ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

‘নগর পুড়িলে দেবালয় এড়ায় না’–ইহা অতি সত্য কথা। তথাপি অলৌকিকত্বে কতিপয় আবালের  বিশ্বাস বড্ড ভয়ানক হইয়া থাকে। ফেইসবুকে দেখিয়াছি স্রষ্ঠার লীলা কতো বিচিত্র হইতে পারে তাহা বুঝাইবার জন্য ইঁহারা নানারূপ প্রমাণ হাজির করে। বাড়ি-ঘর পুড়িয়া গিয়াছে, কিন্তু ধর্মগ্রন্থ পুড়ে নাই, কিংবা আসমানে মেঘের বিন্যাসে স্রষ্ঠার নাম–এইরূপ ছবিটবি দিয়া মহান স্রষ্ঠার ক্ষমতার নিদর্শন প্রচারের সস্তা প্রবণতা এখনও বিশ্বে কম জনপ্রিয় নহে। ধর্মগ্রন্থের লেখা দিয়া তাবিজ বানাইয়া কতো ব্যবসাপাতি চলিতেছে দেশে দেশে! ভূতে-প্রেতে কতো বিজ্ঞানমনস্কের কতো যে প্রেম! এখনও হরর মুভিগুলি দারুণ ব্যবসাসফল।

আমরা হাট্টিমাটিমটিম পড়িয়া বড়ো হইয়াছি। আমরা জানি, বাস্তবে দেখা না গেলেও হাট্টিমাটিমটিমরা মাঠে ডিম পাড়ে এবং তাহারা শিংওয়ালা প্রাণী। আজগুবি কাহিনী যে কোনো বয়সের মানুষের ভালো লাগিবে। তবে হ্যাঁ, বয়সভেদে কাহিনীর উপস্থাপনা যথার্থ করিয়া লইতে হইবে। উপস্থাপনার ব্যাপারটিই শিল্প। আমাদের মৃৎশিল্প কিংবা চারু-দারু শিল্পের মতো ইহাকে রপ্ত করিতেও দীর্ঘ সময়ের সাধনা প্রয়োজন। এই শিল্পটিকে এক সময়ে শুধু ফ্যান্টাসি রাইটারগণ দখল করিয়া রাখিয়াছিলেন। এখন ইহার ডিসেন্ট্রালাইজেশন হইয়াছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণে সকল পেশাজীবীর দক্ষতায় ইহা ভূমিকা রাখিতে পারঙ্গম–এই ধারণাই তো আমাদের ছিলো না এক সময়। আমাদের সমস্যা হইলো, সম্প্রতি আমরা এতো বেশি ছিদ্রান্বেষী হইয়া ওঠিয়াছি যে, ভালো কিছু হইলেও তাহা আমাদের চোখে পড়ে না। আর পড়িলেও উহার মন্দ দিকটি চকচক করে।

এই ধরুন, তথ্য অধিকার আইন। কিংবা অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের কী অবাধ স্বাধীনতা! নানান হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবীতে মানুষের আন্দোলনের অবাধ স্বাধীনতা, সংবাদ মাধ্যমে তার সে কী ভীষণ প্রচার প্রসার–কম কথা! সরকারি বেতন কাঠামোতে কী প্রচণ্ড ইতিবাচক পরিবর্তন– এই তো সেইদিনের কথা। শিক্ষায় কী অপূর্ব প্লাবন ঘটিয়া যাইতেছে তাহা প্রতিনিয়ত দেখিয়াও আমরা কতোজন আমাদের সরকারকে ধন্যবাদ দিয়াছি? অথচ কোথায় কবে কে একটু প্রশ্ন ফাঁস করে– তখন তো চেঁচামেঁচির লোকের অভাব হয় না। দেশের ভাবমূর্তি সরকার কী করিয়া উজ্জ্বল রাখিবে যদি জনগণ তাহার মূল্য না বোঝে? এই দেখুননা, তনু আর আর্মি লইয়া টানাটানি শেষ না হইতেই পুলিশ লইয়া টানাটানি আরম্ভ হইয়া গেলো। নৈরাশ্যবাদী আমরা এইসব ঘটনাকে পরিপাটি ম্যানুফেক্‌চার্ড ‘স্কুপ’ ভাবিতেও কুণ্ঠা বোধ করিতেছি না। কী চরম পেসিমিজ্‌ম আমাদেরকে পাইয়া বসিয়াছে! এই যে এত্তোগুলি ছুটির দিন মিলিলো, কই, কোথাও তো একটা প্রসংশাসূচক নিবন্ধ দেখিলাম না।

সভ্য জাতির গৌরব আমাদের নতুন নহে। তবুও এই সকল অশুভ চর্চা আমরা অবলীলায় করিয়া করিয়া নিজেদের আত্মাকে নিয়ত কষ্ট দিয়া যাইতেছি। আমরা ভুল বুঝিয়া নিজেদেরকে অসুস্থ করিয়া তুলিতেছি। এইভাবে বাঁচিয়া থাকা যায় না। অথচ এইসব তথাকথিত চাঞ্চল্যকর প্রতিটি ঘটনায় বিনোদনের যথেষ্ঠ খোরাক আছে যাহা হৃদরোগ প্রতিরোধে অব্যর্থ ঔষধের ভূমিকা রাখিতে পারে–আমাদের ভ্রুক্ষেপ নাই।