকে, কেউ অতি উদার নিরীক্ষণ পদ্ধতিকে, কেউ আবার সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দুঃসাহস করছেন এই সুযোগে। হ্যাঁ, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশাটা বহাল আছে; তো তাতে সহসা এমন হৈচৈ-এর কিছু তো নেই; এতো আর নতুন করে হয়নি যে, হুট করে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। হ্যাঁ, এবসার্ডিটি আছে। এবং সেটা দুদিকেই। যাঁরা ভেবে নিচ্ছেন–এ-ই তবে সত্যিটা, তাঁরা এই এ-প্লাসের নিকুচি করছেন, সরকারের মুণ্ডুপাত করছেন কথার করাতে। ‘কী সর্বনাশ, কী সর্বনাশ!’ বলে আঁৎকে ওঠছেন বা আঁৎকে ওঠার ভান করছেন। আবার যাঁরা এ খবরে গোবরের গন্ধ পাচ্ছেন, তারা বুঝতে পারছেন, নাটকীয়তায় জনপ্রিয়তার দখল নিয়ে ক্ষমতার স্বাদে চোখ বুঁজলেন চ্যানেলওয়ালারা। বিষয়টা হয়েছে কী, মানে সত্যের অতিশায়ন সত্যের গুরুত্বকে বাড়ায় আসলে  মিথ্যের আদলে–তখন সিন্থেটিক প্রলেপের তলে আসল সত্যটুকু কতোটুকু সেটাই অনেক সময় খুব তুচ্ছ হয়ে ওঠে। এরকম রিপোর্ট নিশ্চয়ই জার্নালিজ্‌মের ইন্টিগ্রিটির দেউলিয়াপনার স্মারক হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে।

কিন্তু একটি রিপোর্টের সত্যাসত্য যাচাই করার উপায় আছে। তাছাড়া আরেকটি কোশ্চেনেয়ার তৈরি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্কুলে কিংবা কলেজে গিয়ে র‍্যান্ডমলি জিজ্ঞেস করে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানা যেতে পারে। বায়াসবিহীন দৃষ্টি দিয়ে দেখলে আমরা সত্যটি বুঝতে পারবো–তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তবে দেশের বিভিন্ন গ্রাম ও শহর থেকে এ ধরণের পরিক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থিদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার বেশ কিছু উদাহরণকে আমলে নিয়ে এটি বলা যায়, প্রলেপের কাজটুকু বাদ দিলেও যে চিত্রটি পাওয়া যাবে, তাতে ডিপ্রেসন কমে যাওয়ার দাওয়াই থাকবে –তেমনটি ভাববার জো নেই।

কিন্তু রোদে কিংবা ছায়ায় যেখানেই যে থাকি, পরিবর্তনের আশাটা ছেড়ে দিতে রাজি নই। তাছাড়া, এ বিশ্বাস সকলেরই যে, আশাবাদ সর্বদা সুইসাইডরোধক। কথা হলো, ভালো পাইবার আগে, ভালো চাইবার শক্তি থাকা চাই। ভালো ভালো ভালো চাই — জল ভালো চাই, বাতাস ভালো চাই, বালিশ-তোষক-কাঁথা এবং নেতা ভালো চাই, ঘুম ভালো  চাই, দেশ ভালো চাই। সর্বোপরি ভালো বাঁচতে চাই; তাই ভালো খাদ্য চাই, শিক্ষা চাই। কীরকম ভালো শিক্ষা চাই? আন্তর্জাতিক মানের, সর্বাধুনিক শিক্ষা। ভালো কথা। তো সে মানটা কীরকম? যেরকমটি হয়েছে– ক্রমে ক্রমে। আগে ছিলো ডিভিশনে পাশের হিসেব। নম্বরে বেজায় কার্পণ্য। মনে আছে, ইংরেজিতে ৭৮ পেয়েও দু’নম্বর কেনো দিলো না স্যার–এ প্রশ্নটিও মাথায় আসেনি।  এখন স্যারেরা হাত খুলে নম্বর দিয়ে থাকেন। কোনো নিরীক্ষক এখন ওরকম আটাত্তর নম্বর দিয়ে খাতা জমা দিয়ে দিলে তার খবর আছে যদি খাতাটি হ্যাড এক্‌জামিনারের চোখে পড়ে। এখান ছেলেমেয়েদের পরিক্ষার সাফল্য জিপিএ দিয়ে মূল্যায়িত হচ্ছে, প্রশ্নপত্র সৃজনশীল করা হয়েছে। আর পাশের হারও হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে চল্লিশ থেকে চলে গেছে নব্বই শতাংশে। আর পায় কে? জনগণ খুব খেয়েছে সেবার। এরপর রুচি বেড়েছে। এই সরকারটা তো জনগণেরই? তো হলো কী এরপর? যা হবার তা-ই হলো, জনগণের আশার প্রতিফলন ঘটেছে পরিক্ষার ফলে। খাবি যখন খা, মুখ ডুবিয়ে খা। টিচার যেমন জানেন, সরকারও জানে। পাশের হারে বাম্পার ফলন জনগণ মন থেকে চায়। তাই এর সরবরাহ নিশ্চিত করার সিন্থেটিক উপায়টা হাত ছাড়া কেনো হবে? পৃথিবীর কোনো ক্ষমতালিপ্সু সরকারই এটা চাইতে পারে না। পাবলিক পরিক্ষায় পাশের বন্যা মূলত ভোটের মালিকদেরকে হ্যাপি করে। তো একটু বাড়িয়ে দিলে ক্ষতি কি? দে বাড়িয়ে। বাড়ির আশেপাশে কেউ বোর্ডের খাতা দেখে নিশ্চয়ই। একদিন একান্তে তাঁর সাথে কথা বলে, কিংবা তাঁর খাতা দেখার সময় সেখানে কিছুক্ষণ উপস্থিত থেকে এসব ব্যাপারে ভালো করে জেনে নেওয়া যায়। বোর্ড থেকে খাতা দেওয়ার সময় নিরীক্ষকগণকে কী কী নির্দেশনা দেওয়া হয়–সেটি জেনেও জ্ঞানের এবং বিনোদনের চাহিদা পূরণ করার সুযোগ আছে।

তো আপনি সিন্থেটিক ফুড খেয়ে ক্ষুধা না হয় মেটালেন, পুষ্টির চাহিদা কি মিটে গেল তাতে? কিন্টারগার্টেনে গেলে দেখবেন, স্টুডেন্টের বাবা-মা টেনশনে শেষ। কী হইছে? সর্বনাশ হইছে। কী সর্বনাশ? তেনাদের টু-থ্রি-তে পড়ুয়া মেয়েটা কিংবা ছেলেটা পরিক্ষায় মাত্র নব্বই পেয়েছে। ওর আরও তিন সহপাঠী তার চেয়ে তিন কি চার নম্বর বেশি পেয়েছে। এখন এই নব্বই পাওয়া স্টুডেন্টের বাবা-মায়ের ইচ্ছে হয়, টিচারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, এই ভয়াবহ কম নম্বর পাওয়ার কী কারণ–ও তো সবই ঠিকঠাক লিখেছিলো বলে বলেছে পরীক্ষা দিয়ে এসে। কমপক্ষে আটানব্বই পাওয়ার কথা ছিলো— কিন্তু মাত্র নব্বই কেনো? —-না, এরকমটি কাল্পনিক নয়। একটু ইচ্ছে হলেই যাচাই করে নেওয়া সহজ।

স্কুল কলেজে টাকা দিয়া টিচার হইয়া ঢুইকা পড়াইতে সত্যিই মন চায় যাঁদের, তারা মহৎ বটে। কিন্তু এই সংখ্যাটা কম। ইউনিভার্সিটিতেও অযোগ্যের যোগ্য হয়ে ওঠার বাস্তবতা কম পুরাতন নয়। এদেশের বেশিরভাগ স্কুলের ক্লাসরুম গুরুর কাছ থেকে ওরকম গা শিওরে ওঠার মতো জবাব পাওয়া যাবে ওরকম প্রশ্নের–এই আশংকা আজ মোটেও অমূলক নয়। (এর আগের একটি লেখায় এ ব্যাপারে কিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে।) এরকম ভূঁড়িভূঁড়ি আছেন, নিজের পড়ানো সাবজেক্টের ১০০ নম্বরের প্রশ্নের জবাবে নিজেরা এ প্লাসের ধারেও পৌঁছুতে পারবেন না। এসএসসি এবং ইন্টারমিডিয়েটের বাজারি এবং যথেষ্ঠ নিম্নমানের গাইডগুলোর উপর ভর করে চলছে এদেশের এই দুই স্তরের শিক্ষার বিতরণ, মূল্যায়ন। যেকোনো এলাকার তিরিশটি কি পঞ্চাশটি স্কুলের কিংবা কলেজের ইংরেজি শিক্ষককে আমন্ত্রণ করে এনে শুধু এনসিটিবি’র স্যাম্প্‌ল প্রশ্নটির সাহায্য নিয়ে অনুরূপ আরেকটি প্রশ্ন তৈরি করতে বলুন, ফলাফল আপনার কাছে আরও ড্রামাটিক মনে হবে–এক ফোঁটা সন্দেহ নেই। আমাদের ছাত্রেরা জানে, স্যার কোন্‌ গাইড থেকে কতো নম্বর মডেল টেস্ট দিয়ে পরিক্ষা নেবেন। অক্ষরে অক্ষরে উত্তর মিলে যায় পরিক্ষায়। আর বোর্ডের প্রতিটি এক্সামের আগের রাতের বিশেষ(!) পড়াশুনা আর সবার দোয়ায়-টোয়ায় পারফর্মেন্স খারাপ হয় না একেবারে। টেস্টে ফেইল করে বিশেষ অনুরোধে, অনুনয়ে প্রিন্সিপালকে ধরে পরিক্ষার অনুমতি আদায় করে পরে ব্যাপক পাস দিয়েছে–এমন নজির অদেখা নয়। যে ফেইল করবে বলে নিজেই নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলো, তার জন্য পাস করা কম বড়ো কথা নয়। মনে রাখতে হবে, পরিক্ষাকেন্দ্র কিন্তু সব এখন নকলমুক্ত।

অবশ্যই ব্যতিক্রম, অর্থাৎ নিয়মিত পরিশ্রমের ফলে অর্জিত জিপিএ, আছে। প্রায় বিশ কোটি মানুষের এই দেশে এই সব ব্যতিক্রমীদের সাফল্য টিভিতে দেখে ক্ষণিক আনন্দ পাওয়া যায়, গড় পাশের হারের আনন্দের মত, কিন্তু ধসে পড়া শিক্ষার গুণগত মানের বিকাশ সেই যে আটকে আছে তো আছেই। সিস্টেমের পরিবর্তনের ফল এই জিপিএ- কোনো সমস্যা না। অবজেকটিভও না। সমস্যা আসলে অন্যান্য প্যারামিটারগুলোয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, যোগ্য শিক্ষক কই? অনিয়মরোধি নিয়োগব্যবস্থা কই? মুখস্থরোধী প্রশ্নের সঠিক আয়োজন কই? রাজনৈতিক সদিচ্ছা কই? আবার একই সাথে এ প্রশ্নটাও নিশ্চয়ই নিজেদেরকেই জিজ্ঞেস করতে পারি আমরা, বৃক্ষের পরিচয় যদি ফলে মেলে, তবে শিক্ষামন্ত্রী মশাই’রটা ফলে (পরিক্ষার) কেনো নয়? কে না জানে, সুফলের কিছু কুফলও থাকে মাঝে মাঝে। কাঁঠাল খেলে কারও কারও পেট ব্যথা করে; আবার বেশি আঙ্গুরে কারও কারও এসিডিটির সমস্যা।

এখনও অনেক ছেলেমেয়ে আছে যারা জিপিএ ফাইভওয়ালা কিন্তু এরকম শুষ্ক গোবর নয়– তবে এর বাইরেও উতরে যাওয়া বৃহত্তর গোষ্ঠী, যারা শুধু শর্টকাট টেকনিক দিয়ে জিপিএ পাওয়ার বন্দোবস্ত করার কৌশলটা ভালো কাজে লাগিয়েছে– তাদেরকে ধন্যবাদ না দিলে কার্পণ্য হবে।  আর নেপালের রাজধানি নেপচুন হলে ক্ষতি কী? আরেকবার ভুটানেরটা ভালকানে হবে না হয়। বিজয় দিবস মুখ ফসকে ২৬ ডিসেম্বর-এ এক বার না হয় বেরিয়েই গেলো– কী এমন এসে গেলো তাতে? এরা নিজেদের নাম সমুজ্জ্বল করার চেষ্টায় এতো নিবেদিত; তো একদিন এক না পারা নামের জন্য কটু কথা এদেরকে না বললেই কি নয়?

আসুন সদয় হই। প্রজন্মকে ভালোবাসি। আমরা কেনো বাবা-মায়ের দিকে একবারও নজর ফেরাতে পারছি না? বাবা-মায়ের দিকেও নজর ফেরাতে হবে। চোখে যদি জ্বালাপোড়া হয়, তবে চোখ ঘুরিয়ে আকাশে তাকানো যেতে পারে। আকাশে খুব মেঘ থাকে আজকাল। খুব ঠাডা পড়ে। মানুষ মরে। এরপর একদিন পরিষ্কার আকাশে তারাগুলো দেখা গেলে, ওই গানটা আবার না হয় গাওয়া যাবেঃ

টুইঙ্কল, টুইঙ্কল লিট্‌ল স্টার

হাউ আই ওয়ান্ডার ওয়াট য়্যু আর……(youtube লিঙ্ক)